ত্যুলকা
ত্যুলকা মেয়েটির চোখ দুটি নীল, মাথায় মজার দুটি বেণী, একটা চাকার মতো, আরেকটা ছাগলের শিঙের মতো। জেলেদের জেটি বরাবর মনমরার মতো সে হাঁটছে। মাথার ওপর হাসিখুশি হালকা মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে হাসিখুশি গাঙচিল, হাসিখুশি রোদ্দুর চারদিকে, কিন্তু মেয়েটির মন ভার। চুপ করে তাকিয়ে দেখছে সমুদ্রের দিকে।
আর সে কী সমুদ্র! এই নীল। এই আবার ছেয়ে সবুজ। হঠাৎ একেবারে সোনালি। কিন্তু ত্যুলকার চোখ অন্যদিকে...দূরের ওইখানটায়, যেখানে সবচেয়ে নীল, সেখানে সমুদ্রের গভীরে আছে গন্ধকী-হাইড্রোজেনের রাজ্য, জীবন্ত সবকিছুই মারা পড়ে তাতে, কাঁকড়া, মাছ, জেলি ফিশ, এমনকি সিন্ধুঘোটক পর্যন্ত...
এই বিছছিরি গ্যাসটার কথা সে শুনেছে স্কুলের শিক্ষিকা আল্লা ফেদোরভনার কাছ থেকে। সেই থেকে ত্যুলকার মনে শান্তি নেই।
‘কীরে ত্যুলকা, মনমরা কেন?’
স্ট্র-হ্যাট পরা ঢ্যাঙা এক জেলে স্নেহের সুরে বলল চোখ মটকিয়ে।
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেরে ত্যুলকা বলল, ‘ভিক্তর কাকু, ছোটো বড়ো কোনো মাছই আমাদের আর বাঁচবে না... একটা বিষাক্ত গ্যাস আছে...তাকে বলে গন্ধকী-হাইড্রোজেন...’
‘হ্যাঁ, তা আছে বটে,’ সায় দিল সে, কিন্তু কোনো রকম দুশ্চিন্তা দেখা গেল না। মুখখানা একেবারে নিশ্চিন্ত আর চোখদুটোয় একটা দুষ্টু দুষ্টু ব্রোঞ্চ-রঙা ঝলক।
রেগে ভেঙচি কাটল ত্যুলকা, ‘আছে, আছে!’ ‘আছে...তা, লোকে ভাবছে-টা কী?’
‘লোকের ভেবে হবে-টা কী। ভেবে শুধু কপাল ঘামবে, ত্যুলকা।’
অন্য সময় হলে জেলেদের এই বেয়াড়া রসিকতায় ত্যুলকা হেসে উঠত, এবার কিন্তু সে সরে গেল গোমড়া মুখে।
বুড়ো আলেক্সইয়ের কাছে গেল সে। ময়দার দোকানের সামনে বসে সে কড়া তামাকের পাইপ টানছে। মুখখানা তার ভার-ভার, কাটা দাগে ভরা। একবার রাতে সমুদ্রের ঝোড়ো ঢেউয়ে তাকে নৌকা থেকে আছড়ে ফেলে পাথরের ওপর দিয়ে হেঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিল। লোকটার ভয়ডর নেই, সমুদ্র আর সমুদ্রের জীবনে সে ভালোবাসে। নিশ্চয় ত্যুলকার কথায় সে কান দেবে।
কিন্তু অবাক কাণ্ড, ভিক্তর কাকুর মতো আলেক্সেই দাদুরও এতটুকু দুশ্চিন্তা দেখা গেল না।
আরো মুখ-ভার করল ত্যুলকা। না, সমুদ্রের কথা কেউ ভাবতে চায় না, অথচ দিনরাত মাছ আনছে ওই সমুদ্র থেকেই...আর তাকে কিনা ঠাট্টা, বলে ত্যুলকার মাথা খারাপ হয়েছে।
আর মাথার ওপর পাক দিতে দিতে গাঙচিলগুলোও ঠাট্টা করল, ‘ক্যাক ক্যাক।’
‘মাথা খারাপ হয়েছে...’ হেসে উঠল হাওয়া।
হাসল না কেবল সমুদ্র, আদর করে সে শুধু তার ঢেউ দিয়ে মেয়েটির রোদপোড়া পাদু’টি ধুইয়ে দিয়ে ফিসফিস করল, ‘তুই মেয়ে ধনি!’
ত্যুলকার ঘুম হয় ভারী বিছছিরি। কেবলি স্বপ্ন দেখে গন্ধকী-হাইড্রোজেনের...স্বপ্নে সে আসে এক প্রকাণ্ড কালো বুড়োর মূর্তি ধরে, হাতগুলো যার অক্টোপাসের শুঁড়ের মতো। মোটা মাথা, উঠখো নাক, মোচওয়ালা। তাকে দেখে ভয়ে পালিয়ে যায় যত প্রাণী। ফ্যাকাশে হয়ে যায় কমলা রঙের সব সামুদ্রিক উদ্ভিদ। কালো হয়ে ওঠে জল। আতঙ্কে ছোটাছুটি করে মাছের ঝাঁক, আর ত্যুলকা একটা খড়গ মাছ হয়ে গিয়ে তার সঙ্গে মরণপণ লড়াই করে যায় ভোর পর্যন্ত...
মন খারাপ হয়ে ঘুম ভাঙে ত্যুলকার। দুনিয়ার কোনো সাগরে, কোনো মহাসমুদ্রে এখানকার মতো এত বেশি গন্ধকী-হাইড্রোজেন নেই। তার সঙ্গে লড়া উচিত। যুদ্ধ ঘোষণা করা দরকার। কিন্তু সবাই আগের মতো তার কথায় হেসে ওঠে। এমনকি ত্যুলকার বাবা, মাছ-ধরা জাহাজ ‘নিনা’য় যিনি নেভিগেটর, তিনিও হেসে বললেন, ‘ভাবনা নেই রে মেয়ে, বিজ্ঞানীরা একদিন আমাদের এই সমুদ্রকে সারিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবে ঠিকই।’
বাপের হাসি ভালো লাগল না ত্যুলকার। রেগে পা দুমদাম করে সে বলল, ‘আল্লা ফেদোরভনা বলেছেন যে আমাদের সমুদ্রের মরা এলাকাটা জ্যান্ত এলাকার কয়েকগুণ বড়ো।’
‘নয় বড়োই হল, শুধু রাগ ফলাবি না, ওটা আমার ভালো লাগে না,’ গলা চড়ালেন বাবা, ‘বোকামি ছাড় ত্যুলকা।’
ত্যুলকা ? ত্যুলকা আবার কে? ওর আসল নাম তো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments