স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং মুক্তির গান
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ঘটনা। '৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক গতিধারা উত্তপ্ত বেগে প্রবাহিত হচ্ছিল, তা-ই পরম ও চরম রূপ পরিগ্রহ করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে, যার অনিবার্য ফসল পৃথিবীর মানচিত্রে এ বাংলাদেশ নামের এক নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। অন্যান্য কিছুর সঙ্গে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি হিসেবে লড়াকু জনগণকে কী সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা-উদ্দীপনা-সাহস জুগিয়েছে (অন্যদিকে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের গান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত উৎসাহিত শব্দমালা আর সুরের দৃঢ়তা, উদ্যমতা মুক্তিযুদ্ধে কতখানি অবদান রেখেছিল, তা আর আলাদা করে বলার কিছু নেই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম তৎপরতা। যখন মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়নি তখন এ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ হাতে অস্ত্র নেওয়ার আগে শব্দসৈনিকরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন কণ্ঠে। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরছি। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের পর চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের ট্রান্সমিটারটি কালুরঘাট সম্প্রচার কেন্দ্রে নিয়ে স্থাপন করা হয়। নামকরণ করা হল 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র'। এখানেই ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম সেনানিবাসের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সেই ট্রান্সমিটার থেকে ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার সেই শব্দমালা। সেদিনই বিপ্লবী বেতারকর্মীরা এর নাম পরিবর্তন করে রাখলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী একদিন এ সম্প্রচার কেন্দ্রের খোঁজ পেয়ে গেল। বোমা ফেলা হল, বিধ্বস্ত হল মূল সম্প্রচার কেন্দ্র। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ যে-দশজন তরুণ জীবন বাজি রেখে সেদিন এক কিলোওয়াটের ছোট্ট ট্রান্সমিটারটি নিজেরাই খুলে নিয়ে গিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তে বাসাফার জঙ্গলে পুনঃসংযোগ করেন, সেই অকুতভয় দশ তরুণ-হলেন-সৈয়দ আবদুস শাকের, মোস্তফা আনোয়ার, আবদুল্লাহ আল ফারুক, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, বেলাল মোহাম্মদ, আনিসুর রহমান, রাশেদুর রহমান, শরফুজ্জামান, কাজী হাবিবউদ্দিন আহমেদ মণি ও রেজউল করিম চৌধুরী। এদিকে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় আম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করার পর থেকেই শক্তিধর সম্প্রচার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত সরকার ও জনগণের সহায়তায় সংগ্রহ করা হল ৫০ কিলোওয়াটসম্পন্ন একট মধ্যম তরঙ্গের ট্রান্সমিটার। স্টুডিওর জন্য কলকাতার বালিগঞ্জে একটি বাড়ি পাওয়া গেল। রেকর্ডিং সরঞ্জামও জুটে গেল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিন ১১ জ্যৈষ্ঠ নতুন ট্রান্সমিটার অন এয়ারে যায়। বেতার কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের আবদুল মান্নান এমএনএ। কাজ শুরু হল। অবরুদ্ধ বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও শিল্প-কলাকুশলীরা এসে হাজির হতে থাকলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। চট্টগ্রামের সেই সাহসী দশজনের সঙ্গে যোগ দিলেন কবি-সাহিত্যিক, ভাষ্যকার, লেখক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। আর এটাই হচ্ছে সংক্ষেপে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে এ সেক্টরের অবিস্মরণীয় তৎপরতার এতগুলো তাৎপর্যপূর্ণ দিক থেকে আজ কেবল আমি সঙ্গীতের দিকটিই তুলে ধরতে চাই।
গান চিরকাল মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছে, উদ্বুদ্ধ করেছে, সান্ত্বনা দিয়েছে। পরন্ত বঞ্চিত মানুষের স্বপ্ন আশা ও বিশ্বাসের ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করেছে। প্রথমে সুর দিয়ে। পরে কথা ও সুরের যুগলবন্দিতে। সমষ্টিগত যৌথ মানুষের ক্ষেত্রে গান মুখ্যত অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাকে উদ্দীপত করেছে, তার প্রাণে আগুন ধরিয়েছে, নিপীড়িত মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে অচ্ছেদ্য রাখিবন্ধনে বেঁধেছে। সেই কতকাল থেকেই তো সঙ্গীত আমাদের অতি বিশ্বস্ত-সৃহৃদ এবং সহচর। আমাদের প্রাণান্তকর শ্রমে পরম দরদে সে কপালের ঘাম মুছিয়ে দিয়েছে-শ্রমকে করেছে ছন্দোময়। আমাদের আন্দোলন, সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধকে করেছে চেতনায় উদ্দীপ্ত। লেখা বাহুল্য, এ ভূখণ্ডে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গণসঙ্গীত গৌরবদীপ্ত ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments