১৯০৭–১৯৮১
সত্যেন সেন
বিক্রমপুরের সোনারঙ গ্রামের এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পরিবারে ১৯০৭ সালে সত্যেন সেনের জন্ম। অল্প বয়সেই তিনি অসহযোগ আন্দোলনে ও...
See more >>-
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের
-
খুলনা শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে গেলেও ছাত্রেরা প্রতিরোধ-সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত হয় নি। ২৬-এ মার্চ থেকে শুরু করে ২রা এপ্রিল পর্যন্ত তারা গোপনে নানা জায়গায় পজিশন নিয়ে পাক-সৈন্যদের উপর ইতস্তত চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে তারা বেশ কয়েকজন সৈন্যকে হত্যা ও জখম করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু একথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই গুপ্ত আক্রমণ চালাবার কালে কোনো ছাত্র মারা যায় নি বা শত্রুর হাতে ধরা পড়ে নি।
২৮-এ এপ্রিলের যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাই বলে তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় নি। শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ করবার জন্য তারা বাগেরহাটে গিয়ে মিলিত হলো। বাগেরহাটে প্রাক্তন
-
ঘটনাচক্রে ছেলেটির সাথে দেখা হয়েছিল। কাঁচা বয়সের কলেজের ছাত্র। এক সঙ্গে পথ চলতে চলতে তার মুখে এই কাহিনী শুনেছিলাম। সে যেমন করে বলেছিল, আমিও তেমনি ভাবে বলতে চেষ্টা করছি।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা ভেঙে গেছে। সংবাদটা সমস্ত শহরবাসীর মনের উপর কালো ছায়ার মত নেমে এসেছে। বাতাসটা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে। বেশ বুঝতে পারছি, এক মহাবিপর্যয়ের ধারালো খড়গ ক্ষীণ সূত্রে আমাদের মাথার উপর ঝুলছে, যে-কোনো সময় তা ছিঁড়ে পড়ে যেতে পারে। আমরা ক’জন বন্ধু সেই কথা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলাম। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর সময়টা-যে এখনই এসে গেছে তা আমরা কেউ ভাবতে পারি নি।
বড় ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের
-
এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহ।
ভারতীয় বেতার মারফৎ একটি সংবাদ প্রচারিত হলো-ঢাকা শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে কোনো এক জায়গায় পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলছে। খবরটা চাঞ্চল্যকর, বিশেষ করে ঢাকা জেলার লোকদের কাছে। দিনের পর দিন বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে মুক্তিবাহিনীর সক্রিয়তার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঢাকা জেলায় তাদের প্রতিরোধের চিহ্নমাত্র নেই। অবশ্য ২৫-এ মার্চ তারিখে সামরিক হামলার প্রথম রাত্রিতে রাজারবাগের পুলিশ ভাইয়েরা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ দিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এই কাহিনী অবিস্মরণীয়। তার দুই দিন বাদে নারায়ণগঞ্জ শহরের সংগ্রামী ভাইয়েরা শুধুমাত্র গোটা কয়েক রাইফেলের উপর নির্ভর করে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় সুশিক্ষিত সৈন্যদলকে দুই দিন পর্যন্ত আটকে রেখেছিল। শহরে ঢুকতে দেয় নি।
-
আমি আর আমার তিনজন সাথী। আমরা গত ক’দিন ধরে ইয়াহিয়ার শিকারী কুকুরগুলির সন্ধানী দৃষ্টি এড়িয়ে পূর্ববঙ্গের সীমান্ত পেরিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে চলেছি। এসব পথ দিয়ে জীবনে কোনোদিন চলি নি। এসব গ্রামের নামও শুনি নি কোনোদিন। কুমিল্লা জেলার গ্রামাঞ্চল। কুমিল্লা জেলার সীমানা ছাড়িয়ে বর্ডারের ওপারে আগরতলায় যাব। আপাতত এইটুকুই জানি, তারপর কোথায় যাব, কি করব, সে সম্পর্কে কোনোই ধারণা নেই। চলার পথের এপাশে ওপাশে, সামনে পেছনে বন্ধুভাবাপন্ন দরদী মানুষ যথেষ্ট আছে, কিন্তু শত্রুও আছে। শত্রুমিত্র বিচার করতে ভুল হলে মারাত্মক বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে।
আজ সারাটা দিন একটানা হেঁটেছি। খাওয়া জোটে নি পথে, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। বিকেল বেলা
-
বাংলাদেশের প্রতিরোধ সংগ্রামে বগুড়ার ছাত্রসমাজ সারা প্রদেশের ছাত্রদের মুখ উজ্জ্বল করে তুলেছে। বগুড়ার ছাত্ররা এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের ছাত্র-পতাকাকে সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। যাঁরা এই মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস রচনা করবেন, তাঁদের এই সত্যটিকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। এখানকার প্রতিরোধ সংগ্রামে কোনো বিশেষ নেতা বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল জনসাধারণকে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসে নি, প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে। শুধু কলেজের ছাত্ররাই নয়, দলে দলে স্কুলের ছাত্ররাও শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পথে নেমে এসেছে। যুদ্ধবিদ্যায় অশিক্ষিত এই কাঁচা বয়সের ছেলেরা একমাত্র দেশপ্রেমের বলে বলীয়ান হয়ে যুদ্ধবিদ্যায় অভিজ্ঞ পাক-সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে অকুতোভয়ে প্রাণ নিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে। এই ছাত্ররা
-
ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ২৫-এ মার্চ তারিখে পাবনা শহরে এসে ঢুকে পড়ল। শহরের মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। শীগ্গিরই এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটে যাবে, তারা মনে মনে এই আশঙ্কা করছিল। কিন্তু সেই ঘটনা যে এতো তাড়াতাড়ি ঘটবে, সেটা তারা ভাবতে পারে নি। এই তারিখেই ঢাকা শহরে আক্রমণ শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেটা গভীর রাত্রিতে। ওরা ২৫-এ মার্চ শেষ রাত্রিতে পাবনা শহরে এসে হামলা করল।
শহর থেকে মাইল চারেক দূরে হেমায়েতপুরের কাছে ইপসিক (ঊচঝওঈ)-এর অফিস। পাক-সৈন্যরা সেইখানে এসে ঘাঁটি গেড়ে বসল। তারপর সেখান থেকে কিছু সৈন্য শহরে এসে ট্রেজারী দখল করে নিল। তাছাড়া ২৭ জন সৈন্য টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কেন্দ্র দখল করে বসল।
-
পাক-সৈন্যরা বরিশাল জেলার উপর এসে হামলা করল অনেক পরে, এপ্রিল মাসের শেষের দিকে। বরিশাল জেলার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, এই জেলার কোথাও রেলপথের যোগাযোগ নেই। প্রধানত জলপথের সাহায্যেই তাকে অন্যান্য জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। একমাত্র ফরিদপুর জেলার সঙ্গে তার স্থলপথে যোগাযোগ রয়েছে। বরিশাল জেলায় আক্রমণ চালাতে হলে পাক-সৈন্যদের হয় নদীপথে, নয়তো স্থলপথে ফরিদপুর জেলার মধ্য দিয়ে আসতে হবে।
বরিশালের গৌরনদী থানা ফরিদপুরের সীমান্তবর্তী থানা। শত্রুরা যদি বরিশাল শহর দখল করবার জন্য স্থলপথে আসে, তবে তাদের এই থানা-অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে হবে; সুতরাং তাদের প্রতিরোধ করবার প্রথম দায়িত্ব গৌরনদী থানার অধিবাসীদের উপরই এসে পড়বে। শত্রুর হাত থেকে
-
২৫-এ মার্চ থেকে শুরু হলো ওদের আক্রমণ। ওদের নিশাচর বাহিনী গভীর রাত্রিতে অতর্কিতে ঢাকা শহরে হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল, সারা শহর রক্তের প্লাবনে প্লাবিত করে দিল। সেই আক্রমণের ঢল দ্রুতবেগে নেমে এলো, দেখতে দেখতে সারা প্রদেশময় ছড়িয়ে পড়ল। এই ধরনের পৈশাচিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউ। ওদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়াবার মতো প্রস্তুতিও গড়ে ওঠে নি। ওরা ধ্বংসের আগুনে শহরের পর শহর আর গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করতে করতে এগিয়ে চলল। ওদের কামান, মেসিনগান আর আধুনিক যুগের উন্নত ধরনের মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে যা দিয়ে লড়াই করবে, এমন কি হাতিয়ার আছে জনসাধারণের হাতে?
তাহলেও বিদ্রোহী বাঙালি এই
-
গভীর রাত্রিতে ওরা দিনাজপুর শহরে এসে ঢুকল। এ রাত্রি সেই ২৫-এ মার্চের রাত্রি, যে-রাত্রির নৃশংস কাহিনী পাকিস্তানের ইতিহাসকে পৃথিবীর সামনে চির-কলঙ্কিত করে রাখবে।
ওরা সৈয়দপুর থেকে এসে অতি সন্তর্পণে শহরের মধ্যে ঢুকল। শ’খানেক পাঞ্জাবী সৈন্য। শহরের ঢোকার মুখে প্রথমেই থানা। সৈন্যরা প্রথমে থানা দখল করে নিয়ে সেখানে তাদের ঘাঁটি করে বসল। তারপর তারা তাদের পূর্ব-নির্ধারিত পরিকল্পনা-অনুসারে শহরের টেলিগ্রাম ও টেলিফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো। সেইদিনই শেষ রাত্রিতে দিনাজপুরের বিখ্যাত কৃষক নেতা গুরুদাস তালুকদার এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট হিন্দু নাগরিক তাদের হাতে গ্রেফতার হলেন। এমন নিঃশব্দে ও সতর্কতার সঙ্গে এ সমস্ত কাজ করা হয়েছিল যে, শহরের অধিকাংশ লোক তার বিন্দুমাত্র আভাস
-
বিচিত্র এক জীবন। আমাদের এই বাংলাদেশে যারা শিল্পপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে এমন একটি জীবন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমি হাজী মহম্মদ ফকীরচাঁদের কথা বলতে যাচ্ছি। নিঃস্ব নিরক্ষর এক এতিম, ভাগ্য যাকে কোনো দিক দিয়েই কোনো ভাবে অনুগ্রহ দেখায়নি। সে ছেলে কেমন করে একান্ত ভাবে নিজের বুদ্ধি ও নিষ্ঠার জোরে ব্যর্থতার বাধা ডিঙ্গিয়ে অবশেষে সাফল্যের মঞ্জিলে এসে পৌঁছাল আমাদের এই ব্যবসা বিমুখ বাঙ্গালি সমাজে তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে পথ নির্দেশ করতে পারে।
পিতার নাম আলিজান ব্যাপারী। তাঁর আদি নিবাস রহমতগঞ্জে, পরে উর্দু রোডে চলে আসেন। গরীব মেহনতী মানুষ। মৌলভী বাজারে তাঁর পৈত্রিক ফলের ব্যবসা ছিল। ফকীরচাঁদ যখন
-
দেশ বিভাগের পর মালদহ জেলার ৫টি থানা পূর্ববাংলার রাজশাহী জেলার সঙ্গে এসে যুক্ত হলো। এই পাঁচটি থানা, নবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর। স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই নাচোল, নবাবগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি থানার আধিয়ার বর্গাচাষীদের মধ্যে যেই অভ্যুত্থান দেখা দিয়েছিল তা আমাদের কাছে ‘নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এ যুগের তরুণ তরুণীদের মধ্যে অনেকেই হয়ত এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে কোনো কথাই জানে না, কিন্তু সেদিন এই অভ্যুত্থানের কাহিনী উভয় বঙ্গের সর্বসাধারণের মধ্যে এক বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করে তুলেছিল।
নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ সম্পর্কে কোনো কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে গতশতাব্দীর সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা। ব্রিটিশ সরকার সাঁওতাল পরগণার বিক্ষুব্ধ সাঁওতাল কৃষকদের বিদ্রোহকে
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯১৪-১৫ সাল একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্ণ স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করার জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা শেষ পর্যন্ত সার্থকতায় পরিণত না হলেও সেই বিপুল কর্মোদ্যোগ ও আত্মত্যাগের জন্য আমরা গর্ববোধ করে থাকি। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা এই তিন মহাদেশে বিপ্লবীদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত ছিল। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবের সৈনিকরা এই অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চলেছিল। সে এক উদ্দীপনাপূর্ণ রোমাঞ্চকর পরিবেশ।
এই পরিকল্পিত বিদ্রোহের কেন্দ্রগুলির মধ্যে দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল অন্যতম। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ স্বয়ং মাহমুদ আল হাসান এই কেন্দ্রের নেতৃত্ব করছিলেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপ্লবীরা দেওবন্দের
-
পাঞ্জাবের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ড. সাইফুদ্দিন কিচলু ১৮৮৮ সালে অমৃতসর শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার কলেজ জীবন কেটেছিল আগ্রা ও আলীগড়ে। আলীগড় কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করার পর তিনি উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য ইউরোপে যান। ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. ডিগ্রী এবং জার্মানী থেকে পি. এইচ. ডি. ডিগ্রী লাভ করেন। এছাড়া তিনি লণ্ডনে ব্যারিস্টারি পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
১৯১৫ সালে ইউরোপ থেকে স্বদেশে ফিরে আসার পর তিনি অমৃতসর শহরে ব্যারিস্টার হিসেবে আইন-ব্যবসা শুরু করলেন। এই সময় তিনি শহরের বিভিন্ন সামাজিক ও জনহিতকর কাজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতেন। এই সমস্ত কাজের মধ্য দিয়ে তিনি যে জনপ্রিয়তা লাভ করেন, তার ফলে
-
ডা. আনসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সর্বজন পরিচিত নেতা। তার পুরো নাম ডা. মুখতার আহ্মদ আনসারী। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বাইরে থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁরা সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বিভাগে বিশিষ্ট পদ অধিকার করে এসেছেন। ডা. আনসারী ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুর গ্রামে। ডা. আনসারী তাঁদের পরিবারের অন্যান্যদের মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য নিজাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে চলে গেলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পর্যায়ক্রমে এল.
-
তাঁর আসল নাম ছিল সৈয়দ ফজলুল হাসান। কিন্তু এই নাম বললে কেউ তাকে চিনবেনা। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি হজরত মোহানী নামেই সুপরিচিত। তিনি ১৮৭৮ সালে উত্তর প্রদেশের উন্নাউ জেলার ‘মোহান’ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কিশোর বয়স থেকে তিনি ‘হযরত মোহানী’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। সেই নামে আজও তিনি আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।
উন্নত মেধার ছাত্র হিসাবে তিনি তার শিক্ষকমণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি সরকারী বৃত্তি লাভ করে আলীগড় কলেজে এসে ভর্তি হলেন। এখানে অতি অল্পদিনের মধ্যেই তিনি তার রচনার গুণে এবং একজন সংস্কৃতিসেবী হিসাবে সকলেরই মন জয় করে নিয়েছিলেন। ভবিষ্যতে তিনি যে একজন উচ্চ শ্রেণীর লেখক বলে পরিচিত হবেন, এ
-
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আবদুল গফফার খানের ভূমিকা চিরস্মরণীয়। সেই কারণেই তিনি ভারতের সর্বত্র ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। শুধু ভারতেই নয়, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বীর দেশপ্রেমিকের খ্যাতি ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। পাঠানদের হৃদয়রাজ্যের তিনি ছিলেন একচ্ছত্র রাজা। এই দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধপ্রিয় পাঠান জাতিকে তিনি কি করে কোন্ মন্ত্রে শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অহিংস সংগ্রামের সৈন্যবাহিনীতে পরিণত করতে সমর্থ হয়েছিলেন, দেশ বিদেশের লোকের মনে তা গভীর বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল।
তাঁর জন্ম ১৮৯০ সালে, পেশোয়ার জেলার চরসদ্দার তহশীলের অন্তর্গত উৎমন্জাই গ্রামে। তিনি এক বিশিষ্ট ভূস্বামী খান-পরিবারের সন্তান। সীমান্ত প্রদেশের পাঠান জাতির এই সমস্ত খান বা সমাজপতিরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ অফিসারদের তাঁবেদারী
-
দু’বছর সাজা খেটে জেল থেকে বেরিয়ে এলো হোসেন। তখন ১৯৫১ সালের শেষ ভাগ। হোসেন অনেক দিন আগে থেকেই শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এবার তাকে জেল খাটতে হয়েছে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক কারণে। সেই ইতিহাসটা প্রথমে বলে নেওয়া দরকার। ১৯৪৯ সাল। তখন ক্ষমতাসীন মুসলীম লীগ সরকার দোর্দণ্ড প্রতাপে তার স্বেচ্ছাচারী শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিচারে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলা বা কোনো কিছু করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামান্তর। সরকারের অনাচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে যাঁরাই প্রতিবাদ করতে গেছেন অথবা সরকার যে কোনো কারণেই হোক, যাদের কার্যকলাপ আপত্তিকর বলে বিবেচনা করেছেন, তাদের সবাইকে বিনা বিচারে জেলখানায় আটক করা হয়েছে। আবার বহু রাজনৈতিক কর্মী, শ্রমিক কর্মী ও
-
মণি সিং—রহস্য আর রোমাঞ্চ দিয়ে ঘেরা একটি নাম। পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের মুখে মুখে প্রচারিত এই নামটি। তার সঠিক পরিচয় আর কার্যকলাপের ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই। তাঁকে কেন্দ্র করে বাস্তবে আর কল্পনায় মিশানো বহু কাহিনি রচিত হয়ে উঠেছে। ময়মনসিংহ জেলার গ্রামাঞ্চলের বুড়ো চাষীরা তাঁদের নাতি-নাতনীদের কাছে রূপকথার মতো সেই সমস্ত কাহিনি শোনায়। ছোটরা অবাক কৌতুহলে বড় বড় চোখ করে সেই সব কথা শোনে। আধুনিক যুগের রূপকথার নায়ক মণি সিং।
কমরেড মণি সিং ময়মনসিংহ জেলার সুসং-দুর্গাপুরের রাজ পরিবারের ছেলে—এই কথাটা, কে জানে কেমন করে, ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়ে গেছে। এমনকি তাঁর পরিচিত মহলেও অনেকের মনে এই ধারণাটা বদ্ধমুল হয়ে আছে। কিন্তু কথাটা সত্যি
-
প্রায় চার হাজার বছর আগে সুমেরে লিখিত ‘ছাত্র জীবন’ নামে একটি ব্যাঙ্গাত্মক প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
‘আমি শিক্ষাফলক (ট্যাবলেট) থেকে আবৃত্তি করলাম। তারপর খেয়ে দেয়ে নূতন মৃৎফলক বানিয়ে নিয়ে তার উপর আমার লেখার কাজ শেষ করলাম। পরে আমাকে আগামী দিনের জন্য মৌখিক পাট বুঝিয়ে দেওয়া হলো এবং বিকাল বেলা পরদিন কি কি লিখে নিয়ে আসতে হবে, তাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো। বিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেলে পর বাড়ি ফিরে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখি বাবা বসে আছেন। আমি আজ যা যা লিখেছি, বাবার কাছে বললাম এবং ফলক থেকে আবৃত্তি করে শোনালাম। বাবা শুনে মহা খুশী। পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি আমার
-
যে দিন থেকে সমাজে শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, তখন থেকে শ্রেণী সংগ্রামও অব্যাহত গতিতে চলে আসছে। শ্রেণী-সমাজ কখনোই কোনো অবস্থাতেই শ্রেণী-সংগ্রাম থেকে ম্ক্তু থাকতে পারে না। তবে তা কখনও তীব্র ও ব্যাপক, কখনও মৃদু ও সীমাবদ্ধ, কখনও সরল, কখনও জটিল, কখনও প্রকাশ্য, কখনওবা প্রচ্ছন্নভাবে আবর্তিত হয়ে চলে। এই শ্রেণী-সংগ্রামের টানা-পোড়েনের মধ্যে দিয়ে মানব সমাজের ইতিহাস রচিত হয়ে চলেছে।
আমাদের এ দেশে এমন লোক এখনও আছে যারা শ্রেণী-সংগ্রামের মধ্যে-বিজাতীয় ভাবধারার গন্ধ পায় এবং অবজ্ঞা ভরে নাক সিঁটকায়। ইতিহাসের গতিধারা সম্পর্কে বেচারারা একেবারেই অজ্ঞ। আর আমরা-আমরাই কি পুরোপুরি সচেতন? মানব সমাজে শ্রেণীর উদ্ভবের পর থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে মহাসমুদ্রের বুকে সংখ্যাহীন তরংগের মতো
-
প্রাচীন মিসরের জনৈক ভদ্রলোক তার ছেলেকে নিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিতে যাচ্ছেন আর পথে পথে উপদেশ দিয়ে চলেছেন, বাপুরে, খেটেখুটে মন দিয়ে লেখাপড়া করো, যাতে লেখাপড়া শিখে একজন লিপিকার (ঝপৎরনব) হয়ে উঠতে পার। আমাদের এই সমাজে পেটের ধান্দা মিটাবার জন্য নানা জনে নানারকম পেশা নিয়ে মেহনত করে চলেছে। কিন্তু এদের মধ্যে একমাত্র লিপিকারেরাই সুখে আছে, আর সকলের দুর্দশার চূড়ান্ত। কর্মকারদের মধ্যে থেকে কেউ রাষ্ট্রদূতের পদ পেয়েছে, এ আমি কোনো দিন দেখিনি। দেখছি তো কামারদের—এরা দিনের পর দিন এদের চুল্লির আগুনের সামনে বসে কাজ করে চলে, এদের হাতের আঙ্গুলগুলো কুমীরের নখের মতো বেঁকে যায় আর এদের গা থেকে মাছের ডিমের চেয়েও
-
এমন একদিন ছিল যেদিন মানুষ কথা বলতে পারতো না। পশু পাখীদের মতোই ইশারায় ইঙ্গিতে এবং নানারকম স্ফুট-অস্ফুট ধ্বনি করে তার মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য চেষ্টা করতো। কিন্তু সমাজবদ্ধ মানুষের কাজ-কর্ম উৎপাদনব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদান প্রদানের প্রয়োজন ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। এই প্রয়োজনের একান্ত তাগিদে বহুযুগের সাধনার ফলে মানুষ কথা বলতে শিখল। সৃষ্টি হলো ভাষার। এই ভাষার সৃষ্টি ও বিকাশের মধ্যদিয়ে মানুষের মনোজগতই যে শুধু বিপ্লব ঘটে গেলো তাই নয়, সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যেও তা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এলো। এইভাবে কি বৈষয়িক, কি মানসিক, উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা মানব সমাজের উন্নতির একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল।
মানুষ
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.















