ভাঁটফুলের দেশে
এই ভাঁটফুলের দেশে সাদাকালো[১]জীবনেও নিয়মকরে ফাগুন আসে। সে ফাগুন নতুনের বারতা পৌঁছে দেয় সর্বত্র। আমাদের সাদাকালো-নিরুপদ্রব গাঁয়েও ফাগুনের আগুন আর গোপন থাকে না। সে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের আনাচে-কানাচে—পথে-প্রান্তরে। শিমুল-মান্দারের শাখায় শাখায় রক্তিম সে আভা দৃশ্যমান হয়। সত্য বলতে—আমাদের গ্রামটি দেশের অন্যান্য হাজারো গ্রাম থেকে সামান্যও আলাদা নয়, বরং আরও বেশি সাধারণ। গ্রামের পাশ দিয়েই অবাধে বইয়ে চলা ব্রহ্মপুত্রের শান্ত-শীতল জল তীরবর্তী গ্রামগুলিকে সাজিয়েছে এক অনন্য সজীব-নীরবতায়। যে নীরবতায় পাখির কোলাহল আর একঘেয়ে ঝিঁঝিঁর ডাককেও নৈঃশব্দ বলে মনে হয়। প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র আজ বয়সের ভারে ন্যুজ। তাই তার আগের রুদ্রমুর্তি আর নেই, এখন সে ক্ষয়িষ্ণু। খরা মৌসুমে নদীতে আর তেমন জল থাকে না। সে সময় অগভীর জলতলে রাশি রাশি সবজে শৈবাল ছড়িয়ে থাকে নদীময়। স্বচ্ছ জলে হাত ডোবালেই নরম শৈবালের আলতো পরশের অচেনা অনুভূতিতে গা হীম-শীতল হয় মুহূর্তেই। ধীরলয়ে দুলতে থাকা রাশি রাশি জলমগ্ন শৈবাল ঠেলে নৌকোয় পার হতে হয় সামান্য দূরত্বের নদীপথ। শীর্ণকায় ব্রহ্মপুত্রের অনেক জায়গায় পায়ে হেঁটেই হাঁটুজল পার হয় হাটুরেরা। তবুও যতটুকু জলের দেখা পেলে একে নদী[২]বলে মনে হয়, ততটুকু জল এখনও ধরে রেখেছে আমাদের গ্রামের পাশেই। তাই ছোট থেকেই পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দেখা শিশুমনও একে নদী বলে মেনে নিয়েছে অনায়াসেই।
আমাদের গ্রামটি দীর্ঘকাল আগে জেগে ওঠা ব্রহ্মপুত্রের এক চর। ব্রহ্মপুত্র যদি ব্রহ্মের সন্তান হয়, তবে আমাদের গ্রামটিও ব্রহ্মপুত্রের সন্তান। সেই অর্থে আমারা ব্রহ্মপুত্রের পরম্পরা। গ্রামের মানুষদের সুখ-দুঃখ ওই ব্রহ্মপুত্রই। আমাদের ভালোবাসা যেমন নদীকে ঘিরে, সংগ্রামও তেমনই নদীর সঙ্গেই। আমরা বানভাসি—বর্ষা এলে গ্রাম ভেসে যায় উত্তরের বানের জলে। বানের সঙ্গেই আমাদের নিত্য বসবাস। যখন বানের জলে ভেসে যায় গ্রামীণ জনপদ, তখন পুরো ব্রহ্মপুত্র ছড়িয়ে পড়ে আমাদের গ্রামময়—সর্বত্র। তখন এই জলমগ্ন গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়, নদীর ওপারে উঁচু জায়গায়—বীরাঞ্চলে। বানের পানি নেমে গেলে আবারো ফিরতে হয় অসমাপ্ত জীবন সংগ্রামে। আর সর্বগ্রাসী নদী ভাঙন তো এক অনাহূত সর্বনাশা অভিজ্ঞতা।
এই বসন্তে নদীর জল বেশ শান্ত-সুশীতল। সবজে-স্বচ্ছ জলে দিনভর পানকৌড়ির ডুব-সাঁতার এখনও নজর কাড়ে। নদী পার হয়েই চরের বালুতে মাখামাখি হয়ে আছে ফসলের সবুজ মাঠ। দূর থেকে গ্রামটিকে বন্য মনে হতে পারে। এই বন্যতা ভেদ করে পাকা সড়ক গুলতির দুই প্রান্ত ধরে চলে গেছে জামালপুর আর শেরপুর শহরে। ধুলোমাখা পথ ধরে পাকা সড়কের সঙ্গে বিদ্যুৎ এলেও আধুনিকতা এখনও গ্রাস করেনি। চরের মানুষের উগ্রতা সম্পর্কে ঢের শুনেছি, কিন্তু আমাদের আশপাশের গ্রামের মানুষ বেশ শান্ত প্রকৃতির আর এখনও যথেষ্ঠ সহজ-সরল। শহরের সঙ্গে এত নিবিড় যোগাযোগও তাদের সারল্যকে বিনষ্ট করতে পারনি এতটুকু।
আমাদের গ্রামের নাম রায়েরচর। দক্ষিণে লক্ষীরচর আর উত্তরে বারুয়ামারী। জামালপুর শহরের ১৩ কিমি পূর্বে সদর উপজেলার আওতাধীন আমাদের গ্রামখানি। এর অদূরেই এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র—নান্দিনা। জামালপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকার সঙ্গে নান্দিনার সড়ক ও রেলপথের যোগাযোগ বহু পুরানো, একসময় যোগাযোগ ছিল নৌপথেও। নৌপথ, সড়কপথ ও রেলপথটি জামালপুর থেকে নান্দিনা হয়ে ময়মনসিংহে পৌঁছেছে সমান্তরালভাবে। অথচ একসময়ের ব্যস্ত নৌপথ মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের বলি—নদী আজ নিশ্চল, নিথর; যার দরুন নৌপথটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
একসময় প্রচুর পাট হতো আমাদের গ্রামসমূহে। সরকারিভাবে পাটকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের পর এখন ধান আর সবজিই প্রধান শস্য। বেগুন, টমেটো, সীম, আলু, কাঁচামরিচ, লাউ, পিয়াজ, রসুন, বাদাম, তরমুজ, বাংগি, আম, কাঁঠাল, নারিকেল প্রভৃতি ফলে এ অঞ্চলে। এই বসন্তে মেহগনি গাছগুলিকে সদ্য মোড়ক খোলা সবুজ গ্রামসজ্জা বলে মনে হয়। আর কত বাহারি গাছে নতুন সবুজ পাতায় খেলা করে লিলুয়া বাতাস। ফসলের মাঠ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments