প্রাণকান্ত
আমার বিশ্বাস, প্রাণকান্ত ভুল করিতেছে।
গণেশ পপুলার লোক। জনপ্রিয় হইতে হইলে যে সকল গুণাবলী থাকা নিতান্তই প্রয়োজন গণেশের সে সকল আছে। সংক্ষেপে, সে মিথ্যাবাদী, মিষ্টভাষী এবং প্রয়োজনীয়। অনর্গল মিথ্যাভাষণ সত্ত্বেও তাহার মিষ্টবচনে আমরা বিগলিত হইয়া যাই এবং নিজেদের প্রয়োজনের খাতিরে তাহাকে ত্যাগ করিতে পারি না। গণেশের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিলে প্রাণকান্তের পরাজয় অনিবার্য।
জনপ্রিয় বলিয়া গণেশ যে অজাতশত্রু এমন কথা বলিতেছি না। জনপ্রিয় বলিয়াই তাহার শত্রু আছে। কিন্তু এই সকল শত্রু এখনও পরোক্ষচারী। প্রকাশ্যত গণেশের বিরুদ্ধাচরণ করিবার মতো শক্তিসংগ্রহ এখনও তাহারা করিতে পারে নাই। মনে মনে তাহারা গণেশ-চরিত্রের ছোট বড় নানা দোষের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে এবং সুযোগসুবিধামতো সেগুলিতে নানা রঙ ফলাইয়া আড়ালে ফলাও করিয়াও থাকে, কিন্তু প্রকাশ্যে তাহারা প্রাণকান্তের সহযোগিতা করিবে এমন আশা করি না। মাঝে মাঝে গণেশের কথা ভাবিয়া মর্মাহত হই। লোকটা পপুলার বলিয়াই বোধ হয় তাহার অন্তরঙ্গ বন্ধু খুব কম। সকলেই স্বার্থের খাতিরে তাহার সহিত লৌকিক ভদ্রতা রক্ষা করে, মৌখিক বিনয় প্রকাশ করে; কিন্তু মনে মনে অধিকাংশ লোকই তাহার উপর অপ্রসন্ন। হিতৈষী বন্ধুর মতো দোষ দর্শাইয়া দুই-চারিটা কথা শুনাইয়া দিবে এমন লোক গণেশের জীবনে নাই বলিলেই চলে। সকলেই তাহাকে খাতির করে, ভোট দেয়, কিন্তু ভালবাসে না। কাগজে কলমে সে জনপ্রিয়, কিন্তু কাহারও অন্তরলোকে তাহার স্থান নাই।
শুধু গণেশ নয়, পৃথিবীসুদ্ধ পপুলার লোকের এই দুর্দশা। নিখুঁত মানুষ কখনও পপুলার হইতে পারে না; চরিত্রে, শিক্ষায়, দীক্ষায় রীতিমত ভেজাল না থাকিলে পপুলার হওয়া শক্ত। খাঁটি সোনা দৈনন্দিন ব্যবহারের পক্ষে অচল, সখাদ গিনি সোনারই বাজারে সমধিক প্রচলন। প্রচলন বটে, কিন্তু খাদের সম্বন্ধে আমরা উদাসীন থাকি না। রীতিমত কষিয়া আমরা তাহার পরিমাণ নির্ধারণ করি এবং খাঁটি সোনার সহিত তুলনামূলক সমালোচনা করিয়া অ-খাঁটি সোনাকে হীনতর স্থান দিয়া থাকি। তেমনই স-খুঁত চরিত্র লইয়া এবং স-খুঁত চরিত্রের জোরেই কোনোক্রমেই যেই একটি মানুষ পপুলার হইয়া উঠেন অমনই তাঁহার চারিত্রিক খুঁতগুলিও লোকচক্ষে স্পষ্টতররূপে প্রতীয়মান হইয়া নিন্দার ন্যায্য খোরাক যোগাইতে থাকে। পপুলারিটি-গগনে ক্রমে ক্রমে মেঘ-সঞ্চার হয় এবং অকস্মাৎ হয়তো ঝঞ্ঝাবৃষ্টির সূচনাও করে।
সুতরাং বিশ্লেষণ করিলে ইহাই দেখা যাইতেছে যে নির্দোষ লোক পপুলার হয় না, এবং পপুলার হইবার পরই তাহার দোষগুলিও পপুলার হইয়া পড়ে।
চন্দ্র পপুলার, তাহার কলঙ্কটাও পপুলার।
সূর্য পপুলার, তাহার স্পটগুলিও ক্রমশ পপুলার হইয়া উঠিতেছে।
সুতরাং পপুলারিটি-কামী ব্যক্তিমাত্রেরই প্রণিধান করিয়া দেখা কর্তব্য যে, যে সকল চারিত্রিক ত্রুটিকে মূলধন করিয়া তিনি জনসমাজে আধিপত্য বিস্তারের আশা করিতেছেন সেই সকল ত্রুটি পরে যদি ঘরে ঘরে আলোচিত হইতে থাকে, তাহা হইলে তিনি তাহা, নির্বিকারচিত্তে সহ্য করিতে পারগ কি না!
যদি অপারগ হন, তাহা হইলে তাঁহার ও-পথ ত্যাগ করাই উচিত।
প্রাণকান্ত ভোট-যুদ্ধে গণেশের সহিত পারিবে কি না তাহা আলোচনা করাও এ ক্ষেত্রে আমি অপ্রাসঙ্গিক মনে করিতেছি। কারণ প্রিয়বন্ধু প্রাণকান্তকে যতদূর জানি তাহাতে পপুলারিটি-মার্গে স্বচ্ছন্দে চলিবার মতো চলিষ্ণুতাই তাহার নাই।
সে সমালোচনা-অসহিষ্ণু। প্রায়ই সত্য কথা বলে। তাহার মনের কথার এবং মুখের কথার অসঙ্গতি খুব বেশি লক্ষ্য করিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না। ধর্মানুমোদিত বিবেকবাঞ্ছিত পথে চলিবার দিকেই তাঁহার ঝোঁক বেশি। এরূপ লোক ভোট সংগ্রহ করিতে পারিলেই যে পপুলার নেতা হইয়া উঠিবে এমন আশা দুরাশা। কুজপৃষ্ঠ উষ্ট্রের পক্ষে সূচের ছিদ্রপথ দিয়া ন্যুজ দেহটা পার করিয়া লওয়া সম্ভব হইলেও হইতে পারে, কিন্তু প্রাণকান্তের পক্ষে পপুলার নেতা হওয়া অসম্ভব।
সুতরাং তাহাকে ও-পথে যাইতেই দিব না।
আমি গণেশকেই ভোট দিব। বন্ধু বলিয়াই প্রাণকান্তকে এ বিপদ হইতে রক্ষা করা আমার কর্তব্য। আগামী উনিশ তারিখে পোলিং। মাঝে আর তিনটা দিন বাকি। পোলিং-স্টেশনও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments