চোরের ফাঁদ
নানাবাড়ির ড্রয়িংরুমের নরম কার্পেটে বসে টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখছি রবিন, মনি আর আমি। আইসিসি চ্যাম্পিয়ান ট্রফির ফাইনাল খেলছে ইংল্যান্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আমরা তিনজনই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাপোর্টার। ইংল্যান্ড প্রথমে ব্যাটিং করে মাঝারি ধরনের একটা স্কোর করেছে। কিন্তু ওই রান চেজ করতে গিয়েই ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রায় সব ব্যাটসম্যান একেবারে কুপোকাত। কিন্তু শেষদিকে ব্রাডস ও ব্রাউনের দুর্দান্ত লড়াই খেলাটাকে দারুণভাবে উপভোগ্য করে তুলল।
আমাদের একটু পেছনেই বড় সোফাটায়ার খুব আয়েশী ভঙ্গিতে বসে সত্যজিৎ রায়ের জমজমাট গোয়েন্দা কাহিনি ‘দার্জিলিং জমজমাট’ পড়ছে টুটুল মামা। মাঝে-মধ্যে আবার ঢাউস সাইজের একটা নোটবুকে কী যেন লিখছে আর হাসছে মুচকি মুচকি।
খেলা শেষ। শেষ পর্যন্ত জিতে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজই। আমরা তিনজনই খুব খুশি হয়ে হইচই করছি। ঠিক সেই সময়ে টেবিলে ঠকাস করে বইটা রেখে উঠে দাঁড়ালো টুটুল মামা। তারপর মুখে রাজ্যের বিরক্তি এনে ভুরু দুটি কুঁচকে বলল, ‘রাবিশ, এক্কেবারে রাবিশ’।
আমি চারদিকে চেয়ে রাবিশের কিছু না দেখে অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের কথা বলছ? ব্যাটিং না বোলিং?’
রবিন একটু টিটকারি দিয়ে বলল, ‘নাকি তোমার ঐ দার্জিলিং জমজমাট’।
‘ধ্যাত!’ ধমকে ওঠে টুটুল মামা। ‘আমি বলছি তোদের এই থার্ডক্লাস শহরটার কথা’।
কথাটা কানে যেতেই সোজা হয়ে দাঁড়ালাম আমি আর রবিন। মনি তো এক লাফে টুটুল মামার সামনে গিয়েই দাঁড়াল। এই শহরেই আমাদের জন্ম, এখানেই আমরা বড় হয়েছি। জন্ম-শহরের এই তীব্র অপমানে আমরা তিনজনই রীতিমতো রেগে গেলাম। মনি খুব গম্ভীর হয়ে বলল, ‘কেন, কী হয়েছে?’
‘কী হয়েছে!’ মনিকে খুব বিচ্ছিরিভাবে ভেংচিয়ে দিলো টুটুল মামা। তারপর আমাদের নাকের ডগায় আঙুল ঘুরিয়ে ক্যাটক্যাট গলায় বল্ল, ‘এখানে অলিতে-গলিতে ক্রিকেট খেলা হতে পারে, প্রতি বছর টাউন হলে বই-মেলা হতে পারে, হরতাল-মিছিল-শ্লোগান হতে পারে—কিন্তু চুরি, ডাকাতি, হাইজ্যাক খুব কিছুই বুঝি হতে পারে না—না! যত্তোসব অপদার্থ, ভীরু কাপুরুষের দল।’
সাথে সাথে টুটুল মামার ক্ষোভের কারণ বুঝে ফেললাম। আমি গলায় নকল সহানুভূতির সুর এনে বললাম ‘তা ঠিক ও সবও হওয়া উচিত!’
আমার বলার ভঙ্গি দেখে রবিন আর মনি দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল। সাথে সাথে আমিও। টুটুল মামা খুব রেগে গিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে বাইরে চলে এলো।
টুটুল মামার রেগে যাওয়ার কারণটা খুলেই বলি তাহলে। সে আম্মার ফুফাতো ভাই। ঢাকায় কলেজে না ভার্সিটিতে পড়ে। থাকে ওর এক চাচার বাসায়। তিনি গোয়েন্দা বিভাগের বড় অফিসার। ও-দিকে টুটুল মামা নিজে আবার গোয়েন্দা গল্পকাহিনীর দারুণ ভক্ত। সেই বুড়ো শার্লক হোমস থেকে শুরু করে হাল আমলের ফেলুদা পর্যন্ত সবার কাহিনী পড়তে পড়তে সবই একেবারে মুখস্থ করে ফেলেছে। দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন কোনো কিছুই বাদ রাখেনি।
একদিকে গল্প-কাহিনীর গোয়েন্দা, অন্যদিকে বাস্তবের গোয়েন্দা দুই-ই মনে হয় টুটুল মামার কাঁধে খুব শক্ত করেই ভর করেছে। গোয়েন্দা-কাহিনী পড়তে পড়তে এবং গোয়েন্দা-চাচার বাসায় থাকতে থাকতে তাই টুটুল মামার স্থির বিশ্বাস জন্মেছে ও নিজেও একজন জাঁদরেল গোয়েন্দাই বনে গিয়েছে। এখানে এসে সে প্রতিদিনই বলে বেড়াচ্ছে—‘লেখা-পড়া চাকরি-বাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য এসব আমার কাজ নয়রে, বুঝলি। গোয়েন্দাগিরিই হচ্ছে আমার আসল লাইন। চুরি-ডাকাতি, হাইজাকিং কিংবাা খুনের রহস্য সমাধান করা এখন আমার কাছে—ডানহাতের দুআঙুলে চকাট করে একটা শব্দ করে বুঝিয়ে দিলো খুবই সোজা।
কিন্তু মুশকিল হলো, আমাদের এই ছোট শহরে খুন তো দূরের কথা, ডাকাতি কিংবা হাইজ্যাকিং -ই হয়েছে কখনো মনে পড়ে না। আর চুরিও যা হয়, তাকে চুরি বললে চোরদের বরং অপমানই করা হবে। এই যেমন জনিদের গাছের আম, আনিসদের ঘরের মুরগি. অনীকের একটা ভাঙা ক্রিকেট-ব্যাট, নিঝুম আর রিংকুর পুরনো জামা-কাপড় ইত্যাদি ইত্যাদি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments