-
অতি প্রাচীন কাল থেকে পুরুষানুক্রমে লোকের মুখে মুখে চলে এসেছে নানা ধরনের লৌকিক কাহিনী, মায়াময় এক জগৎ আর তার নায়কদের নিয়ে গল্প, তাতে ঝলক দিয়েছে রসবোধ, বুদ্ধির চমক, জনসাধারণের প্রজ্ঞা। বহুযুগ ধরে কথন ছিল তার অবলম্বন, কথক এককালে তা নিজে শুনে আবার অন্যদের শোনাত। এই ‘কথন’ থেকেই এগুলির নাম হয়েছে কাহিনী...
অজস্র ইউক্রেনের লৌকিক কাহিনী, তাতে যত নায়ক আর ঘটনার ভিড়, তার কোনোটা খুবই অতীত কালের, কোনোটা আবার তত পুরনো নয়। আশা করি পাঠকদের ভালো লাগবে এ বইয়ের পাত্রপাত্রী, সাধারণ লোকের মধ্যেকার সৎসাহসী সব মানুষদের। আনন্দ দেবে মজার মজার সব কান্ড, পশু-পাখির জ্বলজ্বলে চরিত্র। রূপকথার কাব্যমণ্ডিত নানা ছবিও দেখা যাবে,
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বাজারে গিয়ে বুড়ো একটা পাঁঠী কিনল। বাড়ি নিয়ে এসে রাতে ঘুমাল, পরের দিন বুড়ো ছেলেকে বললে পাঁঠীটা চরিয়ে আনতে। ছোকরা পাঁঠী চরায়, চরাল একেবারে সন্ধে পর্যন্ত। সন্ধেয় তাকে নিয়ে চলল বাড়ি। এল বেড়ার দরজা পর্যন্ত, বুড়ো সেখানে তার লাল বুট পরে দাঁড়িয়ে। শুধাল: ‘পাঁঠী আমার, ছাগলীটি, জল খেয়েছিস তুই, ঘাস খেয়েছিস?’
‘না দাদু, কিছু, খাই নি, দাই নি: কেবল সাঁকো দিয়ে যাওয়া, পাতা খুঁটে নেওয়া, খালের পাড়ে ছোটা, একফোঁটা জল জোটা—ওইটুকুনি ভোজন, ওই তেষ্টা মিটন।’
ছেলের ওপর রেগে গেল বুড়ো, দিল তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে ৷ পরের দিন ছোটো ছেলেকে পাঠাল। ছাগল চরায় সে, চরাল
-
বন দিয়ে চলেছে দাদু, পেছন পেছন কুকুরটা। যায়, যায়, যায়—দস্তানাটি ওদিকে পড়ে গেল। ছুটে এল নেংটি ইঁদুর, দস্তানার ভেতর ঢুকে বললে: ‘এখানে থাকব আমি।’
এইসময় তিড়িক তিড়িক—এল ব্যাঙ। জিগ্যেস করলে: ‘কে গো, কে থাকে দস্তানায়?’
‘কুটুর-কুটুর নেংটি ইঁদুর। কিন্তু তুমি কে?’
‘তিড়িক-ঠ্যাঙ ব্যাঙ। আমাকেও ঢুকতে দাও!’
'এসো।’
হল ওরা দুজন। ছুটছিল খরগোশ, দস্তানার কাছে এসে জিগ্যেস করলে: ‘কে গো, কে থাকে দস্তানায়?’
‘কুটুর-কুটুর নেংটি ইঁদুর, তিড়িক-ঠ্যাঙ ব্যাঙ। কিন্তু তুমি কে?’
‘আর আমি দৌড়-খোশ খরগোশ। আমাকেও ঢুকতে দাও!’
‘এসো।’
হল ওরা তিনজন। ছুটে আসে শেয়ালি: ‘কে গো, কে থাকে দস্তানায়?’
‘কুটুর-কুটুর নেংটি ইঁদুর, তিড়িক-ঠ্যাঙ ব্যাঙ আর দৌড়-খোশ খরগোশ। কিন্তু তুমি কে?’
-
এক-যে ছিল শেয়ালি, নিজের একটা ঘর বানাল সে। ঘরটা বানিয়ে না সেখানেই দিন কাটাতে লাগল। তারপরে তো ঠাণ্ডা পড়ল। ঠাণ্ডায় শেয়ালি জমে যায়, গাঁয়ে ছুটে গেল আগুন আনতে। এল এক বুড়ির বাড়িতে,
বলে: ‘কুশল গো দিদিমা! পরবের দিন, মঙ্গল হোক তোমার। আমায় একটু আগুন দাও, উপকারের শোধ দেব।’
‘তা বেশ শেয়ালি দিদি। বসো, গরম হয়ে নাও, আমি ততক্ষণ চুল্লি থেকে পিঠেগুলো নামাই গে।’
আর বুড়ি তো সেঁকছিল মসলাদার পিঠে। চুল্লি থেকে নামিয়ে সেগুলো টেবিলের ওপর রেখে জুড়তে দিল। শেয়ালির চোখ ওদিকে বড়োসড়ো লালচে রংধরা পিঠেটার দিকে। খপ্ করে নিয়েই, বাস... ভেতরকার পুরটা খেয়ে ফেলে তার জায়গায় যতসব আবর্জনা ঢুকিয়ে তার
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বুড়ো গাছ কেটে তার রসে আলকাতরা বানাত আর বুড়ি দেখত ঘরকন্না।
বুড়ি ঝোঁক ধরল: ‘আমায় একটা খড়ের এঁড়ে বাছুর বানিয়ে দাও!’
‘দূর ছাই, খড়ের এঁড়ে নিয়ে কী হবে তোমার?’
‘ওকে চরাব।’
কী আর করে বুড়ো, খড়ের এঁড়ে বাছুর বানাল, তার গায়ে মাখাল আলকাতরা।
সকালে বুড়ি তকলি নিয়ে চলে গেল এঁড়ে বাছুরটা চরাতে।
ঢিপির ওপর বসে বুড়ি সুতো কাটে আর আওড়ায়: ‘চর, চররে খড়ের এঁড়েটা, আলকাতরা গা! চর, চররে খড়ের এঁড়েটা, আলকাতরা গা!’
সুতো কাটতে কাটতে বুড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।
হঠাৎ ঘুরঘুটি জঙ্গল থেকে, পঞ্চবটী বন থেকে বেরিয়ে এল ভালুক।
সোজা গেল সে এঁড়ের কাছে: ‘কে রে
-
এক-যে বেড়াল আর মোরগছানা। দুজন দুজনকে ভারি ভালোবাসত, সর্বদাই থাকত একসঙ্গে, একটা চাষিবাড়িতে। কাঠ আনবার জন্যে বেড়াল একদিন বনে যাবে, মোরগছানাকে বললে: ‘দেখিস পেতেন্কা, চুল্লির তাকে বসে থাকবি, মিঠে রুটি খাবি, কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দিবি না। নিজেও বেরবি না, যতই কেউ ডাকাডাকি করুক। আমায় বনে যেতে হবে কাঠ আনতে।’
‘বেশ,’ বললে মোরগছানা, বেড়াল বেরিয়ে যেতেই দরজা বন্ধ করে দিল ভালো করে।
ছুটে এল শেয়ালি দিদি, কচি মুরগির মাংস সে সাঙ্ঘাতিক ভালোবাসে।
মোরগছানাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বার করে আনতে চাইল বাড়ি থেকে: ‘আয় বেরিয়ে মোরগছানা! আমার আছে মিষ্টি দানা, জল আছে বেশ টলটলে, নইলে যাব জানলা গলে।’
মোরগছানা জবাব দেয়: ‘কোঁকর-কোঁ, কোঁকর-কোঁ,
-
ছিল একটা লোক, ছিল তার একটা বেড়াল, কিন্তু এতই বুড়ো যে ইঁদুর ধরতে পারত না। বাড়ির কর্তা ভাবলে, ‘এ বেড়াল দিয়ে আমার কী হবে? নিয়ে যাই, বনে ছেড়ে দিয়ে আসি।’ তাই নিয়ে গেল।
আমাদের বেড়ালটি ফারগাছের তলে বসে বসে কাঁদে। ছুটে আসে শেয়ালি দিদি শুধোয়: ‘তুমি কে গা?’
বেড়াল তার লোম ফুলিয়ে বললে: ‘হুঁ-হুঁ-হুঁ, আমি রায়বাহাদুর মার্জারচাঁদ!’
এমন গণ্যমান্য এক মহাশয়ের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় ভারি আনন্দ হল শেয়ালির। বললে: ‘আমায় বিয়ে করো। ভালো বৌ হব আমি। খাওয়াব তোমায়।’
‘বেশ,’ বেড়াল বললে, ‘তা বিয়ে করা যাক।’
কথাবার্তা হয়ে গেল, শেয়ালির বাড়িতে থাকতে লাগল তারা ৷
সবরকমে শেয়ালি তোয়াজ করত তার: কখনো
-
মুরগি চুরি করে শেয়ালি ছুটল। ছুটতে ছুটতে ছুটতে নেমে এল ঘোর-ঘুরঘুটি রাত। দেখে এক চাষিবাড়ি, গেল সেখানে; নিচু হয়ে কুর্নিশ করলে, বললে: ‘কুশল গো ভালোমানুষেরা!
‘কুশল শেয়ালি দিদি।’
‘ভেতরে আসতে দাও, রাত কাটাই এখানে।’
‘হায় রে শেয়ালি দিদি, আমাদের এখানে ঠাসাঠাসি, তোমায় শুতে দেবার জায়গা হবে না।’
‘ও কিছু না, আমি ওই বেঞ্চির তলে গুটিশুটি ঢুকব, লেজটা টেনে নেব, রাতটুকু কেটে যাবে।’
বাড়ির লোকেরা বললে: ‘তাহলে বেশ, রাত কাটাও!’
‘কিন্তু মুরগিটা কোথায় রাখি?’
‘রেখে দাও চুল্লির তলে।’
তাই রাখল সে। আর রাতে উঠল চুপিচুপি, মুরগিটা খেয়ে পালক-টালক ঢিপ করে রাখল কোণে। পরের দিন ভোর-ভোর উঠল, মুখ ধুল ধবধবে করে, বাড়ির
-
একজনের একটা কুকুর ছিল সেরকো, বুড়ো-থুত্থুরে। কুকুরটাকে সে তাড়িয়ে দিলে আঙিনা থেকে। ঘুরে বেড়ায় সে মাঠে, ভারি দুঃখ, তার। ‘কত বছর মালিকের কাজ করলাম, ভালো করে পাহারা দিতাম, আর এখন বুড়ো বয়সে আমায় একটুকরো রুটি দিতেও ওর কষ্ট হয়, তাড়িয়ে দিলে বাড়ি থেকে।’ ঘুরে বেড়ায় আর এইসব ভাবে... দেখে—নেকড়ে আসছে। নেকড়ে তার কাছাকাছি এসে শুধোয়:
‘ঘুরে ঘুরে বেড়াস কেন?’
সেরকো বললে: ‘কর্তা তাড়িয়ে দিয়েছে, তাই ঘুরে বেড়াই।’
নেকড়ে বললে: ‘কর্তা যাতে তোকে আবার ফেরত নেয়, তার ব্যবস্থা করব?’
সেরকোর ভারি আনন্দ হল: ‘কর ভাই, কর! আমি তার শোধ দেব।’
নেকড়ে বলে: ‘তাহলে শোন, কর্তা-গিন্নি যখন ফসল তুলতে যাবে, গিন্নি ছেলেটিকে
-
বনের পশুরা একদিন জুটে পরামর্শ করতে লাগল কাকে রাজা করা যায়, সবাই যাকে কেবল ভয়ই করবে না, ন্যায্য বিচারক বলে মান্যও করবে। কিন্তু রাজা ঠিক করা গেল না—জমায়েতে সবাই আসে নি: সবচেয়ে বড়োসড়ো বলবান জন্তুরাই হাজির ছিল না। তখন ঠিক হল আবার সবাইকে ডাকা হবে―ছোটো থেকে বড়ো পর্যন্ত সবাইকে, যাতে ব্যাপারটা চুকে যায়।
সব জন্তুই এল সেদিন। ছিল: হাতি, সিংহ, বাঘ, জলহস্তী, গণ্ডার, ভালুক, নেকড়ে, হরিণ, উট, শেয়াল, খরগোশ, বনশুয়োর, জেব্রা, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া, গরু, কুকুর, বেড়াল, মেরু-বেড়াল, ধেড়ে ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর, যতরকম জন্তু ছিল দুনিয়ায়; বলতে-কি গাধাও বাদ যায় নি।
সবাই যখন জুটল, প্রথম কথা বলতে শুরু করল হরিণ:
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বুড়ো হল কিন্তু ছেলেপুলে নেই ৷ কষ্ট হয়, দুঃখ, করে, ‘বুড়ো বয়সে কে আমাদের দেখবে? মরণকালে কে আমাদের পাশে থাকবে?” বুড়োকে বুড়ি বলে: ‘বনে যাও গো, আমার জন্যে একটা কাঠের পায়া আর একটা দোলনা বানিয়ে দাও; পায়াটাকে দোলনায় রেখে দোলাব। অন্তত খানিক মন-ভুলানি তো হবে।’
বুড়ো প্রথমটা গা করে নি, বুড়ি কিন্তু কেবলি মিনতি করে; শেষ পর্যন্ত বুড়ো শুনল তার কথা, বনে গেল। কাঠের একটা পায়া চেঁছে তুলল, দোলনা বানাল। বুড়ি পায়াটাকে দোলনায় রেখে দোলায় আর গুনগুন করে:
তেলেসিক, যাদু আমার,
রেঁধেছি তোর জইয়ের মাড়,
রেঁধেছি তুলতুলে খাবার,
তেলেসিক, যাদু আমার!
দোলাতে, দোলাতে, শেষে ঘুমিয়ে
-
অনেকদিন আগে, কেউ জানে না কবে, ভরত পাখি ছিল রাজা, আর মূষিকা ছিল রানী। নিজেদের মাঠ ছিল তাদের। গম বুনল তাতে। গম ফলার পর দানা ভাগাভাগি করতে লাগল। কেবল একটা দানা রয়ে গেল বাড়তি। মূষিকা বললে: ‘ওটা আমিই নিই।’
কিন্তু ভরত বলে: ‘না, ওটা আমার।’
‘বেশ, আধাআধি চেরা যাক।’
ভরত পাখি রাজি হল। ভাঙার জন্যে দানায় কামড় দিয়েই-না মূষিকা সেটা মুখে করে পালাল গর্তে। ভরত পাখি তখন জিগির দিলে, মূষিকা রানীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়ো করল বনের সব পাখি, রানী জড়ো করল সব পশুদের, যুদ্ধ বাধল।
লড়াই চলল সারা দিন, সন্ধেয় জিরিয়ে নেবার জন্যে থামল সবাই। মূষিকা রানী তাকিয়ে দেখে, ডাঁশেরা
ক্যাটাগরি
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.