মধুপুরগড়ের যুদ্ধ
বিক্রমপুরের সুদূর গ্রামাঞ্চলে বসে ভারতীয় বেতারের প্রচারিত সংবাদ শুনছিলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে আকাশবাণী ঘোষণা করছে, ময়মনসিংহ জেলার মধুপুরগড়ে পাক-সৈন্যদলের আর মুক্তিবাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে।
মধুপুরগড়? চমকে উঠলাম। একসময় এই মধুপুরগড়কে কেন্দ্র করে কতো রোমাঞ্চকর স্মৃতি নিয়ে রোমন্থনই না করেছি। শতাধিক বছর আগে এই মধুপুরগড় আমাদের দেশের রাজনৈতিক আবর্তনের ইতিহাসের পাতায় একটু স্থান করে নিয়েছিল। আজকের দিনে আমাদের কাছে সেই ঐতিহ্য হয়তো তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেদিন এই মধুপুরগড়ে একদল বিদ্রোহীর অভ্যুত্থান সারা বাংলার মানুষের মনে আলোড়ন জাগিয়ে তুলেছিল। সেই বিদ্রোহ আকারে ছোটো হলেও তখনকার দিনের ব্রিটিশ রাজপুরুষরা তাই নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল।
আমি সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের কথা বলছি। শুধু মধুপুরগড় নয়। এই বন-অঞ্চল তখন বর্তমানের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সারা অঞ্চলটা জুড়ে বিদ্রোহীদের গোপন আনাগোনা ছিল, এই বনভূমির নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মরক্ষা করে তারা তাদের বিদ্রোহাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যেত। লোকের মুখে মুখে এই অঞ্চল ‘সন্ন্যাসীগঞ্জ’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। এ থেকে বোঝা যায় তাদের প্রতাপ ও খ্যাতি একেবারে সামান্য বা তুচ্ছ করার মতো ছিল না। এদের বিদ্রোহের কাহিনীর সূত্রকে অবলম্বন করেই বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ লিখেছিলেন। অবশ্য সন্ন্যাসী বিদ্রোহের বাস্তব ঘটনাবলীর সঙ্গে এর মিল খুব কমই ছিল। তাহলেও একথা স্মরণ রাখতে হবে এই ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস বাংলার প্রথম যুগের বিপ্লবীদের মনে এক উজ্জ্বল প্রেরণা ও উৎসাহের সৃষ্টি করে তুলেছিল। সেই মধুপুরগড়ে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা আজও স্বাধীনতার জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। একটু রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠবার কথাই তো।
ময়মনসিংহ শহর তথা ময়মনসিংহ জেলা তখনও মুক্ত অঞ্চল। কিন্তু তার উপর রাহুগ্রাসের ভয়াল ছায়া নেমে আসছে। দুর্দিন আসন্ন। হামলাকারী পাক-বাহিনী টাঙ্গাইল শহর হস্তগত করে ময়মনসিংহ শহর দখল করবার জন্য দ্রুতবেগে ছুটে আসছে। তাদের এই অভিসন্ধিকে ব্যর্থ করতে হলে পথের মাঝখানেই তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। এই প্রতিরোধের ঘাঁটি গড়ে তোলার পক্ষে মধুপুরগড়ই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। মুক্তিবাহিনী স্থির করেছিল এইখানেই তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু প্রতিরোধ করবে কারা? প্রতিরোধের মূল শক্তি ই. পি. আর.-এর যোদ্ধারা এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে অন্য সেক্টরে চলে গেছে। তারা আসতে আসতে এই দুশ্মনরা মধুপুরগড় ছাড়িয়ে চলে যাবে। অতএব অবিলম্বে তাদের বাধা দেওয়া দরকার। এই অল্প সময়ের মধ্যেই যেটুকু শক্তি আছে তাই নিয়ে তাদের প্রতিরোধ দিতে হবে।
মুক্তিবাহিনীর সংগঠকরা বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রদের কাছে জরুরী ডাক পাঠালেন। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে নানা জায়গা থেকে ২২ জন ছাত্র মধুপুরগড়ে এসে পৌঁছল। এরা যুদ্ধ করবার জন্য তৈরী হয়ে এলো বটে, কিন্তু এদের মধ্যে কেউ আগে থেকে অস্ত্রচালনায় অভ্যস্ত ছিল না। মাত্র দিন সাতেক আগে থেকে তারা ই. পি. আর.-এর লোক বা প্রাক্তন সৈন্যদের কাছ থেকে রাইফেল চালনা শিখছিল। এইটুকু শিক্ষাই ছিল তাদের সম্বল। আর সম্বল ছিল অনির্বাণ দেশপ্রেম ও দুর্জয় সাহস। একথা শুনলে কি কেউ বিশ্বাস করতে পারবে, মাত্র ২২ জন অস্ত্রচালনায় অনভ্যস্ত ছাত্র সেদিন সেই দুর্ধর্ষ পাক-বাহিনীকে মোকাবিলা করতে দাঁড়িয়েছিল? একথা সত্য সত্যই বিশ্বাস করা কঠিন। তা হলেও এটাই ছিল বাস্তব ঘটনা।
১৩ই এপ্রিল তারিখে প্রথম সংঘর্ষ ঘটল। দু’পক্ষের মধ্যে গুলিবর্ষণ চলল। ২২টি রাইফেল শত্রুপক্ষের মেসিনগানের জবাব দিয়ে চলেছে; ছাত্ররা বনের আড়ালে আত্মগোপন করে যুদ্ধ করছিল। শত্রুপক্ষের প্রবল গুলিবর্ষণ-সত্ত্বেও তাদের মধ্যে একজনও নিহত বা আহত হয় নি। পরে জানা গিয়েছিল এই দিনের যুদ্ধে ছাত্রদের গুলিতে প্রতিপক্ষের একজন ট্রাক-ড্রাইভার ও একজন জিপ-ড্রাইভার মারা গিয়েছিল। বেশ কিছুটা দূর থেকে গুলি বিনিময় চলছিল। এইভাবে বাধা পেয়ে পাক-সৈন্যরা অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments