-
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ লোকের মুখে মুখে সিপাহী বিদ্রোহ নামে প্রচলিত হয়ে এসেছে, এই নামটা আমরা পেয়েছিলাম ইংরেজদের কাছ থেকে। ব্র্রিটিশ সরকার এর নাম দিয়েছিলো Sepoy Mutiny অর্থাৎ সৈন্য বিদ্রোহ। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তাই মনে হবে বটে তার কারণ গোরা সিপাহীদের তুলনায় দেশীয় সিপাহীদের স্বল্পবেতন উর্ধ্বতন নাগরিক প্রভুদের দুর্ব্যবহার এবং নানা রকম অভাব-অভিযোগ সৈন্যদের মধ্যে দীর্ঘদীন ধরে অসন্তোষ সঞ্চিত করে তুলছিল। এই সমস্ত অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল বলে ১৭৬৪ সালে দেশীয় সৈন্যদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সৈন্যদের মধ্যে এই জুলুম অবাধেই চলে আসছিল। ১৮৫৭ সালে দেশীয় সৈন্যরাই বিদ্রোহে প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই সমস্ত কারণে
-
দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস চর্চার বিষয় হচ্ছে, কিভাবে নতুন শক্তির প্রভাবে স্থানীয় রাজ্যসমূহে ভাঙ্গন ধরে, কিভাবে শাসকশ্রেণীকে পর্যুদস্ত করা হয়; এবং কিভাবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার ফল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন। এ রাষ্ট্র গঠন ছিল এমনি একটি রাজনৈতিক আইনগত প্রক্রিয়া যার মধ্যে বিশাল যুদ্ধের ভূমিকা খুব গৌণ। নতুন নতুন এলাকা একের পর এক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, প্রণীত হয়েছে নতুন আইন, স্থাপিত হয়েছে নতুন শোষণ ব্যবস্থা। ঐতিহাসিকগণ জানেন যে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন ছিল একটি অবিরাম প্রক্রিয়া, যা সব সময় শ্রেষ্ঠ ঘটনাসমূহের সমান্তরালে চলেনি, যদিও তাঁরা ওসব ঘটনাকে সমধিক গুরুত্ব
-
এক শতাব্দী আগে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোর ইতালীয় অনুবাদের ভূমিকাতে এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘ইতালির শ্রমিকশ্রেণী থেকে নতুন দান্তে বেরিয়ে আসবেন।” শোষণমুক্ত সমাজের জন্যে শ্রমজীবী জনগণের লড়াই রূপের জগৎকে কিভাবে সঙ্গী হিসেবে দেখে, এঙ্গেলসের উক্তিটিতে তার ইঙ্গিত রয়েছে। এক কথায় একে বলা যেতে পারে আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপের দিশা। যেমন এর বিশালতা, তেমনি এর গভীরতা। এ শুধু ভাব নয়, এ হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্রান্ত সৃষ্টি আর কাজ ৷ দেশে দেশান্তরে যুগে যুগান্তরে মেহনতী মানুষের ‘রূপ লাগি ঝুরে মন'। তার অসংখ্য অজস্র অভিব্যক্তি। সমস্ত অবক্ষয় ও আবিলতা ও মৃত্যুকে সরিয়ে সরিয়ে ‘অভিনব ধরণী' গড়ার জন্যে মানবাত্মাকে অপরূপ রূপে সাজানো ৷ এরকমের একটি প্রেক্ষিত সামনে থাকাতে
-
মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। সেদিনকার ঢাকা শহরের ছবিটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সবচেয়ে বেশী করে মনে পড়ে সেই সময়কার ঘোড়ার গাড়ীর কথা। সেদিন যদি বলত, সামনে এমন দিন আসছে যেদিন শহরের বুক থেকে ঘোড়ার গাড়ীর নাম-নিশানা লোপ পেয়ে যাবে তা হলে কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারতাম না। কথাটাকে হেসেই উড়িয়ে দিতাম। ঘোড়ার গাড়ী নেই, গাড়োয়ানরা নেই, অথচ ঢাকা শহর চলছে এমন একটা কথা ভাবা যায়! অথচ আমার এই চোখের সামনে দিয়ে এই ঘটনাটা ক্রমে ক্রমে ঘটে গেল। আজ সারা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখুন, বড়জোর দশ-বারোটা ঘোড়ার গাড়ীর খোঁজ পাবেন। পথ দিয়ে চলতে চলতে কখনো-কখনো তাদের
-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯১৪-১৫ সাল একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্ণ স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগে এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করার জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা শেষ পর্যন্ত সার্থকতায় পরিণত না হলেও সেই বিপুল কর্মোদ্যোগ ও আত্মত্যাগের জন্য আমরা গর্ববোধ করে থাকি। এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা এই তিন মহাদেশে বিপ্লবীদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত ছিল। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপ্লবের সৈনিকরা এই অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চলেছিল। সে এক উদ্দীপনাপূর্ণ রোমাঞ্চকর পরিবেশ।
এই পরিকল্পিত বিদ্রোহের কেন্দ্রগুলির মধ্যে দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল অন্যতম। দেওবন্দ শিক্ষাকেন্দ্রের অধ্যক্ষ স্বয়ং মাহমুদ আল হাসান এই কেন্দ্রের নেতৃত্ব করছিলেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপ্লবীরা দেওবন্দের
-
উনিশ শতকের রুশকথাশিল্পী ফিওদর দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে ‘উপন্যাসের তত্ত্ব গ্রহে হাঙ্গেরীর মার্কসবাদী সৌন্দর্যতত্ত্ববিদ গিওর্গি লুকাচ ১৯১৪ সালে লিখেছিলেন যে, দস্তয়েভস্কি অনাগত লেখক লেখিকাদের জন্যে এক নতুন ধরনের বাস্তববাদের খসড়া রেখে গিয়েছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই ‘খসড়াগুলো’ সমগ্র বিশ শতকের বিশ্ব সাহিত্যের প্রাণবন্ত ধারা হিসেবে আজও সক্রিয়। বাংলা সাহিত্যের কল্লোল যুগের গল্পে উপন্যাসে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট’ এবং ‘দি ইডিয়ট’ উদ্দাম মানবতাবাদী যৌবনের ভাবের ঘোর যুগিয়েছিল। সেই থেকে দস্তয়েভস্কির গল্প-উপন্যাস বাংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাকে টানে তাঁর এই পরিচিতিকে সামনে রেখে। বিশ্ব সাহিত্যে বিশেষ করে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের দিনবদলের পালায় তাঁকে ঘিরে যে ভাবাদর্শের লড়াই চলছে সেটাই বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
দস্তয়েভস্কির কষ্টিপাথরে সাহিত্যে
-
১৮০৩ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। ভারতের রাজধানী দিল্লী শহর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্বাধীনে এসে গেল, আসলে এটা একটা আকস্মিক ব্যাপার নয়। বহুদিন আগে থেকেই ভারতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা তাকে এই অনির্বায পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছিল। যাদের দেখবার মত চোখ ছিল তারা দেখতেও পাচ্ছিলেন যে তার সর্বদেহে ক্ষয়রোগের লক্ষণগুলি ফুটে উঠেছে। এ এক বিরাট মহীরুহ, যার ভিতরকার সমস্ত সার পদার্থ একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাহলেও সাধারণের দৃষ্টির সামনে এতদিন সে তার প্রভুত্বব্যঞ্জক মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, অবশেষে সেই মহীরুহের পতন ঘটল; চমকিত হয়ে উঠল সবাই। দিল্লীশ্বরেরা জগদীশ্বরেরা শেষকালে এই হলো তার পরিণতি।
মুঘল সাম্রাজ্য সত্য কথা বলতে
-
ময়মনসিংহের উত্তরে গারো পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৩৭ সাল থেকে শুরু করে সুদীর্ঘ বারো বৎসর টংক প্রথার বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী ও জঙ্গী সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল টংক প্রথা হচ্ছে কৃষকদের উপর এক প্রকার জঘন্য ও বর্বরতম সামন্তবাদী শোষণ। টংক কৃষকদের জমিতে কোন কর্তৃত্ব ছিল না। জমিতে ধান হোক বা না হোক টংক কৃষকদের জমির মালিক জমিদার ও অন্যান্যদের ধানে খাজনা দিতেই হতো। টাকায় খাজনা না দিয়ে এই প্রথার খাজনায় কৃষকরা মারাত্মক রকম শোষণের শিকার হতো। এই প্রথার বিরুদ্ধে এবং টাকায় খাজনা দেওয়ার দাবিতে টংক কৃষকের মরণপণ সংগ্রাম বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনে এক গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে।
শোষণে জর্জরিত হয়ে টংক কৃষকরা যখন
-
কবি সত্যেন দত্ত বহুদিন আগে মেথরদের উদ্দেশ করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি?’ কিন্তু তা হলেও মেথর সম্প্রদায় আমাদের সমাজে এখনও অশুচি বলেই গণ্য। আর এই বৃত্তি অবলম্বন করার ফলে যেই পরিবেশের মধ্যে তাদের বাস করতে হয়, তা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে একেবারেই প্রতিকূল। অথচ তারা তাদের কাজ থেকে হাত গুটিয়ে নিলে সারা শহর-জীবন অচল হয়ে পড়বে। জননীর মতো, চিকিৎসকের মতো শহর-জীবনকে যারা সর্বভাবে পরিচ্ছন্ন ও ক্লেদমুক্ত করে চলেছে তাদের কাজ কেমন করে নীচ ও মর্যাদাহানিকর হতে পারে? যাদের নিরলস সেবা সমাজের শুচিতাকে রক্ষা করে চলেছে, তারাই হলো অশুচি! মোটামুটি সবাই এই দৃষ্টি নিয়েই তাদের দেখে
-
ঢাকা শহরের সুরসিক লোকেরা এককালে তাদের শহরের আর একটা নামকরণ করেছিল-‘বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি।’ সেই নাম আজ বিস্মৃতির পথে হারিয়ে গেছে। এই বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির উপরে বাইশ পঞ্চায়েত তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব নিয়ে সমাজ রক্ষার কাজ চালাত। তাদের কথার উপর কারুর কথা বলা চলত না। বাইশ পঞ্চায়েত আজও বেঁচে আছে। কিন্তু একে বেঁচে থাকা বলা চলে না। তার মূলগুলো একটা একটা করে মরে যাচ্ছে, ডালগুলো অবসন্ন হয়ে শুয়ে পড়েছে। পাতাগুলো খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে এলো বলে। কালের অমোঘ বিধান কে লংঘন করতে পারে। এমন প্রবল প্রতাপশালী সরদার আর তাদের পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা! কালের বিধানে তাদেরও আজ সসম্মানে
-
পূজার নাটমণ্ডপগুলি নাচঘরে রূপান্তরিত হবার আগে পূজা উপলক্ষে যাত্রা, কবিগান, কীর্তন, কথকতা-এই সমস্তই চলত। নাচঘর নিয়ে এলো নতুন জিনিস-ঢপ, কীর্তন, খেমটা আর বাইজীদের নাচ-গান।
জীবন বাবুর বাড়ির নাচঘরের মালিক গোকুল রায়ের পিতা গৌরচন্দ্র রায় ঢপ, কীর্তন প্রবর্তন করেছিলেন। ঢপ পূর্ববঙ্গের কোথাও প্রচলিত ছিল না। ঢপ কীর্তনের দল কলকাতা থেকে আমদানী করা হতো। সাধারণ কীর্তনের মতোই এই বিশেষ ধরনের কীর্তন বঙ্গীয় বৈষ্ণব ধর্মের আদি ভূমি নবদ্বীপ, শান্তিপুর ও কাটোয়ার মাটিতে জন্মলাভ করেছিল। ঢপ কীর্তনের প্রধান বিশেষত্ব এই যে, মেয়েরা এই কীর্তন গান গাইত।
পশ্চিম বঙ্গে বিশেষ করে কলকাতার নাগরিক আবহাওয়ায় খেমটা নাচ-গানের উৎপত্তি। কেউ কেউ মনে করেন সেখানকার হাফ আখড়াই গান
-
বিচিত্র এক জীবন। আমাদের এই বাংলাদেশে যারা শিল্পপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে এমন একটি জীবন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমি হাজী মহম্মদ ফকীরচাঁদের কথা বলতে যাচ্ছি। নিঃস্ব নিরক্ষর এক এতিম, ভাগ্য যাকে কোনো দিক দিয়েই কোনো ভাবে অনুগ্রহ দেখায়নি। সে ছেলে কেমন করে একান্ত ভাবে নিজের বুদ্ধি ও নিষ্ঠার জোরে ব্যর্থতার বাধা ডিঙ্গিয়ে অবশেষে সাফল্যের মঞ্জিলে এসে পৌঁছাল আমাদের এই ব্যবসা বিমুখ বাঙ্গালি সমাজে তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে পথ নির্দেশ করতে পারে।
পিতার নাম আলিজান ব্যাপারী। তাঁর আদি নিবাস রহমতগঞ্জে, পরে উর্দু রোডে চলে আসেন। গরীব মেহনতী মানুষ। মৌলভী বাজারে তাঁর পৈত্রিক ফলের ব্যবসা ছিল। ফকীরচাঁদ যখন
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.