প্রত্নতত্ত্ব
আমি এ গল্প আমার বন্ধু সুকুমারবাবুর মুখে শুনেছি।
ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে যাঁহারা কিছু আলোচনা করেছেন, তাঁদের সকলেরই কাছে ডাক্তার সুকুমার সেনের নাম সুপরিচিত। ডাক্তার সেন অনেক দিন গভর্নমেন্টের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। পাটনা excavation-এর সময় তিনি স্পনার সাহেবের প্রধান সহকারী ছিলেন। মধ্যে দিনকতক তিনি ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের প্রত্নতত্ত্ব-বিভাগের Curator-ও ছিলেন। বৌদ্ধ Iconography-তেও তিনি সুপণ্ডিত। প্রাগ গুপ্ত-যুগের মূর্তি-শিল্প ও ভারতীয় মূর্তি-শিল্পের ক্রমবিকাশ নামক তাঁর প্রসিদ্ধ বই দু-খানা ছাড়া, এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রে এবং বহু দেশি সাময়িক পত্রিকায় এ বিষয়ে তিনি বহু প্রবন্ধ লিখেছেন।
তাঁর পড়বার ঘরটায় নানা স্থানের ভাঙা পুরোনো ইট, ভাঙা কাঠের তক্তি বসানো তুলট কাগজ ও তালপাতার পুথির স্থূপ এবং কালো পাথরের তৈরি দেবদেবীর মূর্তির ভিড়ে পা দেওয়ার স্থান ছিল না। এইসব মূর্তির শ্রেণিবিভাগ করতে তিনি অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন। কোনো নতুন-আনা মূর্তি পেলে তিনি বেশ ভালো করে দেখতেন, পুথি মেলাতেন, তারপর টিকিট আঁটতেন ‘বৌদ্ধমূর্তি তারা’। দিনকতক পরে এ বর্ণনা তাঁর মনঃপূত হত না। তিনি আপন মনে বলতেন–উঁহু, ওটা ললিতক্ষেপ Pose হল যে, তারা কী করে হবে? তারপর আবার ‘লেন্স’ হাতে মূর্তিটার এপিঠ-ওপিঠ ভালো করে দেখতেন। মূর্তিটার যে হাত ভাঙা, সেটার দিকে চেয়ে বলতেন—এ হাতটায় নিশ্চয় পদ্ম ছিল। হু—মানে— বেশ বোঝা যাচ্ছে কিনা? তারপর আবার পুরোনো টিকিটের ওপর নতুন টিকিট আঁটতেন ‘বৌদ্ধমূর্তি—জম্ভলা’। তাঁর এ ব্যাপার দেখে আমার হাসি পেত। আমার চেয়েও বিজ্ঞ লোকে ঘাড় নেড়ে বলত—হ্যাঁ, ও-সব চালাকিবাজি রে বাপু, চালাকিবাজি! নইলে কোথাকার পাটলিপুত্র কোথায় চলে গেল, ওঁরা আজ খোঁড়া ইটপাথর সাজিয়ে হুবহু বলে দিলেন—এটা অশোকের নাটমন্দিরের গোড়া, ওটা অশোকের আস্তাবলের কোণ; দেখতে দেখতে এক প্রকাণ্ড রাজবাড়ি মাটির ভেতর থেকে গজিয়ে উঠল!…চাকরি তো বজায় রাখা চাই? কিছু নয় রে বাপু, ওসব চাকরিবাজি!
তবে এসব কথার মূল্য বড়োই কমঃ কারণ জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে আমারও এসব বিজ্ঞ লোকের চিরদিন ভাসুর-ভাদ্ৰবউ সম্পর্ক।
সেদিন দুপুর বেলা ড. সেন যখন তাঁর নিজের লাইব্রেরিতে সেনরাজাদের শাসনকাল নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত আছেন, আমি তখন একটা রাষ্ট্রবিপ্লবের মতো সেখানে গিয়ে হঠাৎ হাজির হলাম। আমাকে দেখে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। খানিকক্ষণ খোশগল্প করে সেখানে সারাদিনের মানসিক পরিশ্রম দূর করতে বুঝলাম তিনি খুব ব্যর্থ হয়ে পড়েছেন। একথা-সেকথার পর ড. সেন বললেন—চা আনাই, একটা গল্প শোনো। এটা আমি কখনো কারুর কাছে বলিনি, তবে শুনার সাহেব কিছু কিছু শুনেছেন।
বাইরে সে দিন খুব শীত পড়েছিল। দরজা বন্ধ করে সুকুমারবাবুর গল্প শোনবার জন্য বসলাম। চা এল, চা খেতে খেতে সুকুমারবাবু তাঁর গল্প বলতে লাগলেন।
বিক্রমপুরের পুরোনো ভিটার কথা বোধহয় কিছু কিছু শুনে থাকবে। এটা কতদিনের, তা সেখানকার লোকে কেউ বলতে পারে না। অনেকদিন ধরে ঢিবিটা ওই রকমেই দেখে আসছে— এটা কার বা কোন সময়ের তা তারা কিছুই বলতে পারে না।
ঢাকা মিউজিয়াম থেকে সেবার ওই ঢিবিটা খোঁড়বার কথা উঠল। এর পূর্বে বরেন্দ্র অনুসন্ধান-সমিতি ও ঢাকা-সাহিত্য-পরিষদ শাখা থেকে ওটা কয়েকবার খোঁড়বার প্রস্তাব হয় কিন্তু টাকার জোগাড় করতে না-পেরে তাঁরা পিছিয়ে যান। আমার কাছে যখন কথা উঠল, তখন আমারও মতো ছিল না। কারণ, আমার মনে মনে ধারণা ছিল খরচ যা পড়বে তার তুলনায় আমাদের এমন বিশেষ কিছু পাবার আশা নেই। অবশেষে কিন্তু আমার আপত্তি টিকল না। ওটা খোঁড়বার জন্যে টাকা বরাদ্দ হল। আমি বিশেষ অনুরোধে পড়ে তত্বাবধানের ভার নিলাম।
গিয়ে দেখলাম, যে-ঢিবিটা হবে তার কাছে আর একটা ঠিক তেমনি ঢিবি আছে। এই ঢিবির কাছে একটা প্রকাণ্ড দিঘি আছে, তা প্রায় মজে এসেছে। ঢিবি দুটো খুব বড়ো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments