বই
প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ
সত্যেন সেনের প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ বইটি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পূর্ব ইতিহাস, রাজনৈতিক চেতনা ও জনআন্দোলনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছে। ব্রিটিশ-পরবর্তী দমননীতি, ভাষা আন্দোলন, ১৯৫২-৭১ পর্বে ছাত্র-জনতার সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম-প্রক্রিয়ার এক সংগ্রামী নথি।
-
বাড়ি? বাড়ি আমার বরিশার জেলার মূলাদি গ্রামে। মূলাদির নাম শোনেন নি?
হ্যাঁ, শুনেছি বৈ কি, উত্তর দিলাম আমি।
ছোটো বেলাতে সখ ছিল মিলিটারিতে যাব। শেষ পর্যন্ত সাংসারিক প্রয়োজনে সেই মিলিটারিতেই ঢুকতে হলো। সৈনিকের জীবনটা ভালোই লাগছিল আমার। বছর কয়েক পরে আমাকে স্পেশিয়াল ট্রেনিং-এর জন্য কোয়েটায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আমি প্যারাট্রুপারের ট্রেনিং নিচ্ছিলাম। একটা শত্রু-অধিকৃত অপরিচিত এলাকায় কি করে ধ্বংস কার্য চালাতে হয় এই ট্রেনিং-এর মধ্য দিয়ে তারই শিক্ষা দেওয়া হয়। এ লাইনে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরা বলেন, একজন দক্ষ প্যারাট্রুপার বহু অসাধ্য সাধন করতে পারে। কথাটা যে কত বড় সত্য, আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা বুঝতে পেরেছি। এই ট্রেনিংটা
-
আমি আর আমার তিনজন সাথী। আমরা গত ক’দিন ধরে ইয়াহিয়ার শিকারী কুকুরগুলির সন্ধানী দৃষ্টি এড়িয়ে পূর্ববঙ্গের সীমান্ত পেরিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে চলেছি। এসব পথ দিয়ে জীবনে কোনোদিন চলি নি। এসব গ্রামের নামও শুনি নি কোনোদিন। কুমিল্লা জেলার গ্রামাঞ্চল। কুমিল্লা জেলার সীমানা ছাড়িয়ে বর্ডারের ওপারে আগরতলায় যাব। আপাতত এইটুকুই জানি, তারপর কোথায় যাব, কি করব, সে সম্পর্কে কোনোই ধারণা নেই। চলার পথের এপাশে ওপাশে, সামনে পেছনে বন্ধুভাবাপন্ন দরদী মানুষ যথেষ্ট আছে, কিন্তু শত্রুও আছে। শত্রুমিত্র বিচার করতে ভুল হলে মারাত্মক বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে।
আজ সারাটা দিন একটানা হেঁটেছি। খাওয়া জোটে নি পথে, ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। বিকেল বেলা
-
খুলনা শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে গেলেও ছাত্রেরা প্রতিরোধ-সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত হয় নি। ২৬-এ মার্চ থেকে শুরু করে ২রা এপ্রিল পর্যন্ত তারা গোপনে নানা জায়গায় পজিশন নিয়ে পাক-সৈন্যদের উপর ইতস্তত চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। এইভাবে তারা বেশ কয়েকজন সৈন্যকে হত্যা ও জখম করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু একথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই গুপ্ত আক্রমণ চালাবার কালে কোনো ছাত্র মারা যায় নি বা শত্রুর হাতে ধরা পড়ে নি।
২৮-এ এপ্রিলের যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাই বলে তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় নি। শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণ করবার জন্য তারা বাগেরহাটে গিয়ে মিলিত হলো। বাগেরহাটে প্রাক্তন
-
ঘটনাচক্রে ছেলেটির সাথে দেখা হয়েছিল। কাঁচা বয়সের কলেজের ছাত্র। এক সঙ্গে পথ চলতে চলতে তার মুখে এই কাহিনী শুনেছিলাম। সে যেমন করে বলেছিল, আমিও তেমনি ভাবে বলতে চেষ্টা করছি।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা ভেঙে গেছে। সংবাদটা সমস্ত শহরবাসীর মনের উপর কালো ছায়ার মত নেমে এসেছে। বাতাসটা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে। বেশ বুঝতে পারছি, এক মহাবিপর্যয়ের ধারালো খড়গ ক্ষীণ সূত্রে আমাদের মাথার উপর ঝুলছে, যে-কোনো সময় তা ছিঁড়ে পড়ে যেতে পারে। আমরা ক’জন বন্ধু সেই কথা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলাম। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর সময়টা-যে এখনই এসে গেছে তা আমরা কেউ ভাবতে পারি নি।
বড় ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের
-
এপ্রিল মাসের তৃতীয় সপ্তাহ।
ভারতীয় বেতার মারফৎ একটি সংবাদ প্রচারিত হলো-ঢাকা শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে কোনো এক জায়গায় পাকিস্তানী সৈন্যদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলছে। খবরটা চাঞ্চল্যকর, বিশেষ করে ঢাকা জেলার লোকদের কাছে। দিনের পর দিন বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে মুক্তিবাহিনীর সক্রিয়তার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঢাকা জেলায় তাদের প্রতিরোধের চিহ্নমাত্র নেই। অবশ্য ২৫-এ মার্চ তারিখে সামরিক হামলার প্রথম রাত্রিতে রাজারবাগের পুলিশ ভাইয়েরা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ দিয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এই কাহিনী অবিস্মরণীয়। তার দুই দিন বাদে নারায়ণগঞ্জ শহরের সংগ্রামী ভাইয়েরা শুধুমাত্র গোটা কয়েক রাইফেলের উপর নির্ভর করে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় সুশিক্ষিত সৈন্যদলকে দুই দিন পর্যন্ত আটকে রেখেছিল। শহরে ঢুকতে দেয় নি।
-
বিক্রমপুরের সুদূর গ্রামাঞ্চলে বসে ভারতীয় বেতারের প্রচারিত সংবাদ শুনছিলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে আকাশবাণী ঘোষণা করছে, ময়মনসিংহ জেলার মধুপুরগড়ে পাক-সৈন্যদলের আর মুক্তিবাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছে।
মধুপুরগড়? চমকে উঠলাম। একসময় এই মধুপুরগড়কে কেন্দ্র করে কতো রোমাঞ্চকর স্মৃতি নিয়ে রোমন্থনই না করেছি। শতাধিক বছর আগে এই মধুপুরগড় আমাদের দেশের রাজনৈতিক আবর্তনের ইতিহাসের পাতায় একটু স্থান করে নিয়েছিল। আজকের দিনে আমাদের কাছে সেই ঐতিহ্য হয়তো তুচ্ছ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু সেদিন এই মধুপুরগড়ে একদল বিদ্রোহীর অভ্যুত্থান সারা বাংলার মানুষের মনে আলোড়ন জাগিয়ে তুলেছিল। সেই বিদ্রোহ আকারে ছোটো হলেও তখনকার দিনের ব্রিটিশ রাজপুরুষরা তাই নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল।
আমি সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের কথা
-
রাত বারোটা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কুষ্টিয়া শহরের লোকের চোখে ঘুম নেই। সারা শহর জুড়ে চাঞ্চল্য আর উত্তেজনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে ঢাকার সঙ্গে টেলিফোনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। একটা ফোনও কাজ করছে না। আজকের দিনে এটা একটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। এর অর্থ কি হতে পারে, তাই নিয়ে তাদের পরস্পরের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে।
শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নয়, শহরবাসী সবাই সচকিত।
এ ক’দিন ধরে নানাদিক থেকে নানারকম জনরব ভেসে আসছিল। সবকিছুর মধ্য দিয়ে এই কথাটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে-এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আসন্ন। সারা বাংলাদেশ জুড়ে যে মুক্তি-আন্দোলন শুরু হয়েছে,
-
ইয়াহিয়ার জঙ্গী বাহিনী ২৫-এ মার্চ তারিখে পাবনা শহরে এসে ঢুকে পড়ল। শহরের মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। শীগ্গিরই এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটে যাবে, তারা মনে মনে এই আশঙ্কা করছিল। কিন্তু সেই ঘটনা যে এতো তাড়াতাড়ি ঘটবে, সেটা তারা ভাবতে পারে নি। এই তারিখেই ঢাকা শহরে আক্রমণ শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেটা গভীর রাত্রিতে। ওরা ২৫-এ মার্চ শেষ রাত্রিতে পাবনা শহরে এসে হামলা করল।
শহর থেকে মাইল চারেক দূরে হেমায়েতপুরের কাছে ইপসিক (ঊচঝওঈ)-এর অফিস। পাক-সৈন্যরা সেইখানে এসে ঘাঁটি গেড়ে বসল। তারপর সেখান থেকে কিছু সৈন্য শহরে এসে ট্রেজারী দখল করে নিল। তাছাড়া ২৭ জন সৈন্য টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কেন্দ্র দখল করে বসল।
-
এককালে এই গানটি আমার খুবই পরিচিত ছিল। শ্রমিকদের সভায়, মিছিলে নানা উপলক্ষেই এই গানটি গাওয়া হতো। প্রায় ৩০ বছর আগেকার কথা। ইতিমধ্যে আমার স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে সেই গানের অধিকাংশ পদগুলি খসে ঝরে পড়ে গিয়েছে। মাত্র প্রথম স্তবকটি আজ মনে পড়ছে। কিন্তু তাও সম্পূর্ণ নয়, দুর্ভাগ্যক্রমে তার প্রথম কলিটির কয়েকটি শব্দ হারিয়ে গিয়েছে। আর যেটুকু মনে আছে, তার মধ্যেও ভুল-ভ্রান্তি থাকার সম্ভাবনা আছে।
সত্যি কথা বলতে কি, এতকাল আমার এই প্রিয় গানটির কথা একেবারে ভুলেই ছিলাম। মনে করিয়ে দিল তিতু, আমার এক বিশিষ্ট বন্ধুর ছেলে তিতু। তিতুদের বাড়ি যশোর জেলায়।
গত বছর কি একটা উপলক্ষে তিতুদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তিতুর সঙ্গে সেই
-
মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের চর এসে সংবাদ দিল, সামরিক ভ্যান-বোঝাই একদল পাক-সৈন্য ফেনী থেকে চন্দ্রগঞ্জের দিকে আসছে। ওদের যখন চন্দ্রগঞ্জের দিকে রোখ পড়েছে, তখন ওরা সেখানে লুটপাট না করে ছাড়বে না। খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান। বেঙ্গল রেজিমেন্টের লুৎফর রহমান, যিনি এই অঞ্চলে একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করেছিলেণ। সৈন্যদের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাট জনের মতো হবে। এদের প্রতিরোধ করতে হলে দলে কিছুটা ভারী হয়ে নেওয়া দরকার। খোঁজ-খবর করে অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ছয় জন মুক্তিযোদ্ধাকে জড় করা গেল।
সাতজন মানুষ, সাতটি রাইফেল। এই সামান্য শক্তি নিয়ে ওদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে যাওয়াটা ঠিক হবে কি? মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। কথাটা মিথ্যা
-
চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধের পর সুবেদার লুৎফর রহমান নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিকারের সন্ধানে ছুটে চলেছিলেন। তাঁর এক মুহূর্তও বিশ্রামের অবকাশ নেই। তিনি পাক-সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে দক্ষ শিকারীর মতো তীক্ষè সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ফিরছিলেন। মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচরেরা নিত্য নতুন সংবাদ নিয়ে আসছে। আর সেই সূত্র অনুসরণ করে তাদের মুক্তিবাহিনী যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই শত্রুদের উপর ঘা দিয়ে চলেছে।
আঘাতের পর আঘাত হানো-কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে, কখনও সামনে থেকে, কখনও বা পেছন থেকে। ওদের অস্থির আর পাগল করে তোলো। ওদের কোনো সময় স্বস্তিতে বা শান্তিতে থাকতে দিও না, ওদের প্রতিটি মুহূর্ত দুর্ভাবনায় কাটুক। ওরা যেন ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠে। মুক্তিবাহিনী এই নীতি অনুসরণ
-
গভীর রাত্রিতে ওরা দিনাজপুর শহরে এসে ঢুকল। এ রাত্রি সেই ২৫-এ মার্চের রাত্রি, যে-রাত্রির নৃশংস কাহিনী পাকিস্তানের ইতিহাসকে পৃথিবীর সামনে চির-কলঙ্কিত করে রাখবে।
ওরা সৈয়দপুর থেকে এসে অতি সন্তর্পণে শহরের মধ্যে ঢুকল। শ’খানেক পাঞ্জাবী সৈন্য। শহরের ঢোকার মুখে প্রথমেই থানা। সৈন্যরা প্রথমে থানা দখল করে নিয়ে সেখানে তাদের ঘাঁটি করে বসল। তারপর তারা তাদের পূর্ব-নির্ধারিত পরিকল্পনা-অনুসারে শহরের টেলিগ্রাম ও টেলিফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলো। সেইদিনই শেষ রাত্রিতে দিনাজপুরের বিখ্যাত কৃষক নেতা গুরুদাস তালুকদার এবং আরও কয়েকজন বিশিষ্ট হিন্দু নাগরিক তাদের হাতে গ্রেফতার হলেন। এমন নিঃশব্দে ও সতর্কতার সঙ্গে এ সমস্ত কাজ করা হয়েছিল যে, শহরের অধিকাংশ লোক তার বিন্দুমাত্র আভাস
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.