কালের যাত্রার ধ্বনি

অনুবাদ: রেখা চট্টোপাধ্যায়

ভ্লাদিমির লাভরোভ নামে মস্কোর এক শিল্পীকে বলা হয়েছিল ভল্‌গার প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি আঁকতে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি হয়েছিলেন কিন্তু তাঁর চরিত্রগত দীর্ঘসূত্রতার জন্যে তৈরী হতে হতেই সমস্ত গ্রীষ্মকালটা কেটে গেল। সেপ্টেম্বরের আগে ইস্টিমারে চড়ে ভল্‌গায় পৌঁছুতে তিনি পারলেন না।

মোটা চোঙাওলা ইস্টিমারটা ঝকঝক করছে, তার গোল গোল জানালাগুলোকে পালিশ করে স্ফটিকের মতো করে তোলা হয়েছে। ইঞ্জিন ধক ধক করতে করতে মসৃণ দৃঢ় গতিতে ইস্টিমারটা চললো তার আলোগুলো আর এক ডেক ভৰ্ত্তি সুসজ্জিত যাত্রী নিয়ে। সহরতলীর অরণ্য আর কাঁকরাকাটা পাড়গুলো গেলো পেরিয়ে। তাদের উপর তখন শীতল সূর্যাস্তের আভা মিলিয়ে আসছে। ইতিমধ্যেই অরণ্যের রঙ হয়েছে পিঙ্গল আর সোনালী। শরতের সেই কম্পিত আলো ভরা সায়াহ্নে সঙ্কেত বাতিগুলো ঝলসে ঝলসে উঠছে।

বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও লাভরোভ লাজুক মানুষ। সহযাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করা তাঁর পক্ষে কঠিন বলে মনে হলো।

যে সব লোকজন তিনি দেখেন তাঁদের ভিতর এই ব্যাপারেই তিনি উৎসাহী—তাঁরা আঁকবার যোগ্য কি না। ইস্টিমারের উপর তিনি দুটি লোককে বেছে নিয়েছিলেন—তরুণী মেয়ে জাহাজচালক সাশা এবং যাত্রীদের মধ্যে একজন বয়স্ক লোক, পরিষ্কার করে দাড়ি কামানো আর যাঁর চোখের পাতাগুলো ভারি। তিনি ইতিহাসের এক বিখ্যাত অধ্যাপক।

খুব ভোরে তাঁরা রীবিন্‌স্ক সমুদ্র অতিক্রম করলেন। শিশির-সিক্ত জনশূন্য ডেকে লাভরোভ এলেন বেরিয়ে পূবের অস্পষ্ট ঊষার দিকে ছোট ছোট ঢেউগুলো কুলকুল শব্দে এগিয়ে চলেছে। এটা দিনের খারাপ আবহাওয়ার পূর্ব সঙ্কেত।

অধ্যাপকও ডেকে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি রেলিঙের উপর ভর দিয়ে ঝুঁকে, কলার উল্টে, সেই ধরনের কালো টুপিটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন যে ধরনের টুপি পরতে বৃদ্ধরা ভালোবাসেন।

খাড়া সিঁড়িটা দিয়ে সাশা দৌড়ে ডেকে নামলো। পরনে তার কালো পোষাক হাতে চামড়ার দস্তানা আর মাথায় বেরেট টুপি যেটার তলায় সে চুলগুলোকে গুঁজে রেখেছে। এই মাত্র তার রাত-পাহারা থেকে ছুটি হয়েছে; গালগুলো তার লাল আর ঠোঁটগুলো ফাটা ফাটা ।

‘সুপ্রভাত,’ হেসে লাভরোভকে সে অভিনন্দন জানালো। ‘আমাদের সমুদ্রের তারিফ করছেন?’

‘তাই বটে! আমার পক্ষে মনে করা কঠিন এটা মানুষে তৈরী করেছে ‘

‘আমার জন্ম এখানে, মলোগা’তে। যখন আমি ছোট্ট মেয়ে ছিলাম ঠিক এইখানটাতেই আসতাম আমরা ব্যাঙের ছাতা তুলতে।’ ঊষার আরক্ত আভায় রঞ্জিত ঢেউগুলোকে সে আঙুল তুলে দেখালো। আর সেটা অনেকদিন আগের কথাও নয়—এই সমুদ্রের বয়েস আমার চেয়েও কম।’

টুপিটাকে প্রায় কাণ পর্যন্ত টেনে অধ্যাপক মন্তব্য করলেন, ‘ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘটনা-স্রোতের সঙ্গে তাল রাখতে পারে না। সেগুলো এগিয়ে যায় আর আমাদের নিখুঁত ঐতিহাসিক ধারণাকে যায় পেরিয়ে। পুরো একদল বিশেষজ্ঞের দরকার এইভাবে হুম্ড়ি-খেয়ে-পড়া সময়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যে।’

লাভরোভ প্রশ্ন করলেন, ‘নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে সে ধরনের একদল লোক আছেন?’

হেসে অধ্যাপক উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ। নিশ্চয়ই সে রকম একদল আছে আর তারা এখন কাজ করার জন্যে ছড়িয়ে পড়েছে।’

কিনেস্‌মার কাছে ইস্টিমারটা দীর্ঘ এক ভেলার সারি পেরিয়ে গেল।

ঝোড়ো হাওয়া আকাশ দিয়ে হাল্‌কা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আন্‌লো। তাদের ছায়াগুলো সরে সরে যেতে লাগলো নদী আর তার অরণ্য-ছাওয়া পাড়ের উপর। এই পাড়গুলো বালি পাথরের পাহাড়গুলোকে করেছে জলমগ্ন ছায়াগুলোর একেবারে পিঠে পিঠে আসছে রৌদ্রের জ্বলন্ত ঝলক। সবকিছু তাতে উঠছে জ্বলে আর ঝিকিয়ে। ছায়া থেকে একদল জলচর পাখী হঠাৎ বেরিয়ে এলো সাদা বিদ্যুতের মতো আর তারপর তারা ডুব দিলো প্রদোষালোকে; তারপর যেন জ্বলে উঠলো দূরের একটা বাড়ীর পতাকা—সম্ভবত সেটা গ্রাম্য সোভিয়েত’এর। পর মুহূর্তেই মনে হলো যেন সবুজ পাইন গাছগুলো রৌদ্রে উঠলো ঝলমল করে—সেগুলো যেন গ্রীষ্মকালের বৃষ্টিতে গিয়েছে ভিজে; তারপর সেই পাইন গাছগুলো ঢেকে গেল যেন এক ছায়াচ্ছন্ন সবুজ শবাধারে, তাদের মৃদু গর্জন ইস্টিমার পর্যন্ত

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion