-
সেদিন বিকেলে ঝন্টুদের রোয়াকে বসে আমি, ঝন্টু আর খুরশীদ গল্প করছিলাম। এমন সময় নোটন এসে উপস্থিত হলো। এসেই বলল: আষাঢ়ে গল্প হচ্ছে বুঝি।
কটু বলল: আষাঢ়ে গল্প করব কেন? আমরা করছি শ্রাবণী গল্প।
আমি আরও একটু বিদ্যা জাহির করবার জন্য বললাম: আরে এতো কার্তিক মাস। কার্তিক মাসে শ্রাবণী গল্প করে নাকি?
খুরশীদ বলল: ঠিক বলেছিস। কার্তিক মাসে কার্তিকী গল্প বলাই ভালো। 'ক' দিয়ে যে সব লোকের নাম হয় তাদের গল্প বল।
নোটন বলল: কায়েদে আজমের গল্প বল।
কটু ফস করে বলল: কায়েদে আযমের কথা আমরা সবাই জানি। কালিদাসকে নিয়েই আরম্ভ কর।
খুরশীদ বলল: দূর, তোদের ঐ কালিদাস টালিদাস বাদ দে।
-
সকালের নাস্তা সকাল-সকাল শেষ করার জন্য বড় বড় নাস্তার ডিমগুলি সামনে রেখে আমরা সবাই গোল হয়ে বসে আছি। নানাবাড়ির রান্নাঘরের লাগোয়া ঘরটার মেঝেতে পাটি বিছিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। লাল আটার মোটা মোটা রুটি, বুটের ডাল, পাঁচ রকমের মিশেলে দেওয়া সবজির নিরামিষ, গরুর মাংসের ভুনা, নারকেলের সন্দেশ আর রসমালাই নিয়ে নানাভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি, তিনি এলেই খাওয়া শুরু হবে। এত সব খাবার অবশ্য প্রতিদিন হয় না। ঢাকা থেকে মেজ খালারা এসেছেন, তাদের জন্যই এই স্পেশাল আয়োজন।
পুবের ঘর থেকে নানাভাইয়ের কোরান-শরিফ পড়ার মিষ্টি করুণ সুর ভেসে আসছে। তিনি সকাল সাতটা পর্যন্ত কোরান-শরিফ পড়বেন সে তো এখনও প্রায় দু’তিন মিনিট বাকি।
-
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মাল নামানো দেখছিলাম। পাশের বাড়ীতে নতুন ভাড়াটে আসছে। দুটো ট্রাক ভরে মাল এসেছে। আর একটা ট্যাক্সিতে করে ভাড়াটেরা এসেছে। ওরা মোট সাতজন। দু'ভাই, তিন বোন আর আব্বা, আম্মা। ওরা যখন নামছে তখন দেখলাম যে আমার চেয়ে কিছু বড় একটা ছেলেও আছে। আমি ভাবলাম, যাক ওর সঙ্গেই ভাব করতে হবে।
বিকেলে ওদের বাসায় গেলাম। বাসার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কে যেন বলল: ভেতরে এস।
আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। দেখলাম সেই ছেলেটি কি যেন বসে বসে লিখছে। সে আমার দিকে তাকালোও না।
আমি একটু অপ্রস্তুতের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। সে বসতেও বলল না। কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকা যায়। সামনের
-
আমাদের ক্লাসটিচার হক সাহেব রিটায়ার করেছেন। তাঁর বদলে আজ নাকি একজন নতুন মাস্টার আসবেন। আমাদের ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের সেরা শয়তানগুলি মানে আমি, করিম, ইকবাল, সিরাজ আর নাসির একথা শুনে তো একবারে মেতে উঠলাম। ক্লাসে এসেই হৈ চৈ শুরু করে দিলাম। নাসির আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল: কিছু ভেবেছিস, কি করবি?
আমি বললাম: ওসব সিরাজই আমার চেয়ে ভাল জানে।
সিরাজ বলল: তোরা কিসুটি ভাববিনে। আমি তো রয়েছি। ক্লাস আরম্ভ হলেই মজা দেখতে পাবি।
সিরাজের উপর আমাদের বেশ ভরসা। আমাদের ধারণা, সিরাজের বুদ্ধি আমাদের সকলের চেয়ে তীক্ষ্ণ (অবশ্য পড়াশোনার বেলায় তার মাথা আমাদের মতই অচল)। তাই সিরাজের উপর আমাদের সকলেরই আস্থা
-
আমার বিশ্বাস, প্রাণকান্ত ভুল করিতেছে।
গণেশ পপুলার লোক। জনপ্রিয় হইতে হইলে যে সকল গুণাবলী থাকা নিতান্তই প্রয়োজন গণেশের সে সকল আছে। সংক্ষেপে, সে মিথ্যাবাদী, মিষ্টভাষী এবং প্রয়োজনীয়। অনর্গল মিথ্যাভাষণ সত্ত্বেও তাহার মিষ্টবচনে আমরা বিগলিত হইয়া যাই এবং নিজেদের প্রয়োজনের খাতিরে তাহাকে ত্যাগ করিতে পারি না। গণেশের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিলে প্রাণকান্তের পরাজয় অনিবার্য।
জনপ্রিয় বলিয়া গণেশ যে অজাতশত্রু এমন কথা বলিতেছি না। জনপ্রিয় বলিয়াই তাহার শত্রু আছে। কিন্তু এই সকল শত্রু এখনও পরোক্ষচারী। প্রকাশ্যত গণেশের বিরুদ্ধাচরণ করিবার মতো শক্তিসংগ্রহ এখনও তাহারা করিতে পারে নাই। মনে মনে তাহারা গণেশ-চরিত্রের ছোট বড় নানা দোষের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে এবং সুযোগসুবিধামতো সেগুলিতে নানা রঙ ফলাইয়া
-
শিশুকে এত ভাল লাগে কেন?
আমার নবাগত দৌহিত্রটি সম্প্রতি আমার মনে এই চিন্তাটি উদ্রিক্ত করিয়াছে। পাঁচ বৎসরের শিশু, কিন্তু তাহাকে লইয়াই সমস্ত দিন মাতিয়া আছি, অন্য কিছু করিবার আর অবসর নাই। কখনও তাহাকে কাগজের নৌকা বানাইয়া দিতেছি, কখনও জাহাজ, কখনও দোয়াত, কখনও ঘুড়ি। শুধু তাই নয়, তাহাকে আমার গৃহিণীর কল্পিত প্রণয়ী ধরিয়া লইয়া তাহার সহিত নানারূপ ছদ্মকলহে প্রবৃত্ত হইয়াছি। বালকটি শিষ্ট নহে, শান্ত তো নহেই।
ইতিমধ্যেই সে আমার হুঁকা উল্টাইয়াছে, কলিকা ভাঙিয়াছে, চশমার খাপটি বারংবার খুলিয়া চশমাটি অধিকার করিতে চাহিতেছে। ধূলিধূসরিত দেহ লইয়া ক্রমাগত আমার ঘাড়ে পিঠে পড়িতেছে। বালাপোশখানার দফা রফা হইয়া গেল।
তথাপি কিছুতেই তাহার উপর চটিতে পারিতেছি না।
-
শেষ পর্যন্ত মনে হয় আমরা আর কাজল মামার জন্য নানাবাড়িতে আসতেই পারব না। নানাবাড়িতে পা ফেলতে-না-ফেলতেই সে লেগে যাবে আমাদের পেছনে। কথায় কথায় নাকাল করবে, প্রতিটি কাজেই বাগড়া দিয়ে হয়রানি করবে অর্থাৎ যে করেই হোক আমাদের জব্দ করবে। আর আমাদের নাজেহাল নাস্তানাবুদ করতে পেরে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়বে।
এই তো দুদিন আগে, নানু আমাকে বললেন, ‘বাবলা, যা তো ভাই, খোকাদের বাড়ি থেকে বড় ঝাঁকি-জালটা নিয়ে আয়। নদীতে নাকি বড় বড় গলদা চিংড়ি পড়েছে। শেষরাত্রে জালালকে পাঠাব মাছ ধরতে’।
সূর্যটা ডুবে গেছে অনেক আগেই। আকাশে কালো কালো মেঘ জমে, চাঁদ তারা সব ঢেকে দিয়েছে। কালো রাত্রি, চারদিক ছাপিয়ে কালো অন্ধকার নেমেছে।
-
গতকাল বিকালে আমাদের হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। এখন বেশ কদিন আর আমাদের স্কুলে যেতে হবে না। আমাদের স্কুলের নিয়ম হচ্ছে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষার পর দশ থেকে বারোদিনের ছুটি। ছুটির দিনগুলিতে টিচাররা আমাদের খাতাগুলি দেখবেন আর আমাদের ফেল করাবেন। ছুটির শেষে তারা খুব হাসি-হাসি মুখ করে ক্লাসে ঢুকবেন। হাতে খাতাগুলি তো থাকবেই আরও থাকবে তিন-চারটা করে বেত। ফেল-করাদের পিঠে পড়বে চারটা-পাঁচটা ছ’টা করে বেত।
তবে মার থেকে বাঁচতে আমরাও করি নানান রকম কারিগরি। যেমন মাজুল মামা স্কুলে যায় ‘অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে’ মনি-রবিনের কাঁধে ভর দিয়ে। ওর মুখের দিকে চেয়ে বেত মারা তো দূরের কথা ওকে দুদিনের ছুটি দিয়ে দেন ক্লাস-টিচাররা। রবিন
-
রবিনের হাতে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা কাহিনি ‘দার্জিলিং জমজমাট!’ মনির হাতে ক্রীড়া-লেখক কাজী আবদুল আলীমের ‘খেলাধুলার আইন কানুন’ আর আমার হাতে প্রজাপতি প্রকাশনার বাংলা-অনুবাদ রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘ট্রেজর আইসল্যান্ড’। তিনজনের হাতেই বই কিন্তু কেউ পড়ছি না। পড়ার মতো মনের অবস্থা নেই কারও। তিনজনের মুখই খুব গম্ভীর, ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসছি তিনজনই’।
শেষ পর্যন্ত আমিই প্রথমে একটু সামলে নিলাম। মনের রাগটা ভিতরে রেখেই রবিন-মনির গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে একটা গদগদমার্কা হাসি দিয়ে খুব নরম গলায় বললাম, ‘তা-হলে চল ময়নামতি। কুমিল্লা তো কাছেই, পয়সা খরচও কম হবে। ময়নামতি পাহাড় আর লালমাই পাহাড় তো দেখলামই, অষ্টম শতকে বানানো বৌদ্ধদের শালবন বিহারও দেখলাম। এ-ছাড়া ক্যান্টনমেন্টে
-
নানাবাড়ি পুকুরঘাটে কাত হয়ে থাকা ঝাকড়া-পাতার চালতা গাছটায় বসে ভীষণ জটিল এবং চরম আপমানজনক একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা করছিলাম আমরা চারজন অর্থাৎ দুলুমামা, রবিন, মনি আর আমি। সবার মুখই খুব গম্ভীর, রাগে থমথমে, উত্তেজনায় লাল। কেউ কোনো বলছে না। আসলে কথা বলার মতো মনের অবস্থাই নেই কারও।
বিষয়টা খুলেই বলি তা হলে—
আমাদের তোতা মামা থাকেন কানাডায়, সেখানেই চাকরি করেন, প্রচুর আয়-রোজগার। কদিন আগেই তিনি বাড়িতে বেশ কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। কেন জানি, সেই টাকা পাওয়ার পর থেকেই বাড়ির প্রায় সবাই খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, শরীর স্বাস্থ্যের হয়ে যাচ্ছিল চরম অবনতি। সমুদ্রের বাতাস গায়ে না লাগালে নাকি সেই স্বাস্থ্য উদ্ধারের আর
-
নানাবাড়ির দোতলার দক্ষিণের শেষ ঘরটায় বসে ডিভিডিতে ‘অ্যানাকোন্ডা’ ছবিটা দেখছি আমরা চারজনে। লিলি খালা বসেছে খাটে, রবিন, মনি আর আমি মেঝেয়, পুরু কার্পেটে। কিছুক্ষণ আগে লিলি খালা ডিভিডির কপিটা নিয়ে এসেছে রাস্তার মোড়ের আনন্দ ভিডিও থেকে, সাথে জুটে গেলাম আমরা তিনজনও। ওদিকে ছবিটি শুরু হতে-না-হতেই ননী মামা এসে হাজির, আমাদের পিছন থেকে টিভির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। পরে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
রোমহর্ষক সিনেমা। একদল অভিযাত্রী একটা বৈজ্ঞানিক অভিযানে যায় ব্রাজিলের আমাজান জঙ্গলে। সেখানেই পড়ে যায় ভয়ঙ্কর এক অ্যানাকোন্ডা সাপের পাল্লায়। যদিও শেষ পর্যন্ত জয় অভিযাত্রীদেরই। কিন্তু প্রায় পুরো ছবিতেই সাপটার ভয়াবহ কাণ্ডকারখানা দেখে সত্যিই গায়ের রোম একেবারে
-
শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার আশার গুড়ে এক ট্রাক বালি ছিটিয়ে দিয়ে বৃষ্টিটা শুরুই হয়ে গেল। প্রথমে টিপটিপ ইলশেগুড়ি বৃষ্টি। আমরা এই ইলশেগুড়িকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের কাজ চালিয়েই যেতে থাকলাম। কিন্তু সময় যতই এগিয়ে যেতে থাকল বৃষ্টির তোড়ও ততই বাড়তে থাকল এবং খুব অল্প সময় যেতে-না-যেতেই তা ঝমঝমে বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হলো।
খোলা আকাশের নিচে চাই করা সব জিনিসপত্র নিয়ে আমরা সবাই একেবারে আকূল-পাথারেই পড়ে গেলাম। ‘কী করব, কী করব’ কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। শেষে লিলিখালা কো ত্থকে যেন একটা বিশাল পলিথিনের পর্দা এনে ক্রিকেট-পিচ ঢাকার মতো করে চুলো আর খাবার দাবার সব ঢেকে দিল। নইলে সব ভিজে একাকার হয়ে একেবারে
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.