নাচোল কৃষক বিদ্রোহ

দেশ বিভাগের পর মালদহ জেলার ৫টি থানা পূর্ববাংলার রাজশাহী জেলার সঙ্গে এসে যুক্ত হলো। এই পাঁচটি থানা, নবাবগঞ্জ, ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুর। স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই নাচোল, নবাবগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি থানার আধিয়ার বর্গাচাষীদের মধ্যে যেই অভ্যুত্থান দেখা দিয়েছিল তা আমাদের কাছে ‘নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এ যুগের তরুণ তরুণীদের মধ্যে অনেকেই হয়ত এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে কোনো কথাই জানে না, কিন্তু সেদিন এই অভ্যুত্থানের কাহিনী উভয় বঙ্গের সর্বসাধারণের মধ্যে এক বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করে তুলেছিল।

নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ সম্পর্কে কোনো কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে গতশতাব্দীর সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা। ব্রিটিশ সরকার সাঁওতাল পরগণার বিক্ষুব্ধ সাঁওতাল কৃষকদের বিদ্রোহকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিয়েছিল।

নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ ও তার মর্মান্তিক পরিণতি যেন তারই একটি ছোট সংস্করণ। এই অভ্যুত্থানের মধ্যে সাঁওতাল, হিন্দু ও মুসলমান এই তিন সম্প্রদায়ের কৃষকরা যুক্ত থাকলেও এটা ছিল প্রধানত সাঁওতাল কৃষকদের অভ্যুত্থান।

গত শতাব্দীর সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থতায় ভেঙ্গে যাওয়ার পর বিদ্রোহী সাঁওতালদের মধ্যে বহু লোক সরকারের অত্যাচারের হাত থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য তাদের জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সম্ভবত সেই সময়ই তারা বাংলাদেশের মালদহ, বীরভূম প্রভৃতি জেলায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল। বহুদিন আগেকার কথা হলেও সেই বিদ্রোহের স্মৃতি তাদের মন থেকে একেবারে মুছে যায় নি। বংশ পরম্পরাগত কাহিনী ও লোক সংগীতের মধ্য দিয়ে তা প্রবাহিত হয়ে আসছিল এবং অতি বড় দুঃসময়ে সেই স্মৃতি তাদের রক্তের মধ্যে ঝংকার জাগিয়ে তুলত। ১৯৩২ সালে মালদহ জেলার সাঁওতাল কৃষকরা স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য গঠনের জন্য যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল, তার মধ্য দিয়ে আমরা তার পরিচয় পাই।

এক সময় সাঁওতালরা তাদের আদি-জন্মভূমিতে স্বাধীন ভাবে বসবাস করত। যেই জমিকে তারা জন্মসূত্রে পেয়ে এসেছে, তারা জানত তারা নিজেরাই সেই জমির মালিক। সেই জমিতে মেহনত করে তারা যেই ফসল ফলাত, তারা নিজেরাই তা ভোগ করত, বাইরে থেকে আর কেউ এসে তার উপর ভাগ বসাতে পারত না। তারপর এক সময় কোথা থেকে নেমে এলো সরকার, জমিদার, জোতদার। যাদের হাতে কাগজপত্র, তারাই নাকি জমির মালিক। কিন্তু তাদের নিজেদের হাতে কোনো কাগজ নাই, তাই তাদের সব কিছু থেকেও কিছুই নাই। যদি জমি চাষ করতে হয়, তবে তাদের কাছ থেকে জমি নিতে হবে, আর ফসল ফললে তার একটা মোটা ভাগ তাদের গোলা-ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। এইটাই নাকি আইন। এই আইন না মানলে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে তাড়িয়ে দেয়, ধরে বেঁধে জেলখানায় আটক করে রাখে, এমন কি খুন করেও ফেলে। এইটাই নাকি বিচার!

কিন্তু এ কেমন আইন? এ কেমন বিচার? বাইরে থেকে এলো যারা তাদের শান্তির সংসারের উপর হামলা করেছিল, জবরদস্তি করে তাদের উপর তাদের এই সমস্ত আইন চাপিয়ে দিয়েছিল, তাদের কথা তারা সহজে মেনে নেয় নি। এই নিয়ে মাঝে মাঝেই তাদের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়েছে। কিন্তু ওদের শক্তি তাদের চেয়ে অনেক বেশী, ওরা অনেক দূরে দাঁড়িয়ে বন্দুক নিয়ে লড়াই করে, ওদের সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠা যায় না। তাই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে পোষ-মানা হয়ে থাকতে হয়। কিন্তু তা সত্বেও কখনও কখনও ভুল হয়ে যায়, আদিম রক্ত গর্জন করে ওঠে।

এখানকার তথাকথিত সভ্য জাতির মানুষেরা এই ‘অ-সভ্য’ সাঁওতাল আর তাদেরই মতো অন্যান্য সম্প্রদায়ের আদিবাসী লোকদের ভাগ্য নিয়ে কি নিষ্ঠুর খেলাই না খেলে এসেছে! যে সব জায়গা নিবিড় বন-জঙ্গলে পূর্ণ ছিল, যেখানে বাঘ-ভালুক আর সাপ-ক্ষোপের ভয়ে কেউ প্রবেশ করতে চাইত না, জমিদার আর জোতদার নামে পরিচিত ভদ্র লোকেরা সেই সমস্ত জায়গায় এদের মিষ্টি কথায়

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice