বন্দরের কম্যান্ড্যান্ট
II ১ II
কম্যান্ড্যান্ট যখন মালবাহী জাহাজ ‘রেকর্ডের’ প্রখর আলোকিত সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠল ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে। পোতাশ্রয়ে অতি জনপ্রিয়, বাহাত্তর বছর বয়সের এই ব্যক্তিটি ছিল ঋজু, সামান্য দুর্বল গড়নের এক বৃদ্ধ। শুকনো নাশপাতির মতো তার বলিরেখাঙ্কিত মুখটি ছিল নিখুঁত কামানো। মাছের পাখনার মতো দু পাশের জুলপিতে খাড়া খাড়া হয়ে থাকত সাদা চুল; পাকা ভুরু জোড়ার কানাতের নীচ থেকে মধুর হাসিতে ঝকঝক করত ছোট ছোট নীল দুটি চোখ। বিজলী বাতির উজ্জ্বল আলোয় কম্যান্ড্যান্টের জাহাজী টুপি, খয়েরী রঙের জ্যাকেট, সাদা প্যান্ট, নীল রঙের টাই আর সস্তা দামের ছড়ি—সেগুলির যে দৈন্যদশার সাক্ষ্য দিচ্ছিল, মেরামতের শত চেষ্টায়ও তা যাবার নয়। কম্যান্ড্যান্টের হলদে রঙের জুতোজোড়া বাইশ বার ফেটেছে, আর ঠিক ততবারই হয় তো দিয়ে তাদের সেলাই করা হয়েছে, নয়ত তারের টুকরো দিয়ে করা হয়েছে মজবুত। জ্যাকেটের বুকপকেট থেকে উঁকি মারছে শক্ত সেলাই করে আঁটা রঙিন রেশমী কাপড়ের একটা টুকরো।
জামার কলার সযত্নে স্পর্শ করে, অতঃপর গেলিসের কোন একটা অবাধ্য ফিতেকে বাগে আনার চেষ্টায় কাঁধদুটো ইতস্তত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বৃদ্ধ প্রহরারত অফিসারের মখোমুখি এসে দাঁড়াল, মাথাটা এক পাশে হেলিয়ে ঝট করে দুহাত বাড়িয়ে দিল।
“টম ল্যাস্টন!” কম্যান্ড্যান্ট সোল্লাসে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল। “আমি জানতাম যে এই চমৎকার জাহাজে আবার দেখতে পাব আপনাকে, আপনার আদরের সেই বেট্সীর স্বপ্ন নিয়ে মশগুল থাকতে, যিনি আছেন ওখানে... অনেক দূরে। বজ্র আর বিদ্যুৎ! আশা করি সমুদ্রযাত্রা ভালোই চলছে?”
“কুট্গে!” ল্যাস্টন দূরের কাউকে উদ্দেশ্য করে হাঁক দিল। “কম্যান্ড্যান্ট এসেছে রে! এখন কী করা যায়?”
“ঘাড়ে রদ্দা দিয়ে ভাগিয়ে দে!” কড়া জবাব ভেসে এলো।
বৃদ্ধের দৃষ্টিতে মিনতি, হতবুদ্ধি ও চাঞ্চল্যের ভাব প্রকাশ পেল। তার হাতের ছড়িটা একটু উঠে আবার নেমে গেল, প্রভুর মেজাজ বোঝার চেষ্টা করার মূহর্তে কুকুরের লেজের যেমন অবস্থা হয়।
“বোঝ কাণ্ড, সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ে রদ্দা!” ল্যাস্টন অমায়িক ভঙ্গিতে বৃদ্ধের কাঁধে চাপড় মেরে সাড়া দিয়ে বলল, ফলে কম্যান্ড্যান্ট ভাঁজ হয়ে দুমড়ে বসে গেল। “কুট্গে, আমার মনে হয় তুই কম্যান্ড্যান্টকে সালাম জানাতে চাস, তাই না? ভয় পেও না কম্যান্ড্যান্ট, কুট্গে ঠাট্টা করছে।”
“ঠাট্টার আবার কী আছে?” মোটা হাড় আর চওড়া কাঁধের অধিকারী প্রধান স্টোকার কুট্গে এগিয়ে আসতে অসতে বলল। “যখনই গেরটনে আসি না কেন, কম্যান্ডান্ট নির্ঘাত আসবে। একেবারে জ্বালিয়ে খেল। আরে বুড়ো, ঘুমোতে গেলেই ত পার।”
“আমি সবে ‘আব্রাহাম রেপ্’ থেকে ঘুরে এলাম,” স্টোকারের অপ্রীতিকর কথা না শোনার চেষ্টা করে কম্যান্ডান্ট আমতা আমতা করে বলল। “ওখানে সব ঠিকঠাক আছে ৷ যাত্রা ভালো হয়েছে, ভোর বেলায় ‘রেপ্’ চলে যাচ্ছে। কফি খেলাম, সারেঙ্গ টল্বির সঙ্গে চেকার খেললাম। চমৎকার লোক! কেমন আছেন কুট্গে? আশা করি সব ভালো? আপনার শ্রদ্ধেয় পরিবার পরিজনবর্গ?”
“সিগারেট খাও,” বৃদ্ধের হাতে একটা কালো সিগারেট গুঁজে দিয়ে কুট্গে বলল। “শক্ত করে হাত দিয়ে ধর নইলে পড়ে যাবে।”
“আরে এই ত, ক্যাপ্টেন সাব যে।” চঞ্চল হয়ে উঠে গায়ের জ্যাকেটটা টেনে ঠিকঠাক করতে করতে এবং ব্যস্তসমস্ত ভাবে ছুটে ক্যাপ্টেনের কাছে আসতে আসতে কম্যান্ডান্ট চেঁচাল। ক্যাপ্টেন তখন সস্ত্রীক শহরের থিয়েটারে যাচ্ছিলেন। “সালাম ক্যাপ্টেন সাব! সালাম, অসীম শ্রদ্ধাভাজন আর...হুম্... সন্ধ্যাটা এত সুন্দর যে মন চায় এসপ্লানেডে একটু ঘোরাঘুরি করতে, অপূর্ব গানবাজনা শুনতে। কেমন আছেন? আশা করি সব ভালো। ঝড়ের কবলে পড়তে হয় নি ত? আপনার স্বাস্থ্য... ভালো ত?”
“ও... আপনি, টিল্স!” ক্যাপ্টেন হেনরি হাল্টন দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন। দীর্ঘকায় ক্যাপ্টেনের বয়স বছর পয়ত্রিশ, তাঁর বিশাল মুখটি রোদে-বাতাসে কড়া-পড়া। “এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন—খুবই ভালো! আপনাকে দেখে খুশি হলাম!
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments