মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রউফ
বাড়ি? বাড়ি আমার বরিশার জেলার মূলাদি গ্রামে। মূলাদির নাম শোনেন নি?
হ্যাঁ, শুনেছি বৈ কি, উত্তর দিলাম আমি।
ছোটো বেলাতে সখ ছিল মিলিটারিতে যাব। শেষ পর্যন্ত সাংসারিক প্রয়োজনে সেই মিলিটারিতেই ঢুকতে হলো। সৈনিকের জীবনটা ভালোই লাগছিল আমার। বছর কয়েক পরে আমাকে স্পেশিয়াল ট্রেনিং-এর জন্য কোয়েটায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আমি প্যারাট্রুপারের ট্রেনিং নিচ্ছিলাম। একটা শত্রু-অধিকৃত অপরিচিত এলাকায় কি করে ধ্বংস কার্য চালাতে হয় এই ট্রেনিং-এর মধ্য দিয়ে তারই শিক্ষা দেওয়া হয়। এ লাইনে যাঁরা অভিজ্ঞ, তাঁরা বলেন, একজন দক্ষ প্যারাট্রুপার বহু অসাধ্য সাধন করতে পারে। কথাটা যে কত বড় সত্য, আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তা বুঝতে পেরেছি। এই ট্রেনিংটা আমার মনের মতোই হয়েছিল। এবং খুবই দ্রুতগতিতে আমি এ বিদ্যাটা আয়ত্ত করে নিচ্ছিলাম। কিন্তু এই ট্রেনিং-যে একদিন মুক্তি-সংগ্রামের মতো মহৎ কাজে লেগে যাবে, সেটা আমি কল্পনাও করতে পারি নি। আজ আমি এজন্য নিজেকে বিশেষভাবে ভাগ্যবান বলে মনে করি।
মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রউফ তাদের মুক্তিসংগ্রামের কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে নিজের সম্পর্কে এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকাটুকু দিয়ে দিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এই বীরযোদ্ধা কিছুদিন হয় শত্রুদের গুলিতে আহত হয়ে বর্ডারের এপারে এক হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছেন। লোকের মুখে এই খবর পেয়ে তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে গিয়েছিলাম, ইচ্ছা ছিল তাঁর নিজের মুখে তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী শুনব। কিন্তু মনে মনে একটু ভয়ও ছিল। আমি অচেনা অজানা মানুষ, কে জানে হয়তো তিনি মন খুলে আমার সঙ্গে আলাপ করবেন না।
একটু দ্বিধা ও সংশয়ের ভাব নিয়েই আমার এক বন্ধু আর আমি হাসপাতালে তাঁর বেডের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক, বর্তমানে আমাকে বাধ্য হয়ে নিজের দেশের মাটির মায়া ছেড়ে বর্ডারের এপারে চলে আসতে হয়েছে। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে তবে আপনার মুখে মুক্তিসংগ্রামের কাহিনী শুনতে চাই।
আপত্তি! আপত্তি কেনো থাকবে? শিশুর মত সরল হাসি হেসে উঠলেন তিনি। আমরা এসব কথা দেশের লোকের কাছে শোনাতেই তো চাই। শোনাবার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করি। তবে এখানে ঘরের মধ্যে বড্ড লোকের ভীড়। বাইরে চলুন, একটা নিরিবিলি জায়গায় বসে আপনি যা শুনতে চান তা আপনাকে শোনাব। বলতে বলতে মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রউফ উঠে দাঁড়ালেন।
অপরাহ্নের শেষ আলোয় তাঁর দীর্ঘ ছিপছিপে দেহটি একটি তীক্ষè তলোয়ারের মতো আমার চোখের সামনে ঝল্সে উঠল। সাধারণ বাঙালির মতো নয়, বরঞ্চ পাঞ্জাবীদের চেহারার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে। গায়ের রঙ ফর্সা। চোখ, মুখ, নাক সবকিছুর মধ্যে একটা তীক্ষèতার ছাপ। বয়সের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বললেন, বয়সের পাকা হিসাবটা আমার জানা নেই তবে বছর তিরিশেক হবে। বাইরে একটা পছন্দ মতো জায়গা বেছে নিয়ে আমরা তিন জন বসে পড়লাম। আমাদের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে তিনি তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা বলে চললেন। সে সব কাহিনী শুনতে শুনতে আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। এমন প্রতিকূল পরিবেশে একটা মানুষের পক্ষে এত কাজ করা সম্ভব? মাঝে মাঝে সন্দেহ জাগছিল, নিজের বাহাদুরির কথা ফলাও করে প্রচার করবার জন্য বানিয়ে বানিয়ে বলে চলেছেন না তো? কিন্তু পরে বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছিলাম আমার এ সন্দেহটা ঠিক নয়। তখন তাঁর সম্পর্কে এই সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্য নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত বোধ করেছি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হবার ঠিক অল্প কিছু কাল আগেই সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তাঁর স্বদেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে তিনি যশোর ক্যান্টনমেন্টে বেঙ্গল রেজিমেন্টের দলভুক্ত হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে সারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন উত্তাল তরঙ্গ নিয়ে গর্জন করে উঠেছে। স্বাধীনতার এই দুর্বার কামনাকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments