শেষ সাফারি
সে দিন রাত্রে মা আমাদের দোকানে গিয়েছিল আর ফিরে আসেনি। কখনো না। কি হয়েছিল? জানি না। আমার বাবাও একদিন চলে গিয়েছিল, কখনো আর ফিরে আসেনি; কিন্তু বাবা তো গিয়েছিল যুদ্ধে, লড়াই করতে। আমরাও তো যুদ্ধের মধ্যেই ছিলাম, কিন্তু আমরা তো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, আমরা ছিলাম আমাদের দিদিমা আর দাদুর মতোই, আমাদের বন্দুক পিস্তল ছিল না। আমাদের বাবা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, আমাদের সরকার তাদের বলতো—ডাকাত—তারা চারিদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল আর আমরা কুকুর খেদানো মুরগির মতো তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। কোথায় যে পালাবো তা জানতাম না। আমাদের মা দোকানে গিয়েছিল, কে যেন তাকে বলেছিল রান্নার তেল পাওয়া যাবে। আমরাও খুশি হয়েছিলাম অনেকদিন তেলের স্বাদ পাইনি; মা হয় তো তেল পেয়েছিল, কেউ হয় তো অন্ধকারে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে তার কাছ থেকে তেল নিয়ে গিয়েছে। হয় তো বা সে ডাকাতের হাতে পড়েছে। তাদের হাতে যদি পড়ো, তাহলে তারা তোমাকে মেরেই ফেলবে। দু’বার তারা আমাদের গ্রামে এসেছিল আর আমরা পালিয়ে গিয়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়েছিলাম, তারা চলে গেলে ফিরে এসে দেখলাম তারা সবকিছু নিয়ে গেছে; কিন্তু তৃতীয়বার যখন তারা ফিরে এলো তখন আর নেবার কিছু ছিল না, না তেল, না খাবারদাবার, তাই তারা ঘরের চালে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল আর আমাদের ঘরগুলোর ছাদ ভেঙে পড়েছিল। মা কয়েক টুকরো টিন খুঁজে এনেছিল আর আমরা সেগুলো আমাদের ঘরগুলোর একটা অংশের ওপর লাগিয়েছিলাম। যে রাত্রে সে আর ফিরে আসেনি তার জন্য আমরা সেখানেই অপেক্ষা করেছিলাম।
বাইরে যেতে আমাদের ভয় করছিল এমন কি ছোট বড় কাজ করবার জন্যও, কারণ ডাকাতরাও এসেছিল। আমাদের বাড়িতে আসেনি—ছাদ নেই দেখে নিশ্চয়ই মনে করেছিল ওটাতে কেউ নেই, সব কিছুই উধাও হয়ে গেছে—কিন্তু গ্রামের মধ্যে এসেছিল। আমরা শুনতে পেয়েছিলাম লোকজন ছোটাছুটি করছে আর চেঁচাচ্ছে। মা ছিল না যে বলবে কোথায় যাবো তাই আমাদের পালাতেও ভয় করছিল। আমি হচ্ছি মেজো মেয়ে আর আমার ছোট্ট ভাইটি, একটা বাঁদর বাচ্চা যেমন তার মাকে করে তেমনি করে দু’হাত দিয়ে আমার গলা আর দু’পা দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমার পেটের কাছে সেঁটে ছিল। সারারাত আমার বড় ভাই আমাদের বাড়ির পোড়া খুঁটিগুলোর একটা ভাঙা টুকরো হাতে রেখে দিয়েছিল। ডাকাতরা যদি তাকে খুঁজে পায় তাহলে সেইটা দিয়ে নিজেকে বাঁচাবে।
সারাটা দিন আমরা ওখানেই ছিলাম। মার জন্য অপেক্ষা করে। সেটা যে কোনদিন তা জানতাম না; আমাদের গ্রামে আর কোনো স্কুল ছিল না আর কোনো গীর্জাও ছিল না, তাই সে দিনটা রবিবার কি সোমবার তা জানাই যেতো না।
সূর্য যখন ডুবুডুবু, আমাদের দিদিমা আর দাদু এসে হাজির হলো। আমাদের গ্রামের থেকে কে যেন তাদের বলেছিল আমরা ছেলেমেয়েরা সব একা আছি, আমাদের মা ফেরেনি। আমি দাদুর নাম করার আগে ‘দিদিমার’ নাম করছি এই কারণে যে ব্যাপারটা ঠিক তেমনই; আমাদের দিদিমা হলো দশাসই আব শক্তসামর্থ্য, এখনও বুড়ো হয়ে যায়নি আর আমাদের দাদু হলো ছোটখাটো, তার ঢিলঢিলে পাৎলুনের মধ্যে তাকে প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না, সে হাসে বটে কিন্তু তুমি কি বলছো তা শুনতেই পায় না, আর তার চুলগুলো দেখে মনে হয় সাবানের ফেনা দিয়ে যেন মাথাটা ভরিয়ে রেখেছে আমাদের দিদিমা আমাদের—আমাকে, বাচ্চাটাকে, আমার বড় ভাইকে আর আমাদের দাদুকে নিয়ে গিয়েছিল তার বাড়িতে, আমাদের সকলের ভয় হচ্ছিল (আমার দিদিমার পিঠে ঘুমন্ত বাচ্চাটা ছাড়া) পাছে পথে ডাকাতদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে যায়। অনেক অনেকদিন ধরে আমাদের দিদিমার বাড়িতে আমরা অপেক্ষা করেছিলাম। বোধহয় একমাস হবে। আমরা খিদেয়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments