-
ঢাকার বয়োবৃদ্ধ দিলওয়ার হোসেন মজলিশী মানুষ। তিনি শুরুতেই বলেন, আমি হালায় জাত কুট্টি।
এই শহরের হিন্দু মুসলমান মূল বাসিন্দারা কয়েকশ বছর ধরে একটা লোকভাষায় কথা বলে আসছে। এই ভাষায় যারা কথা বলে তাদের কুট্টি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানদের স্থান কুট্টিদের মধ্যে সেরা বিবেচিত হয়েছে। ঘোড়ার গাড়িগুলো উঠে গেলেও গাড়োয়ানদের চিনে নেয়া যায় কথা শুনেই। দিলওয়ার হোসেনও এক সময় ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। তিনি আজ ডালের তেজারতি করেন। তবে তাঁর গর্ব, তিনি জাত কুট্টি।
এই দিলওয়ার একদিন গল্প করতে করতে বললেন, আরেক জাত কুট্টি আছিল এলবাৰ্ট লাইব্রেরীর গোপাল বসাক। আমরা ঢাকার গাড়োয়ানরা একবার ইউনিয়ন করছিলাম। গোপাল বসাক
-
সময়টা ছিল ১৯৪২ সাল। ঢাকা শহরের এক সামান্য দারোয়ান ছিল দ্বারভাঙ্গার গিরিধারী প্রসাদ। পটুয়াটুলির গলিতে সে কতকগুলো দোকান আর অফিসের রক্ষণাবেক্ষণ করতো। পটুয়াটুলিতে রাস্তার দুপাশে দোকান আর ছোট ছোট অফিস ছিল সে সময়ে ৷ জন বসতি ছিল না। দারোয়ানরা ছিল জিম্মাদার। গিরিধারী প্রসাদ ছিল এদের একজন। অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সৎ, কিন্তু সামান্য মাইনের লোক ছিল সে।
সময়টা ছিল কিন্তু সঙ্গীন। অনেক হিসেব করে ভারতের কংগ্রেস-নেতৃত্ব ৪২ সালের ৯ই আগস্টের ‘ইংরেজ ভারত ছাড়ো’ প্রস্তাব পাশ করেছিলেন। নৈতিক দিক দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফ্যাসিবাদী হিটলার মুসোলিনী তোজোর নিন্দা করেছিলেন তাঁরা ; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজের অধীনে ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাও সম্ভব নয় বলে
-
৪০ সালে ঢাকা শহরে হিন্দু মুসলমানে যে দাঙ্গা বেধেছিল, তা বছরের পর বছর তুষানলের মতো জ্বলছিল। মাঝে মাঝে সৃষ্টি হচ্ছিল দাবানলের। ধুতি আর লুঙ্গি, সিঁদুরের ফোঁটা আর বোরকাই হয়ে উঠছিল পুরুষ কিংবা স্ত্রীর পরিচয়। দুই তরফের বিত্তশালীদের সঙ্গে সঙ্গে একান্ত গরীবদের মধ্যেও এই সরঞ্জামগুলো মনের মধ্যে পরিচয়ের চিহ্ন হয়ে উঠছিল।
কলেরা আর বসন্তে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মতোই শেষ পর্যন্ত দেশভাগের চিন্তা দেশের মানুষের মনে বাসা করলো। ভাইয়ে ভাইয়ে এবং ভ্রাতৃবধূতে ভ্রাতৃবধূতে মন কষাকষি ও মুখ দেখা বন্ধের নাটকে পৃথক হবার যে পরামর্শ বিষ ফোড়ার মত সকলের মনকে টনটনিয়ে দেয় সেই পরামর্শে কান পাতলো দেশের বড় বড় বুঝদার নেতারাও। শেষ পর্যন্ত হাড়ি
-
বাংলাদেশের ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জয়ের পরে দেশের বাইরে চলে যাওয়া প্রায় ৮০ লক্ষ এবং দেশের ভিতরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধাবমান আরও ৮০ লক্ষ শরণার্থী নর-নারী-শিশুর নিজের নিজের ঘরে ফেরার পালা। হিসেব করতে গিয়ে দেখা গেলো, যারা ফিরবে না তাদের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। যারা ঘরে ফিরে এলো তারা দেখলো যাদের রেখে গিয়েছিলো, তাদের মধ্যেও অনেকে নেই।
পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর মধ্যে থেকে বাছাই করা হিংস্র লোকদের নিয়ে গঠিত হানাদারদের বাহিনী ও স্থানীয় মুসলিম লীগ আর জামাতের বন্দুকধারী রাজাকাররা গ্রামের পরে গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা সমেত অসংখ্য নর নারী শিশুকে নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা চরগুলোর বিরান এলাকায় জড়ো করে খুন করেছিল। প্রায়
-
৬৮ সালের একেবারে শেষের দিকে সারা পাকিস্তানে গণতন্ত্রের দাবিতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে যে মিটিং মিছিলের আন্দোলন শুরু হলো তা চরমে উঠলো ৬৯-এর জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারীতে গণ অভ্যুত্থানে। শহীদের রক্তের রেখায় বাংলাদেশের মানচিত্র আলাদা করে আঁকা হয়ে গেলো।
২০শে জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলের ওপর গুলী চললে আসাদ শহীদ হলো ৷
এই হত্যার বিরুদ্ধে ২৪শে জানুয়ারী হরতাল, মিছিল, জমায়েত করার জন্য সারা বাংলাদেশে সংযুক্ত ছাত্র সংগ্রাম কমিটি জনসাধারণকে আহ্বান করলো। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বশংবদ গভর্ণর মোনায়েম খাঁ ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রে কেন্দ্রে হরতালের বিরুদ্ধে হেঁটে হেঁটে বললেও ২৪শে জানুয়ারী সমস্ত দোকান পাট বন্ধ হলো। গাড়ীর চাকা ঘুরলো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তরু
-
৬৮-৬৯এ সারা পূর্ব বাংলা জুড়ে পাকিস্তানী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহী অভ্যুত্থান হয়েছিল তা যেই মুহূর্তে জয়ী হলো প্রায় সেই মুহূর্তেই পড়ে গেলো। আইয়ুব খাঁ গেলো কিন্তু ইয়াহিয়া খাঁ এলো। আবার জারী হলো নতুন করে সামরিক শাসন। সভাসমিতি সমাবেশ মিছিল বিক্ষোভ বন্ধ করে ইসলামাবাদের হুকুমনামা জারী হলো। পূৰ্ব বাংলায় গণবিক্ষোভগুলো বরাবরই কালবৈশাখীর মতো এসে দপ্ করে থেমে গিয়েছে। ঝড় থেমে গেলে মনে হয় ঝড় কখনোবা ওঠেনি। আবার আচমকা গণবিক্ষোভ হবেই, কিন্তু যখন হবে তখন হবে। প্রকৃতি কিন্তু দেখতে না দেখতে একটা ঝড় তুললো আচমক৷৷ টর্নাডো ঘূর্ণিঝড় একটা আগুনের হল্কার মতো ছিটকে বেরিয়ে ঢাকার গা ঘেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খানিকটা ছুঁয়ে চলে গেলো।
-
যশোর জেলের নিরাপত্তা বন্দীদের দোতলা ওয়ার্ডের নীচতলায় জানালার কাছে কি যেন ঘটেছে। দূর থেকে দালাল গোছের বিশেষ সুবিধাভোগী কয়েদীরা চীৎকার করছিল। ভরদুপুর। এইমাত্র ছোট যশোর জেলে চৌকার বারান্দায় ডিউটি জমাদার সফদর আলী জুতো-মোজা-জামা ছেড়ে দুই জবরদস্ত চেহারার কয়েদীকে দিয়ে হাত-পা টেপাচ্ছিল। সে আঁতকে উঠে দাঁড়ালো খালি গায়েই কাছে রাখা রুলটা হাতে নিয়ে। যারা পা টিপছিল তারা জমাদার সাহেবকে জামা পরিয়ে দিল।
একটা ছুটোছুটি হচ্ছিল চারদিকে। কিন্তু জমাদারকে বিস্মিত করে সেই দালাল কয়েদীরা কোত্থেকে দৌড়ে এসে সামনেই নিরাপত্তা বন্দীদের ওয়ার্ডের জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল। তারপর জানালার নীচে বাইরে বসে পড়া এক ছোকরা কয়েদীকে টেনে তুলে তার নাকে মুখে থাপ্পর কষতে
-
৭১-এর ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করে কামান বন্দুকের জোরে হত্যা আর অগ্নিকাণ্ড চালিয়ে বিদ্রোহী ঢাকা শহরটাকে দখল করেছিল। তারপর পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গণ অসহযোগী সারা বাংলাদেশকে বাগে আনবার জন্যে এক সপ্তাহ না যেতেই প্রথম পর্যায়ে নরসিংদীতে হানা দিয়েছিল পাকিস্তানী সেবর জেট প্লেনের জঙ্গী বিমান বহর ৷
দিন পনেরো পরে দিনদুপুরে সেবর জেট প্লেন হানা দিয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। ৪০ মিনিট ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আকাশে। দু’তিন মিনিট অন্তর অদৃশ্য হয়ে আবার ঘুরে ঘুরে এসে ডাইভ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কেন্দ্রে মেসিনগানের গুলি ছুড়ে ওপরে উঠে যাচ্ছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারপাশের কয়েক মাইলের মধ্যে সমস্ত
-
'৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনের পরে তখনকার মুক্তিসংগ্রামী রাজ- নৈতিক কর্মীদের যে ধরপাকড় শুরু হয়, তার ধারাটা '৭১ পর্যন্ত প্রায় একই রকম ছিল। একবার ঢোকালে আর বের করার নাম নেই। দরকার হয়েছে বড় বড় ঠেলার। তবে জেলের দরজা খুলেছে। যেমন '৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারীর ঠেলা, '৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়ের ঠেলা, '৬২ সালের এন, ডি, এফ'এর ঠেলা, '৬৯ এর এগারো দফার ঠেলা। তারপর '৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কত জেলের রাস্তা তো সদর রাস্তা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম প্রথম জেলবন্ধের সময়টা বেশী হতো। ভেতরে যারা থাকতো তারা মনে করতো সারা পৃথিবীটা নিঝুম। কবে জাগবে ছাত্র-জনতা? নোয়াখালির কৃষকনেতা মমতাজ মিঞা গাঁয়ের চেয়ারম্যান, প্রথম
-
II ১ II
কম্যান্ড্যান্ট যখন মালবাহী জাহাজ ‘রেকর্ডের’ প্রখর আলোকিত সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠল ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে। পোতাশ্রয়ে অতি জনপ্রিয়, বাহাত্তর বছর বয়সের এই ব্যক্তিটি ছিল ঋজু, সামান্য দুর্বল গড়নের এক বৃদ্ধ। শুকনো নাশপাতির মতো তার বলিরেখাঙ্কিত মুখটি ছিল নিখুঁত কামানো। মাছের পাখনার মতো দু পাশের জুলপিতে খাড়া খাড়া হয়ে থাকত সাদা চুল; পাকা ভুরু জোড়ার কানাতের নীচ থেকে মধুর হাসিতে ঝকঝক করত ছোট ছোট নীল দুটি চোখ। বিজলী বাতির উজ্জ্বল আলোয় কম্যান্ড্যান্টের জাহাজী টুপি, খয়েরী রঙের জ্যাকেট, সাদা প্যান্ট, নীল রঙের টাই আর সস্তা দামের ছড়ি—সেগুলির যে দৈন্যদশার সাক্ষ্য দিচ্ছিল, মেরামতের শত চেষ্টায়ও তা যাবার নয়। কম্যান্ড্যান্টের হলদে
-
দীর্ঘকাল সফরের পর বেরিং বাড়ি ফিরে আসার আগে আগে তার ছেলে, ছোট্ট টম বেরিং কর্ণেলিয়া-পিসি আর তার স্বামী কার্ল-পিসেমশাইয়ের কাছে নাস্তানাবুদ হল।
টম অন্ধকার লাইব্রেরী-ঘরে সাবানের ফেনার রঙিন বুদ্বদ ছাড়ছিল। এর চেয়েও বড় বড় অপরাধ অবশ্য সে করেছে: যেমন, আতসকাচ দিয়ে হলুদ পর্দা ফুটো করে দেওয়া ‘দেকামেরন’ বই খুলে তার ছবি দেখা, পড়শীর ছেলের সঙ্গে মারামারি—তবে কর্ণেলিয়াকে বিশেষ করে উত্তেজিত করে তোলে সাবানের বুদ্বুদ। বিশাল, কেতাদুরস্ত বাড়িতে এরকম চাপল্য অসহ্য, তাই কার্ল -পিসেমশাই গম্ভীর ভাবে বালকের কাছ থেকে সাবানের ফেনাসুদ্ধ পাত্রটা কেড়ে নিলেন, আর কর্ণেলিয়া-পিসি কাচের নলটা।
কর্ণেলিয়া অনেকক্ষণ ধরে টমকে নষ্ট ছেলেদের নিদারুণ ভাগ্য সম্পর্কে—ভবিষ্যদ্বাণী করে বললেন যে তারা
-
‘নেড় গার্লানের উত্তরাধিকারী’—পরিচিত লোকেরা ঠাট্টা করে ওদের এই আখ্যাই দিয়েছিল—ছিল সাতজন অল্পবয়সী ছাত্রছাত্রী, গার্লানেরই দেওয়া একটা মোটরবোটের যৌথ মালিক। গার্লান ক্ষয়রোগে সুইজারল্যাণ্ডে দেহত্যাগ করে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি ‘উত্তরাধিকারীদের’ প্রথম ভ্রমণ শুরু হল। তারা বন্য জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে স্নার্ক হ্রদের তীরের দিকে যাত্রা করল।
অষ্টম একজন ব্যক্তি আমন্ত্রিত হয়েছিল—কোলবেয়র। যে ক’টি মেয়ে এই ভ্রমণে চলেছে তাদেরই একজন—জয় টেভিসের প্রতি কোলবেয়রের অসুখী প্রেম এক বছর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং প্রায়ই মন্তব্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ষোল বছর বয়স থেকে শুরু করে আজ অবধি জয় টেভিস একের পর এক ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে, কিন্তু যেহেতু ক্ষত নিরাময়ের ক্ষমতা কিংবা ইচ্ছেও তার ছিল
ট্যাগ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.