এপ্রিলের কঠিন দিনগুলো
লেখক: রিয়ার-অ্যাডমিরাল সের্গিয়েই পাভিচ্ জুয়েল্কো
সামরিক নৌবাহিনীতে চাকরির দীর্ঘ বৎসরসমূহে, বিশেষত উত্তরাঞ্চলীয় নৌবহরে উদ্ধারকারী ও সহায়তাকারী ইউনিটসমূহের অধিনায়কের পদে থাকাকালীন আমি নানা ধরনের আকস্মিক কর্মকাণ্ডে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার দায়িত্বের ধরনটাই এমন ছিল যে, যেখানে যখনই কোনো জাহাজ কিংবা মানুষ দুর্ঘটনাকবলিত হোক তৎক্ষণাৎ সেখানে উদ্ধারকর্মে বেরিয়ে যেতে হবে তা নৌযানে কিংবা উড়োজাহাজে বা হেলিকপ্টারে বা মোটরগাড়ি বা রেলগাড়িতে যেভাবেই হোক। এ সমস্ত ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় জাহাজে রিপোর্ট করার বিষয়ে খুব কড়াকড়িভাবে নিয়ম মানা হত। এ জন্য যেখানেই থাকি আর যাই করি না কেন আমার অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে অবগত রাখা ছিল বাধ্যতামূলক। ফলে, আমার ঘরে সব সময়ে একটা বিশেষ 'দুর্যোগ বাক্স' রাখা থাকত যার ভিতরে যাবতীয় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ছিল।
বিভিন্নস্থানে নৌবাহিনীর ঘাঁটি থাকায় এবং দূরবর্তী অভিযানের প্রয়োজনে প্রতিটি নৌবহরেই উদ্ধারকারী ও সহায়তাকারী ইউনিট থাকত। এই ইউনিটগুলো হচ্ছে-ভারবাহী নৌযান, ট্যাঙ্কার, বিভিন্ন ধাঁচের টাগবোট, মেডিকেল নৌযান, বিভিন্ন বার্জ, উদ্ধারকারী নৌযান, ডুবোজাহাজ, সাধারণ যুদ্ধজাহাজ, ভাসমান ক্রেন, অগ্নিনির্বাপক ষ্টিমার, ডুবুরী বোট, ভাসমান ওয়ার্কশপ ইত্যাদি। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ট্যাঙ্কার, পানীয় জল বহনকারী জাহাজ ও উদ্ধারকারী জাহাজে এমন বিশেষ ব্যবস্থা ছিল যাতে মাঝসাগরেই একইসঙ্গে কয়েকটি জাহাজের ভিতরে লোক, জ্বালানি, মালপত্র ইত্যাদি দেওয়া-নেওয়া করা যায়।
১৯শে মার্চের সকালে কঠিন অনুযায়ী আমি নৌসংশিষ্ট সশস্ত্র বাহিনীর উপপ্রধান রিয়ার-অ্যাডমিরাল এস. এম. নিকলায়েভের নিকট এলাম। আমার রিপোর্ট না শুনেই উনি জানালেন, নৌবাহিনীর কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে বিদেশে কোনো বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য নৌবাহিনীর প্রধানের পদে নিজেই লোক বাছাই করে নেওয়ার। তখনই হঠাৎ একটা জরুরী ঠেলিফোন এল।
নিকলায়েঙ্কে বলতে শুনলাম 'উনি রিপোর্ট করতে আমার সামনে এখন।'
ফোন রিসিভার আমাকে দিলে আমি শুনতে পেলাম নৌবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ অ্যাডমিরাল এন ডি সের্গেইয়েভের কণ্ঠ:
'এক্ষুণি চলে আসুন।'
'আসছি, স্যার।'
অ্যাডমিরাল সের্গেইয়েভের অফিসে ঢুকে দেখলাম ওঁকে ছাড়াও আমার সরাসরি সুপারভাইজারও রয়েছেন—সোভিয়েত ইউনিয়নের 'বীর' খেতাবপ্রাপ্ত রিয়ার-অ্যাডমিরাল এল. এন. বালিয়াকিন্। আমি রিপোর্ট করে অনিচ্ছাকৃতভাবে একটু হাসলাম।
"বসুন। হাসছেন কেন?"
আমি কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়ে জবাব দিলাম, 'কেন ডেকেছেন কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। বিদেশে বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য একজন অ্যাডমিরালের প্রয়োজন।’
বেশ, এতটাই দূরদর্শী হলে এখন প্রধানের কাছে যাই চলুন।
আমি প্রধানের অফিসের অভ্যর্থনাকক্ষে একাকী। প্রায় তখনই বেল বেজে উঠল। তরুণ অ্যাডজুটেন্ট, থার্ড ব্যাঙ্কের ক্যাপ্টেন দ্রুত প্রধানের অফিসে এসে ঢুকলেন।
চওড়া দরজা তখনই খুলে গেল, আর অ্যাডজুটেন্ট আমাকে ভিতরে ডাকলেন। আমি পোশাক ঠিকঠাক করে, চুল আঁচড়ে, ফিটফাট হয়ে ভিতরে গেলাম। অফিসঘরের ভিতরে আমি নৌবাহিনীর সেই বিখ্যাত মানুষটিকে দেখতে পেলাম- বেঁটে মতন, মাথায় চুল কিঞ্চিৎ কম। তিনি ধীরেসুস্থে বিশাল টেবিল ছেড়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি রিপোর্ট করতে তিনি আমার করমর্দন করলেন, চেয়ার দেখিয়ে নিজেও বসলেন, কিন্তু তখনই কথা বলতে মুখ খুললেন না।
আমার পানে তাকিয়ে প্রথমে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন, তারপর বললেন, "আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরকে পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে আমাদের সহায়তা চেয়েছেন-বন্দরকে কার্যকর করে তোলা, ডুবে-থাকা জাহাজ উদ্ধার ও বঙ্গোপসাগর থেকে মাইন সরানোর কাজ। তাঁদের পরিস্থিতি সঙ্গীন হয়ে পড়েছে। নতুন প্রজাতন্ত্রটিক কোনো দেশই সাহায্য করতে চাইছে না। একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নই এ ডাকে সাড়া দিয়েছে। আমাদের সরকার একটি বিশেষ সাহায্য-অভিযান গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমি তার নাম দিয়েছি 'সোভিয়েত উদ্ধারাভিয়ান।' এর বেশির ভাগ জাহাজই প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের অন্তর্ভুক্ত হবে। অভিযানের নেতৃত্বে আমরা আপনাকে রাখতে চাইছি। আপনি এ ব্যাপারে কী মনে করেন?"
এ-হেন প্রস্তাবে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। ওঁকে কী জবাব দেব ভাবছিলাম। দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করা আমার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments