প্রতিরোধ সংগ্রামে ঢাকার পুলিশবাহিনী
ঘটনাচক্রে ছেলেটির সাথে দেখা হয়েছিল। কাঁচা বয়সের কলেজের ছাত্র। এক সঙ্গে পথ চলতে চলতে তার মুখে এই কাহিনী শুনেছিলাম। সে যেমন করে বলেছিল, আমিও তেমনি ভাবে বলতে চেষ্টা করছি।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে শেখ সাহেবের আলোচনা ভেঙে গেছে। সংবাদটা সমস্ত শহরবাসীর মনের উপর কালো ছায়ার মত নেমে এসেছে। বাতাসটা যেন ক্রমেই ভারী হয়ে আসছে। বেশ বুঝতে পারছি, এক মহাবিপর্যয়ের ধারালো খড়গ ক্ষীণ সূত্রে আমাদের মাথার উপর ঝুলছে, যে-কোনো সময় তা ছিঁড়ে পড়ে যেতে পারে। আমরা ক’জন বন্ধু সেই কথা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলাম। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর সময়টা-যে এখনই এসে গেছে তা আমরা কেউ ভাবতে পারি নি।
বড় ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন। বড় ভাই ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। ঘরের মধ্যে ঢুকেই তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, এখানে বসে বসে করছ কি তোমরা! এখন কি বসে থাকার সময় আছে। আজ রাত্রিতেই ওরা হামলা করতে আসছে।
হামলা করতে আসছে? কারা?
কারা আবার, মিলিটারি!
আমরা সবাই বসেছিলাম, উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম, সত্যি খবর?
সত্যি বই কি? আমি খুব নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি। এখন, এখন কি করব আমরা? কি করতে হবে? বড় ভাই ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, এক মুহূর্ত দেরী করার সময় নেই। এখনই ছুটে বেরিয়ে যাও তোমরা। পাড়ার সমস্ত ছেলেদের ডেকে জড় কর। মালীবাগ আর শান্তিনগরের মোড়ে ব্যারিকেড গড়ে তুলতে হবে। ইতিমধ্যে অন্যান্য জায়গায় কাজ শুরু হয়ে গেছে। এক্ষুণি চলে যাও। আমাদের হাতে কতটুকু সময় আছে তাও আমরা জানি না। খুব ভালো করে ব্যারিকেড দেবার চেষ্টা করবে। একটা কথা যেন মনে থাকে। এবারকার হামলা কিন্তু অন্যান্যবারের হামলার মতো নয়। এবারকার হামলা এক প্রচণ্ড রূপ নিয়ে আসবে। কিন্তু যতই প্রচণ্ড হোক না কেন আমাদের যেটুকু শক্তি আছে তাই নিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। এ নিয়ে কোনো দ্বিধা বা ইতস্তত করবার মতো সময় নেই।
আমার বয়স আঠারো। এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা খুবই সামান্য। কিন্তু তাহলেও বুঝতে পারছিলাম এবারকার হামলা প্রচণ্ড মূর্তিতে নেমে আসছে। কিন্তু সেই প্রচণ্ডতার রূপটা যে কি হতে পারে আমি কেনো বড় ভাইও তা কল্পনা করতে পারে নি। সারা পূর্ববঙ্গে এমন একটি লোকও নেই যার কল্পনায় একথা আসতে পারে। আমার মনে হয় না পৃথিবীতে এর অনুরূপ দৃষ্টান্ত আছে।
আমরা ক’জন আর দেরী না করে ছুটে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের মালীবাগ পাড়ায় ইতিমধ্যেই খবরটা কিছু কিছু ছড়িয়ে পড়েছে। দেখতে দেখতে মালীবাগের মোড়ে লোকের ভীড় জমে গেল। সবাই উত্তেজিত ভাবে এই নিয়ে নানারূপ জল্পনা-কল্পনা করছে। কিন্তু কি করতে হবে, কেউ স্থির করে উঠতে পারছে না। তবে কিছু তো একটা করতেই হবে। সেই ভীড়ের মধ্যে দুটো একটা গাদা বন্দুক দেখতে পাচ্ছি। এই হাতিয়ার নিয়ে ওরা প্রবল পরাক্রান্ত সামরিক বাহিনীর সাথে মোকাবিলা করতে এসেছে! দেখলে হাসি পায়, দুঃখও হয়। আমরা তাদের সামনে গিয়েই হেঁকে উঠলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছেন আপনারা। এক মুহূর্ত দেরী করার সময় নেই, ব্যারিকেড গড়ে তুলুন। ওরা এসে পড়ল বলে।
এদের মধ্যে ছাত্রের সংখ্যাই বেশী। দু’চারজন বয়স্ক ভদ্রলোকও আছেন। আর আছে রিক্সাওয়ালা, মোটবওয়া মেহনতি মানুষ, যারা এবারকার আন্দোলনে প্রথম থেকে একটা বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করে আসছে। এরা কিছু একটা করবার জন্য অধীর হয়ে উঠেছিল। আমাদের কথা শোনামাত্রই তারা কাজে হাত লাগালো। সামনেই তিতাস গ্যাসের অফিস। সেখানে কতগুলি পাইপ পড়ে আছে। আমরা সেগুলিকে ধরাধরি করে রাস্তার মাঝখানে নিয়ে এলাম। অফিসের লোকেরা আপত্তি জানিয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই আপত্তি টিকল না। কিন্তু এতেও চলবে না, আরো বড় করে, আরো
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments