ময়মনসিংহের পাগলপন্থী বিদ্রোহ (১৮২৪-১৮৩৩)
দক্ষিণ এশিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস চর্চার বিষয় হচ্ছে, কিভাবে নতুন শক্তির প্রভাবে স্থানীয় রাজ্যসমূহে ভাঙ্গন ধরে, কিভাবে শাসকশ্রেণীকে পর্যুদস্ত করা হয়; এবং কিভাবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদি চাপিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ার ফল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন। এ রাষ্ট্র গঠন ছিল এমনি একটি রাজনৈতিক আইনগত প্রক্রিয়া যার মধ্যে বিশাল যুদ্ধের ভূমিকা খুব গৌণ। নতুন নতুন এলাকা একের পর এক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, প্রণীত হয়েছে নতুন আইন, স্থাপিত হয়েছে নতুন শোষণ ব্যবস্থা। ঐতিহাসিকগণ জানেন যে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠন ছিল একটি অবিরাম প্রক্রিয়া, যা সব সময় শ্রেষ্ঠ ঘটনাসমূহের সমান্তরালে চলেনি, যদিও তাঁরা ওসব ঘটনাকে সমধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এমনও দেখা যায় যে, অনেক সময় ঔপনিবেশিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূ-খণ্ড দখলের আগেই, আবার অনেক সময় রাজ্য বিজয়ের পরও ঔপনিবেশিক ক্ষমতা প্রয়োগ পিছিয়ে থাকে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া যেভাবে দৃষ্ট হয় ঠিক সেভাবে এই ইতিহাস তৈরি করা প্রায়শ কঠিন। ক্ষমতাকেন্দ্রের উচ্চ রাজনীতি এবং প্রাথমিক ঔপনিবেশিক শাসকদের জীবনধারা লিপিবদ্ধ করা সহজ। কিন্তু ঔপনিবেশিক শক্তি আঞ্চলিক রাজনীতির গোধূলী পর্যায় নিয়ে লেখা খুবই কঠিন। এ অঞ্চলে অধিকাংশ কর্মনায়ক পড়তে জানে না, লিখতে জানে না। এর বিপরীতে আছে ঔপনিবেশিক কর্মচারীরা। এদের অজ্ঞতাপূর্ণ ও পক্ষপাতদৃষ্ট প্রতিবেদনই আমাদের স্থানীয় ইতিহাসের প্রধান উৎস।
বর্তমান প্রবন্ধে আমি প্রাথমিক একটি কৃষক বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া লক্ষ করব। ১৮২৪ থেকে ১৮৩৩ সালের মধ্যে একটি ব্যাপক বিদ্রোহ উত্তর ময়মনসিংহ জেলাকে আন্দোলিত করে। কিন্তু এ বিদ্রোহ সম্পর্কে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসবেত্তাগণ নীরব। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম দিকের কৃষক অসন্তোষ নিয়ে বিস্তর লেখালেখির পটভূমিতে এ নীরবতা খুবই লক্ষণীয়, বিশেষ করে যখন দেখতে পাই যে বিদ্রোহ সম্পর্কে প্রচুর সরকারি দলিলাদি ও অন্যান্য সাক্ষ্যাদি বিদ্যমান। ১ এ নীরবতার কারণ? এর একটি কারণ এই যে ময়মনসিংহ বিদ্রোহটি সহজে প্রচলিত ইতিহাস লিখন ধারায় পড়ে না। কৃষক বিদ্রোহকে যারা বিংশ শতকের কৃষক অসন্তোষের খাপে ফেলতে চান তাদের পক্ষে ময়মনসিংহ বিদ্রোহকে অনুধাবন করা একটি সমস্যা বটে, এবং তাদের পক্ষে এ বিদ্রোহকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। প্রচলিত ধারায় এ বিদ্রোহকে প্রাক-জাতীয়তাবাদী, প্রাক-সমাজতান্ত্রিক বা প্রাক-সাম্যবাদী বলে আখ্যায়িত করার মধ্যে কোন যুক্তি নেই।
এ মনোভঙ্গির একটি উপমা তিতুমীরের বিদ্রোহ ও ফরায়জী আন্দোলনের উপর গবেষণাসমূহ। এসব গবেষণা ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে যে ওসব সশস্ত্র বিক্ষোভ আন্দোলন ছিল মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক তৎপরতা যা পরবর্তীতে ইসলামী পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।` উক্ত গবেষণাসমূহ মনে করে যে ঔপনিবেশিক আমলের প্রাথমিক পর্বের বিদ্রোহগুলো ছিল অনেকটা প্রাক রাজনৈতিক। অর্থাৎ উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনাহীন, স্বতঃস্ফূর্ত, স্থানীয়, ধর্মভিত্তিক। আর ঔপনিবেশিক যুগের শেষ পর্বের আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক, অর্থাৎ পরিকল্পিত, নেতৃত্বাধীন, আদর্শিক ও সংগঠিত। ময়মনসিংহ বিদ্রোহকে আদিপর্বে গণ্য করা হয়। এ ধারণা ফের পরীক্ষা করে দেখা দরকার। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে ময়মনসিংহ বিদ্রোহকে সংযুক্ত করে আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, প্রাথমিক ঔপনিবেশিক যুগের কৃষক বিদ্রোহগুলিকে পরবর্তী যুগের নিরিখে বিচার না করে সমকালীন পরিস্থিতির নিরিখে বিচার করলে আমরা বিদ্রোহের আসল রূপের সন্ধান পেতে পারি।
কৃষক বিদ্রোহের পরিবেশ
অঞ্চলের অস্থির অবস্থা
ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাংশে ১৮২৪ সালে একটি কৃষক বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। হাঙ্গামা এলাকার সীমা পশ্চিম দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, উত্তরে গারো পাহাড়মালা ও পূর্বে হাওড় এলাকা। ভৌগোলিকভাবে এ এলাকার রয়েছে আলাদা পরিচয় ও সত্তা। এর অবস্থান এমন যে অতীতে বাংলায় রাজ্যের পর রাজ্য স্থাপিত হয়েছে, কিন্তু কোন রাজ্যই এ এলাকাকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয় নি। কখনও বৃহত্তর রাজ্যে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments