গুণুপণ্ডিতের গুণপনা

আমার পিসিমা ভীষণ ভালো হলেও বেজায় ভীতু। সব জিনিসে তার ভয়। যেখানে যা আছে তাতে তো ভয় আছেই, আবার অনেক জিনিস নেই তাকেও ভয়। বড়দিনের ছুটিতে একবার গেছি তার বাড়িতে। মফঃম্বল শহর। খাবার-দাবারের ভারি সুবিধা। হপ্তায় হপ্তায় ধোপা আসে, কুড়ি টাকা মাইনেতে এক্সপার্ট চাকর পাওয়া যায়। বাড়ির সামনে এবং পিছনে নিজেদের বাগান, দুপাশে পাশের বাড়িগুলোর বাগান; সামনে ডাক্তারের বাড়ি। মোড়ের মাথায় সিনেমা। খেলার মাঠে প্রতিবছর এই সময় গ্রেট সরোজিনী সার্কাসের তাঁবু। তাছাড়া ওখানকার প্যাঁড়া আর ক্ষীরের পান্তুয়া বিখ্যাত। আর এন্তার মুর্গি পাওয়া যায়। এমন জায়গা ঝপ করে বড় একটা দেখা যায় না।

সন্ধ্যার আগেই ট্রেন থেকে নেমেছি। শিরশির করে গাছের পাতার মধ্যে দিয়ে হাওয়া বইছে। ঠংঠং করে কোথায় একটা কাঠঠোকরা গাছ ঠোকরাচ্ছে। লোকের বাড়িতে উনুনে আঁচ পড়েছে। পিসিমার গেটের ওপরে থোকা থোকা ফুল ফুটেছে। সেদিন রাত্রে যখন বড় খাটের পাশে আমার ছোট নেওয়ারের খাটে লেপ মুড়ি দিয়ে শুলাম, তখন খালি মনে হচ্ছিল দশ দিনের বদলে যদি একশো দিন এখানে থাকতাম কি মজাটাই না হত!

কিন্তু সেকালের এক ঋষি যে কথা ভূর্জপাতার খাতায় খাগের কলমে লিখে গেছেন যে এ পৃথিবীতে নিরবচ্ছিন্ন সুখ বলে কিচ্ছু হয় না, সেটা ঠিক। পরদিন ভোরে পিসিমার সঙ্গে নিচে নেমেছি। পিছনের বারান্দার জালের দরজার ছিটকিনি খুলে গয়লানীর কাছে আমার জন্যে বেশি করে দুধ নেওয়া হচ্ছে, এমন সময় গয়লানী বললে—তালার ব্যবস্থা করুন মা। জালের ফোঁকর দিয়ে হাত গলিয়ে এ দরজাটা খুলে ফেলতে দুষ্ট লোকের কতটুকু সময় লাগবে!

পিসিমা বললেন—‘কি বলিস বাতাসি, শুনলেও হাত-পা কাঁপে।’

বাতাসি বললে—‘না, বলানগড়ের জেলখানা থেকে গুণুপণ্ডিত পালিয়েছে কি না তাই বলছিলাম।’

গুণুপণ্ডিতের নাম শুনেই পিসিমার বুক কেঁপে উঠল। তাই জোর করে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তুইও যেমন, কি এমন সোনাদানা আছে আমার ঘরে যে জেলভাঙা ডাকাত ধরা পড়বার ভয় ভুলে আমার বারান্দার ছিটকিনি নামাবে?’

দুধের ক্যানেস্তারা নামিয়ে সিঁড়ির উপর বসে পড়ল বাতাসি। আমার দিকে তাকিয়ে এতটা গলা নামিয়ে যাতে আমি স্পষ্ট শুনতে পাই, বললে—‘আহা সোনাদানা নয়, ওনাদের দল আছে, ত ছেলেধরা করে নিয়ে যায়। তারপর বেনামা চিঠি দেয় সুঁদরিবনে কালী-মন্দিরের পেছনে বটতলাতে হাজার টাকা পুঁতে এসো ত ভাইপো ফিরিয়ে দেবে! না দিলে—’ এই বলেই বাতাসি এমন ভাবে চুপ করল যে পিসিমা কেন, আমারই গা শিউরে উঠল।

বারান্দার কোণায় কাঠের টেবিলে বড় স্টোভে পিসিমার বুড়ো চাকর হরিন্দম চায়ের জল ফুটোচ্ছিল, সে এবার বেরিয়ে এসে বললে—‘আর ভয় দেখাবার জায়গা পাস নি বাতাসি? ছেলেকে কেউ নিয়ে গেলে ফেরত দেবার জন্যে পয়সা চাইবে না, বরং পয়সা দিয়ে ফেরত দেবে।’

বাবা বলেন হরিন্দম বলে নাম হয় না, অরিন্দম হবে। মনে হতেই বললাম কথাটা। শুনে হরিন্দমের কি রাগ! বললে—‘হ্যাঁ, আমার বাবা নাম রাখল হরিন্দম আর ওনার বাবা তার চেয়ে বেশী জানেন! তাও যদি তাকে দাদামশায়ের কাছে কানমলা খেতে না দেখতাম।’

পিসিমা রেগে গেলেন—‘ওসব কি শেখাচ্ছ বাপকে অশ্রদ্ধা করতে, হরিন্দম?’

হরিন্দম বললে, ‘হরি মানে ভগবান, তা ভগবানের নাম এনাদের সব আজকাল ভালো লাগবে কেন? অরিন্দম একটা নাম হল?’

বাতাসি হেসে দুধের ক্যানেস্তারা নিয়ে উঠে পড়ল। যাবার আগে বলল, ‘দুধ নেবার সময় দারোগাবাবুর মা বললেন, গুণুপণ্ডিত এদিককার ছেলে নয়, কড়িগাছায় ওদের সাত পুরুষের বাস। সেখানেই পুলিশ আগে যাবে গো মা, কাজেই সেদিকে না গিয়ে আগে এদিকে তার আসা! পরে গোলমাল চুকে গেলে পর এই তিন কোশ পথ পেরিয়ে গুটিগুটি হয়তো মায়ের সঙ্গে দেখা করে যাবে! এ আমার দারোগাবাবুর মার মুখ থেকে শোনা মা,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice