নাইজেরীয় ভাষা
গতকাল বিকালে আমাদের হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। এখন বেশ কদিন আর আমাদের স্কুলে যেতে হবে না। আমাদের স্কুলের নিয়ম হচ্ছে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষার পর দশ থেকে বারোদিনের ছুটি। ছুটির দিনগুলিতে টিচাররা আমাদের খাতাগুলি দেখবেন আর আমাদের ফেল করাবেন। ছুটির শেষে তারা খুব হাসি-হাসি মুখ করে ক্লাসে ঢুকবেন। হাতে খাতাগুলি তো থাকবেই আরও থাকবে তিন-চারটা করে বেত। ফেল-করাদের পিঠে পড়বে চারটা-পাঁচটা ছ’টা করে বেত।
তবে মার থেকে বাঁচতে আমরাও করি নানান রকম কারিগরি। যেমন মাজুল মামা স্কুলে যায় ‘অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে’ মনি-রবিনের কাঁধে ভর দিয়ে। ওর মুখের দিকে চেয়ে বেত মারা তো দূরের কথা ওকে দুদিনের ছুটি দিয়ে দেন ক্লাস-টিচাররা। রবিন স্কুল-ইউনিফর্মের নিচে মোটা ফুলহাতা সুয়েটার পরে যায়। মারগুলি যায় সুয়েটারের উপর দিয়েই। আমি একটা বেত পিঠে পড়তেই চিৎকার করে আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে ফেলি। স্যারেরা দয়া পরবশ হয়ে পরেরগুলি মাফ করে দেন। মনির কথা অবশ্য আলাদা। শুধু চার-পাঁচটা কেন ও-রকম দু-দশটা বেত পিঠে ভাঙলেও ওর কিছুই হয় না, এমন শক্ত ওর চামড়া। আমাদের শাহেদ স্যারের ধারণা, মনি আসলে আফ্রিকান গণ্ডার মানুষের রূপ ধরে পড়তে এসেছে।
এসব ঘটনা অবশ্য স্কুল খোলার পরে ঘটবে। আর ও-সব ভেবে ছুটির এই মজার দিনগুলি নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। কিন্তু গতকাল বিকেলে আমাদের ক্যাপ্টেন মাসুল মামা ঢ্যাং ঢ্যাং করে চলে গেল লুৎফর খালার বাড়ি সেই নৈনিপাহাড়ে। আমাদেরও টানাটানি করেছিল। কিন্তু কে যায় ওই অজ-পাড়াগাঁয়ে।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছি মাসুল মামা যতই আমাদের কান ধরে টান দিক কিংবা গাট্টা মেরে মাথার আলু বানাক অথবা ঠকবাজি করে আমাদের পয়সায় সিঙ্গারা-সমুচা খাক তবুও ওকে ছাড়া আমাদের মজার অর্ধেকটাই কম পড়ে যায়।
আমরা তিনজন মন-টন খারাপ করে নানা-ভাইয়ের মস্ত নারকেল বাগানে গিয়ে বসে রইলাম। মন খারাপ হলেই মনির আবার খুব খিদে পায় এরই মধ্যে সে চারটি ডাব, দুটি বড় পেয়ারা, ছ’টা আমলকি খেয়েছে। আর এখন চাকুম-চুকুম করে একটা নারকেল খাচ্ছে। চালতা গাছের উঁচু দিকটাতে যেখানে মাসুসম মামা বসে সেখানে বসে রবিন (ভাবখানা মাসুলমামা না থাকলে সে-ই ক্যাপ্টেন) নিজের সুরে ‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি ওর একটু নিচে বসে আমি একটা আমলকি খাচ্ছি’।
ঠিক সেই সময় তেড়ে-তিড়িং তিড়িং শব্দে সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে হান্নান মামা এসে থামল আমাদের সামনে। সিটে বসেই একটা পা মাটিতে ঠেকিয়ে হাঁক ছাড়ল হাই পেরান থেরান মরুংগা।
হান্নান মামার সাথে মাসুল মামার সম্পর্ক একেবারে সাপে-নেউলে। তাই আমাদের সাথেও ওর সম্পর্ক খুব ভালো না। সাধারণত ওকে আমরা পাত্তা দিই না। ওর কথাটা কানে যেতেই রবিন ‘আজ আমাদের ছুটিও পর্যন্ত গিয়েই দুই ঠোঁট গোল করে ‘ও-ও’ করতে লাগল। মনি বড় একটা নারকেলের টুকরায় জুতসই করে কামড় বসিয়েছিল সেটা ওর ডান গালে উঁচু হয়ে আটকে রইল। আমি উল্টে পড়তে পড়তে সামলে নিলাম। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘কী হাউ-কাউ করে পাগলের মতো চিৎকার করছ’।
হান্নান মামা সাইকেলটাকে সামনের আমলকিগাছে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ডানহাতের দুআঙুলে চকাট করে একটা তুড়ি মেরে বলল, ‘আরে পাগলের হাউ-কাউ না। এটার মানে হচ্ছে দারুণ খবর খুশির খবর। তোরা অবশ্য বুঝবিনে, নাইজেরীয় ভাষা কিনা!
‘নাইজেরীয়! গুলপট্টি মারার আর জায়গা পাও না’, বলল মনি চড়া গলায়। এরপর সে আবার কচমচ করে নারিকেল চিবাতে লাগল।
এবার মুখ খুলল রবিন। হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি তো বাংলাটাই ভালো করে বলতে পারো না। নাইজেরীয় ভাষা আবার শিখলে কবে!’
হান্নান মামা একটা হাইক্লাস হাসি দিয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments