-
যদি বলি ১৯৭১ সালে একটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল, তাহলে সম্ভবত কেউই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তবে একাত্তর সালটিকে যারা 'গণ্ডগোলের বছর আখ্যা দেয়, কিংবা যারা বলে যে ওই বছরে ভারতের উস্কানিতে একটা গৃহযুদ্ধ হয়ে তাদের সাধের পাকিস্তানটি ভেঙে গিয়েছিল—এমন কিছু অর্বাচীন মূৰ্খ বা ধুরন্ধর জ্ঞানপাপী বা কুলাঙ্গার দেশদ্রোহী ছাড়া আর সবাই-যে ওই বছরটিকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর বলে গৌরবে উদ্দীপ্ত হবেন—এমন কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবু এরপরও আমি বলব: আমাদের মুক্তিযুদ্ধটি শুধু আমাদেরই যুদ্ধ ছিল না, ছিল বিশ্বযুদ্ধেরই অংশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রচলিত অর্থে যে আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ হয় নি,—একথা অবশ্যই সত্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই যে বিশ্বব্যাপী
-
‘কারণাভাবাৎ কার্যাভাবঃ’— কারণ ছাড়া কোনো কার্য হয় না, অর্থাৎ বিশ্বে যা কিছু ঘটে তার সব কিছুর মূলেই কোনো-না-কোনো কারণ বিদ্যমান থাকে, বিনা কারণে কিছুই ঘটতে পারে না—দর্শন-বিজ্ঞানের এটিই হচ্ছে মূলকথা। বলা যেতে পারে, এটিই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ সত্য। এই সত্যকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েই আবহমান কাল ধরে মানুষ সত্যের সন্ধানে তথা সমস্ত ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নিরত হয়েছে।
কিন্তু কোনো বিষয়েরই সঠিক কারণটি খুঁজে বের করা মোটেই সহজ কাজ নয়। অনেক কষ্টে যদি-বা একটা কারণ খুঁজে পাওয়া গেল তো, সেই কারণটিরও কারণ খোঁজার তাগিদ এসে দেখা দেয়। দেখা যায় যে, একটা কারণ থেকেই কোনো কাৰ্য সম্পন্ন হয় না বা কোনো ঘটনা ঘটে
-
পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রের অধীনে যখন আমরা বাস করতাম তখন, শুরু থেকেই, কতকগুলো ‘পাকিস্তানী দিবস’ পালন করতে হতো আমাদের। যেমন—তেইশে মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’, চৌদ্দই আগস্ট ‘আজাদী দিবস’, পঁচিশে ডিসেম্বর ও এগারোই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ‘জাতির পিতা'র জন্ম ও মৃত্যুদিবস।
উনিশ শো পঁয়ষট্টি সনের পর থেকে আরও একটি পাকিস্তানী দিবস আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। সেটি ছয়ই সেপ্টেম্বর—‘প্রতিরক্ষা দিবস’। সে-সময়ে পাকিস্তানে চলছিল আইয়ুবি স্বৈরশাসন। সে-শাসনের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। আইয়ুব ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নাম দিয়ে একটি শয়তানি ব্যবস্থা চালু করে একটি পেটোয়া গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছিল। তার আশা ছিল যে আশি হাজার অনুগত মৌলিক গণতন্ত্রীদের দিয়েই দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারকে জোর করে
-
আমি নিজে একজন মাস্টার। ‘শিক্ষক' শব্দটা অনেক ভারী, লোকে মাস্টারই বলে। জীবিকার জন্য আমি মাস্টারি করেছি। জীবিকাই হচ্ছে মানুষের জীবনের আশ্রয়। মাস্টারি করেই আমি জীবিকা নির্বাহ করেছি। তবে অন্য মাস্টারি না-করে অন্যকিছুও তো করতে পারতাম। কিন্তু আমি অন্য কিছু করতে চাইনি। মাস্টারি করতে চেয়েছি, এবং মাস্টারিটাকেই আমার জীবন ও জীবিকার অবলম্বন করে নিয়েছি। মাস্টারি করেই আমি পরিপূর্ণ সুখী। হ্যাঁ, ‘সুখী’ শব্দটাই ব্যবহার করতে চাই আমি।
মাস্টারি ছাড়া যদি অন্য কিছু করতাম, তাহলে আমার জীবিকার মধ্য দিয়ে জীবনের স্বস্তি ও তৃপ্তি আমি পেতে পারতাম বলে মনে করি না। আমার সৌভাগ্য যে আমি মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, মাস্টারই হতে পেরেছি। ছেলেবেলাতেই কী করে
-
মুখ দিয়ে সবে কথা ফুটছে। তখন থেকেই আমাকে সব ব্যাপারে জ্ঞানী করে তোলার জন্য আমার ঠাকুর্দার মানে পিতামহের কী সাংঘাতিক গরজ! মুখে মুখে নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই তার উত্তর দিয়ে, আবার আমার মুখ দিয়ে তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে, পাখি পড়ানোর মতো শেখাতেন—
'তোমার বাড়ি কোন গ্রামে?’—চন্দ্রপাড়া। ‘কোন্ ইউনিয়ন?' -আশুজিয়া। 'থানা?’—কেন্দুয়া। ‘মহকুমা?’—নেত্রকোনা। 'জিলা?’—ময়মনসিংহ।
‘নেত্রকোনা' আর 'ময়মনসিংহ' কথা দুটো নিজেই বারবার আবৃত্তি করতাম। সেই এতটুকু বয়সেই এ-দুটো নামের প্রতি আমার প্রচণ্ড আকর্ষণের একটা গূঢ় কারণ ছিল। আমাদের গাঁয়ের আশপাশের বাজার গুলোতে হাটের দিনে তেল নুন কেরোসিন মাছ তরকারি পাওয়া যেতো, ছোট ছোট লিলি বিস্কুট কিংবা ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া তক্তা বিস্কুটও পাওয়া যেতো; কিন্তু শখের
-
বাংলা কবিতা তথা বাংলা সাহিত্যের কোনো ইতিহাস গ্রন্থেই কবি জালাল উদ্দীন খাঁর নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধুনিক বাংলার বিদগ্ধ কবি বা কবিতা- অনুরাগীদের মধ্যে যাঁরা জালাল উদ্দীন খাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত তেমন মানুষের সংখ্যাও নিশ্চয়ই বেশি নয়। সেই বিরলসংখ্যক মানুষের মধ্যেও কি এমন কাউকে পাওয়া যাবে যিনি অকুণ্ঠচিত্তে জালাল খাঁর রচনাকে বাংলা কবিতার মূলধারার অন্তর্গত বলে বিবেচনা করতে পারবেন? মনে তো হয় না।
আমরা, ‘শিক্ষিত’ মানুষজন, আসলে কতকগুলো দুর্মর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এগুলো ‘আধুনিকতা’র কুসংস্কার। তথাকথিত আধুনিক শিক্ষাই আমাদের মস্তিষ্ককোষে সেইসব কুসংস্কার ঢুকিয়ে দিয়ে নিদারুণ মানস-প্রতিবন্ধের সৃষ্টি করেছে। সে রকম মানস-প্রতিবন্ধের দরুনই আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসকেও আমরা খণ্ডিত করে ফেলেছি, একটা
-
রবীন্দ্রসাহিত্য বিরাট মহাসাগরের মতো। তার কোথায় কি আছে, কোথায় কত গভীরতা এসব নির্ণয় করা যেমন-তেমন কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের কোনো এক কবিতায় তিনি তাঁর অনবদ্য ভঙ্গিতে অজানা বন্ধুকে যা বলেছিলেন, তার মর্মার্থ অনেকটা এই : হে বন্ধু, লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে চিনি কিনা? আমি গর্ব করে বলি ‘হ্যাঁ চিনি।’ কিন্তু তারা যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কেমন? তখন কি যে বলবো, বুঝতে পারিনে ; কেবল বলি কি জানি? তারা তখন বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়। দেখ, আমি যে তোমাকে একেবারে চিনিনে তাই বা কেমন করে বলি? কত সকাল-সন্ধ্যা-দুপুরে আভাসে-ইঙ্গিতে হৃদয়ে তোমার স্পর্শ পেয়েছি, অভিভূত হয়েছি, কিন্তু নিশ্চয় করে ত কিছুই বলতে
-
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের “য়ূরোপ-প্রবাসীর পত্র” প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে—বলা হয় সেই থেকে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের শুরু। লক্ষণীয় কোনো উপন্যাস রচনার আগেই রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—আরো দুবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালে বেরোয় ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। কিন্তু যে সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য ঐ সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে বেরিয়েছিল, তৎকালীন প্রচলিত গদ্যের মাপে শুধু হয়, আধুনিকতার যে কোনো মাপকাঠিতেই তা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ও গদ্য ভাষার যে ফর্মটি দেখা যায় তা “য়ূরোপ প্রবাসীর” গদ্যে প্রচ্ছন্ন, এবং বোধ করি তা থেকে উদ্ভূত। বস্তুত গদ্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হলে
-
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার পর জীবন সায়াহ্নে এসে ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৯৩৭) বইতে বিজ্ঞানের নানা জটিল তত্ত্বে অবগাহন করেছিলেন। তাঁর এই দুঃসাহস আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। আর এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই বইটির একটি দীর্ঘ ভূমিকায় দেশের কল্যাণের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সহজলভ্য করার অতি জরুরি প্রয়োজনের প্রতি তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন; আর জানিয়েছেন, এ পথে কেউ তেমন এগিয়ে আসছেন না বলেই এক প্রবল দায়িত্ববোধ থেকে তাঁকে এ-কাজে হাত দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায় “আমার দুঃসাহসের দৃষ্টান্তে যদি কোন মনীষী, যিনি একাধারে সাহিত্যরসিক ও বিজ্ঞানী, এই অত্যাবশ্যক কর্তব্যকর্মে নামেন, তাহলে এই চেষ্টা
-
বৈশাখে আমি বাংলাদেশে আসি এবং বাংলা একাডেমীর একটি সভা দিয়ে আমার এখানকার কার্যক্রম শুরু হয়। আবার বাংলা একাডেমীর সভা দিয়েই দেখছি আমার এখানকার কার্যক্রম শেষ হতে চলেছে। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা। বাংলা একাডেমীকে, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবার এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। আপনারা যাঁরা আজকের এই সভায় উপস্থিত আছেন—তাঁদের সবাইকেও এই সঙ্গে আমার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের সভার বিষয় বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহাশয় এইমাত্র আপনাদের জানিয়েছেন।
এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি কল্পনা করা যায় তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তবে তাঁর শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষার তাঁদের প্রয়োজন যারা সম্পূর্ণ নন। জন্মসূত্রেই সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর কোনো সত্তার শিক্ষার
-
বৈশাখ মাস এলেই অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রুদ্র রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক রুদ্র রূপের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৈশাখ আসে মানুষের জীবনের সমস্ত জীর্ণতাকে উড়িয়ে নিতে। জীর্ণতা, অসদ্ভাব, অকল্যাণ এবং যে নির্যাতন মানুষের জীবনের মধ্যে প্রত্যহ গড়ে উঠেছে, সে নির্যাতন এবং অসদ্ভাবের বিরুদ্ধেই বৈশাখ তার কল্লোলিত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সে কারণেই তিনি বলেছেন, যে রুদ্র বৈশাখ এখন এলো তার সঙ্গে আমি যদি সামঞ্জস্য বিধান নাও করতে পারি তাহলে আমাকে পথের এক প্রান্তে রেখে দাও, দাঁড়িয়ে আমি সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চলাচল দেখবো, সমস্ত মানুষ যে পথে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে
-
এক
রবীন্দ্রনাথ কবি, তবে তিনি আর দশজন কবির মতো কেবল কতিপয় দ্যুতিময় কবিতার নির্মাতা ছিলেন না। অর্থাৎ তাঁর কবিত্ব সীমাবদ্ধ থাকে নি কেবল কাব্য-নির্মাণ কলায়; নাট্য-সৃজন সংবেদনায়, গল্প-উপন্যাসের শিল্পিত রূপায়ণে, প্রবন্ধ রচনার প্রগাঢ় প্রজ্ঞায় কিংবা সঙ্গীত—গীতিনাট্যের সাংকেতিক সুর-মূর্ছনায়। তাঁর এ কবি-শক্তি সর্বানুভূমিতে যেমন দীপ্র, সর্বত্রচারিতায় তেমনি ঈর্ষণীয় ক্ষিপ্র। ‘ভূমা’র প্রবল আকর্ষণে তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন ‘বিশ্ব পরিচয়ে’, সীমাবদ্ধকালের খণ্ডিত মানুষ তাই তাঁর অন্বিষ্ট ছিল না কদাচ, জীবনের খণ্ডাংশকে প্রতিফলিত করা তাঁর কবি-স্বভাব বিরোধী ছিল তাঁর আজন্ম সাধনায় তিনি সাক্ষাৎকার প্রার্থনা করেছেন সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তায় সমুজ্জ্বল মানুষের সার্বিক জীবনকে। এবং তাঁর কবি-প্রত্যয়ের কেন্দ্রীয় মানব-সত্তাকে চিত্রিত করতে গিয়ে অনিবার্যভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, মানুষের সমাজ-সভ্যতা,
ট্যাগ
লেখক
- অম্লান দত্ত (১)
- আনিসুজ্জামান (১)
- আনোয়ারা বেগম (১)
- আবদুল মান্নান সৈয়দ (১)
- আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন (১)
- আবু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (১)
- আহমদ রফিক (১)
- কাজী মোতাহার হোসেন (১)
- নরেন বিশ্বাস (১)
- প্রকাশ কারাত (১)
- প্রক্রিয়াধীন (১)
- মনসুর মুসা (১)
- মযহারুল ইসলাম (১)
- যতীন সরকার (৭)
- সন্জীদা খাতুন (১)
- সৈয়দ আকরম হোসেন (১)
- সৈয়দ আলী আহসান (১)
- সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১)
- হায়াৎ মামুদ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.