লেখা নিয়ে লেখা
এমন একদিন ছিল যেদিন মানুষ কথা বলতে পারতো না। পশু পাখীদের মতোই ইশারায় ইঙ্গিতে এবং নানারকম স্ফুট-অস্ফুট ধ্বনি করে তার মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য চেষ্টা করতো। কিন্তু সমাজবদ্ধ মানুষের কাজ-কর্ম উৎপাদনব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদান প্রদানের প্রয়োজন ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। এই প্রয়োজনের একান্ত তাগিদে বহুযুগের সাধনার ফলে মানুষ কথা বলতে শিখল। সৃষ্টি হলো ভাষার। এই ভাষার সৃষ্টি ও বিকাশের মধ্যদিয়ে মানুষের মনোজগতই যে শুধু বিপ্লব ঘটে গেলো তাই নয়, সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যেও তা বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এলো। এইভাবে কি বৈষয়িক, কি মানসিক, উভয় ক্ষেত্রেই ভাষা মানব সমাজের উন্নতির একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল।
মানুষ কথা বলতে শিখলো। কিন্তু মুখের ভাষাকে সে শুধু তার ভাব বিনিময়ের উপকরণ হিসাবে সীমাবদ্ধ করে রাখল না। তাই নিয়ে সে রচনা করল তন্ত্র, মন্ত্র, গান, ছড়া, কবিতা, উপকথা ইত্যাদি। আধুনিক কালে আমরা এদের সাহিত্য অ্যাখ্যা দিয়ে থাকি। কিন্তু বর্তমানে সাহিত্য বললেই আমাদের লিখিত সাহিত্যের কথা মনে পড়ে যায়। লেখকদের উপকরণ খাতা, কলম, পেন্সিল। আর সাহিত্যকে যারা উপভোগ করে তারা প্রধানত পাঠক। বক্তারা শ্রোতাদের উদ্দেশ করে বলেন, আর লেখকরা পাঠকদের উদ্দেশ করে বলেন।
লেখার প্রচলন হয়েছে অনেক পরে। তবে আগে যাঁরা যা কিছু রচনা করতেন, মুখে মুুুুুুুখেই করতেন। তাঁদের কাছে এছাড়া আর কোনো পন্থা ছিল না। তাঁরা যা রচনা করতেন, তা তাঁদের স্মৃতির পটে ধরে রাখতেন। সাধারণের কাছে আবৃত্তি করে শোনাতেন। কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তা শেষ হয়ে যেত না। সেই সমস্ত তন্ত্র, মন্ত্র, গান, কবিতা, উপকথা, ইতিহাস ও কাহিনি শিষ্য পরম্পরায় বা বংশ পরম্পরায় মুখে মুখে বয়ে নিয়ে আসা হতো। তারই ফলে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে সেই সমস্ত সম্পদ উপভোগ করছি। কিন্তু তাই বলে কেউ যদি মনে করে যে, মূল রচয়িতাদের রচনা এখনও বিশুদ্ধ বা অবিকৃত আছে, তাহলে খুবই ভুল করা হবে। স্মৃতি ভ্রংশের ফলে অনেক অংশ লোপ পেয়ে যাবে, সঠিক ভাবে অর্থ না বোঝার জন্য এবং উচ্চারণের ভুলের দরুন কতকগুলো অংশ বিকৃত হয়ে যাবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তার চেয়েও বড় কথা পুরুষের পর পুরুষ ধরে মুখে মুখে চলতে চলতে পুরানো দিনের রচনাগুলি পরবর্তী নবীনদের হাতে পড়ে পরিবর্তিত, সংশোধিত ও পরিবর্ধিত হয়ে আসতে থাকে। সময় সময় পুরানো ও অপ্রচলিত ভাষাকে মার্জিত করে সময়োপযোগী করে নেওয়া হয়। কখনও বা নতুন যুগের মালমশলা পুরানো যুগের রচনার মধ্যে ঢুকে পড়ে। আবার সময় সময় প্রতিভাধর লেখকের হাতে পড়ে পুরানো দিনের অতীব সাধারণ রচনা অসাধারণ রচনায় পরিণত হয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাচীন যুগের মহাকাব্যগুলি এই একইভাবে জন্মলাভ করেছে।
একটা কথা মনে রাখা দরকার। লেখার অতীত যুগে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ যে সমস্ত উৎকৃষ্ট শ্রেণীর সাহিত্য সৃষ্টি করেছিল, তার অনেক কিছুই আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। মানুষ যদি লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে না পারতো, তাহলে আমরা যা পেয়েছি তার অধিকাংশই হারিয়ে যেতো, সে বিষয়ে কিছু মাত্র সন্দেহ নেই। অবশ্য শুধু হাতে লিখলেও আমরা তাদের সবাইকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম না। মুদ্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে অনেক প্রাচীন মুমূর্ষু সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।
কলম ও পুঁথিপত্রসম্বল লেখার যুগে একথা ভাবতে গেলে আমরা অবাক হয়ে যাই। আমাদের লেখকরা কাগজ কলম ছাড়া একেবারেই অচল। তাছাড়া এতো সমস্ত তন্ত্র, মন্ত্র, আনুষ্ঠানিক বিধি-ব্যবস্থা, দর্শন, ব্যাকরণ, কাব্য, হাজার হাজার বছর ধরে কণ্ঠস্থ করে চলা এসব কথা ভাবলেও দিশাহারা হয়ে যেতে হয়। অথচ প্রাচীন ভারতের বৈদিক সাহিত্য রামায়ণ, মহাভারত, গ্রীসের ইলিয়ড, ওডিসি বিভিন্ন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments