-
বাতাস ছুটে যাচ্ছিল বোঁ বোঁ বোঁ শন্ শন্ শন্—
খুকু বলল, বাতাস ও বাতাস, দাঁড়াও দাঁড়াও, আমি তোমার সঙ্গে যাব।
বাতাস বলল, উহু, আমার একটুও দাঁড়াবার সময় নেই, আমার কত কাজ।
কি তোমার এত কাজ, বল না।
কি কাজ? কাজের কি আর অন্ত আছে? ঐ-যে মেঘগুলো দেখছ না—সাদা সাদা মেঘগুলো? আমি ওদের বয়ে নিয়ে যাব, অনেক অনেক দূরের দেশে।
কেন, ওদের নিয়ে যাবে কেন? ওরা কি করবে? কোন দূরের দেশে গো?
অনেক দূরের দেশে যেখানে বিষ্টি হয় না, ঘাস গজায় না, ফসল ফলে না, ফুল ফোটে না, আয় বিষ্টি আয় বিষ্টি বলে সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে—ওরা যাবে সেই দেশে।
-
মানুষ থাকে মাটির উপর—ঘরে কি দালানে। আর পাখিরা থাকে গাছের উপর। এইটাই নিয়ম। শুধু এখন বলে নয়, চিরকালই এই নিয়ম চলে আসছে। তবু মানুষের বাচ্চা হয়েও ওরা দুই ভাই গাছের আগায় বাসা বাঁধল। যে দেখে সে-ই হাসে। এমন কাণ্ড কেউ কোনোদিন দেখেছে?
দুটি ভাই—বলটু আর পলটু। ওদের নিত্যি নতুন খেলা। এ সব খেলার নামও কোনো দিন কেউ শোনে নি। কে-যে ওদের মাথায় এ সব বুদ্ধি যোগায় কে জানে! খুঁজে খুঁজে শেষে দক্ষিণ দিকের চালতে গাছটাকে ওরা বাছাই করল। এই গাছের মাথায় মাচা বাঁধতে হবে। যেমন কথা তেমনি কাজ। সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু হলে গেল। গাছের একেবারে মাথার দিকে তিনটে ডাল
-
চোর গেল রাজবাড়িতে চুরি করতে। কিন্তু রাজবাড়িতে চুরি করা—সে কি আর চাট্টিখানি কথা? পাহারাওয়ালাগুলো সারারাত জেগে জেগে পাহারা দেয়। একটু পায়ের শব্দ কি খচর মচর শুনলে আর কি রক্ষা আছে! অমনি বাজখাই গলায় হেকে ওঠে—কৌন হ্যায় রে? ওরে বাপরে বাপ, সে কি গাল, শুনলে পরে পেটের পিলে চমকে ওঠে।
আচ্ছা, এমন করলে চুরি করা যায়? চোর এদিকে যায়, ওদিকে যায়, উঁকি মেরে দেখে, উঁহুঃ, কোথাও একটু ফাঁক নেই। ভীমের মতো পালোয়ান সব লাঠি বাগিয়ে বসে আছে। একটু টের পেলেই পিটিয়ে ময়দা বানিয়ে ছাড়বে। নাঃ, এখানে চুরি করা যাবে না। চোর মনের দুঃখে রাজবাড়ি থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এলো।
রাজবাড়ী থেকে
-
কুকুর থাকে ঘরের বাইরে। তাকে কেউ ঘরে ঢুকতে দেয় না। অবশ্য বিলেতী কুকুরদের বেলা অন্য ব্যাপার। তাদের সঙ্গে কথা কি। ভুলো একদম দেশী কুকুর, একেবারেই আসল দেশী, একটু ভেজাল নেই। তার বারো বছরের মনিব নীলু তাকে কোথা থেকে জোগাড় করে নিয়ে এসেছিল, ভুলো এখন আর সে কথা মনে করতে পারে না। সেই থেকে নীলুই তাকে একটু একটু করে বড় করে তুলেছে।
নীলুর মতো এমন মানুষ সারা পৃথিবী খুঁজলে মিলবে না, একথা ভুলোর ভালো করেই জানা আছে। সেই তো রোজ তাকে নিজের হাতে খেতে দেয়। মাঝে মাঝে আবার স্নান করিয়ে দেয়। দেশী কুকুরদের অবশ্য স্নান করতে নেই। কিন্তু নীলুকে সে কথা
-
মুরগী তার বাচ্চাকে ডেকে বলল, এই ছোঁড়া, অমন করে খোঁড়াচ্ছিস কেন রে?
বাচ্চা বলল, একটা কাঁটা ফুটেছে মা।
কেন, দেখে পথ হাঁটতে পার না। কেবল দস্যিপনা!
হ্যাঁ, দস্যিপনা! কাঁটাগুলো কেমন করে চোরের মতন লুকিয়ে থাকে, আর দেখ না দেখ, কুটস করে ফুটে বসে। ওদের দেখা যায় নাকি? বাচ্চা নাকী সুরে বলল।
না, দেখা যায় না! কই, আমাদের পায়ে তো ফোটে না।
বাচ্চা এবার সুযোগ পেয়ে মাকে চেপে ধরল, তোমাকে ক’দিন বলেছি মা, আমি চোখে ভালো দেখতে পাই না, আমাকে একটা চশমা এনে দাও। তা তুমি কিছুতেই দেবে না।
আহা-হা, কি কথার ছিরি! মুরগীরা আবার চশমা পরে কোনো দিন?
তবে ওরা
-
সবাই এক রকম জিনিস ভালোবাসে না। এক একজনের এক এক রকম পছন্দ। কেউ ভালোবাসে মিষ্টি, কেউ টক, কেউ নোনতা, কেউ ঝাল, এমন কি এমন লোকও আছে যারা তেতো খেতে ভালোবাসে।
টেপী ভালোবাসে কাঁচা চাল খেতে। ভাত দাও, ডাল দাও, তরকারী দাও, মাছ-মাংস দাও, পিঠে পায়েস দাও, কোনটাতেই আপত্তি নেই, সবই সে খাবে। কিন্তু কাঁচা চাল খেতে তার যত আনন্দ এমন আনন্দ আর কিছুতে নেই। টেপী কে? মুকুলদের বাড়ির কুকুরটা। মুকুলের কাকা ওকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল। তখন ছিল এইটুকুন বাচ্চা। শুধু হাড্ডি আর চামড়া। অমন কুকুর কেউ আদর করে পোষে না। কিন্তু মুকুলের কাকার কেমন যেন মায়া বসে গেল।
-
এক গ্রামে তিন ভাই বাস করত। তারা ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী ও অসমসাহসী। সমবয়সীরা তাদের নিয়ে গর্ব করত, মেয়েরা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকত মুগ্ধ চোখে আর বৃদ্ধেরা তাদের প্রশংসা করত। বাচ্চা বয়স থেকেই ভাইয়েদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব: কখনও তাদের ছাড়াছাড়ি হয় নি, কখনও ঝগড়া বা তর্কও হয় নি তাদের মধ্যে।
একদিন তারা বাজপাখী নিয়ে স্তেপের মধ্যে গেল শিকারের উদ্দেশ্যে।
বহুক্ষণ ধরে তাদের চোখে কোন জন্তু বা পাখী পড়ল না। তারা ঘোড়া ফিরিয়ে গ্রামে ফিরে যাবার উদ্যোগ করছে এমন সময় হঠাৎ দেখতে পেল মাটিতে দেহটা প্রায় মিলিয়ে ছুটে গেল একটা শেয়াল, আগুনের মত লাল। ওর চমৎকার চামড়ার জন্য ভাল দাম পাওয়া যাবে!
-
বহুদিন আগে এক বাদশাহ ছিলেন, দীর্ঘদিন তাঁর কোন সন্তান হয় না। শেষে তাঁর স্ত্রী এক ছেলের জন্ম দিয়ে মারা যান সঙ্গে সঙ্গেই। স্ত্রীর শোকে এমন ভেঙে পড়লেন তিনি যে ছেলের মুখও দেখতে চাইলেন না সেই তার মায়ের মৃত্যুর কারণ বলে: ধাইয়ের ওপর তাকে বড় করে তোলার ভার দিয়ে কড়া আদেশ দিলেন তাকে যেন লুকিয়ে রাখা হয় লোকচক্ষুর আড়ালে, এমন কি দিনের আলোয় যেন তাকে কখনও বাইরে আনা না হয়।
ছেলেটির নাম দেওয়া হল মুজাফ্ফর। রাখা হল তাকে মাটির নীচে তৈরী এক বাড়ীতে, যেখানে দিনের আলোর প্রবেশ নিষেধ—কেবল বাড়ীর ছাদের গম্বুজটা উঠে আছে মাটির উপরে। বাড়ীর বাইরে কখনও যেতে দেওয়া হয়
-
এক ছিল মেয়েমানুষ। অল্পবয়সে বিধবা হল সে ছোট ছোট তিনটি ছেলে নিয়ে। মেয়েমানুষটি অতি কষ্টে বড় করে তুলতে থাকে তাদের, সূতো কাটে, সেলাই করে। ছেলেরা যখন বড় হল তখন তার মাথার শেষ চুলটিও সাদা হয়ে গেছে।
একদিন বুড়ী মা ছেলেদের ডেকে বলল, ‘তোমরা বড় হয়েছ, আমার বয়স হয়েছে, আঙুলগুলো দূর্বল হয়ে পড়েছে আর সূতো কাটতে পারে না মোটে, ছুঁচের গর্তটা আর চোখে দেখতে পাই নে। এবার তোমরা নিজেরাই রোজগারের চেষ্টা কর।
‘মা গো, দেখ আমার কেমন মজবুত চেহারা, হাতে কত বল, খেতিমজুরের কাজ করে যা পাব সব এনে দেব তোমায়,’ বলল বড় ছেলে।
বুড়ী রুটি তৈরী করে রুমালে মুড়ে ছেলের
-
বহুদিন আগে ছিল এক চাষী। খুব ইচ্ছা তার বড়লোক হবার। তাই সৎপরিশ্রমে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেটে সে জমাল তিনশ’ সোনার মোহর। একটা কৌটোর মধ্যে সে রেখে দিয়েছে সেগুলোকে, প্রতিদিন সেগুলোকে ঢেলে গোনে একবার করে।
একদিন সে এমনি গুনছিল যখন তখন বাড়ীর ফটকের কাছে শুনতে পেল বন্ধুর গলা। ভয় হল তার যে বন্ধু জেনে ফেলবে তার এই সম্পত্তির কথা, তাই তাড়াতাড়ি সেগুলোকে ভয়ে রাখল একটা কলসের মধ্যে, তারপর গেল বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে। বন্ধ বলল: ‘ওই বাড়ীর প্রতিবেশী তোকে আর আমাকে যেতে বলেছে। চল যাই।’
চলল তারা দু’জনে। যাক তারা, আমরা এদিকে দেখি চাষীর বাড়ীতে কি হল। তার বউ কলসটা
-
সমরখন্দ এক বাই থাকত, আর এক বাই থাকত পাহাড় এলাকায়। যে পাহাড়ী এলাকায় থাকত সে ছিল আশ্চর্য কিপ্পণ। তার ছিল কতকগুলো ভেড়ার পাল, কতকগুলো ঘোড়ার পাল, কয়েকজন খেতিমজুর আর তিন বউ। সমরখন্দের বাইও কম যেত না তার কাছে কিপটেমিতে: ধনসম্পত্তি তারও কম ছিল না: টালির তৈরী বাড়ি, ঘোড়ার পাল, ভেড়ার পাল। কিন্তু সে এমনকি গরীব মানুষকে একটুকরো রুটিও দিত না, কখনও ভিক্ষা দিত না, দিনমজুর রাখত না, সব কাজ নিজে করার চেষ্টা করত।
সমরখন্দের বাইয়ের স্ত্রী যুবতী, তার মোটেই ভালো লাগে না বাইয়ের এই কিপটেমি। সে প্রতিজ্ঞা করল যে তার স্বামী মরে গেলে সে আবার বিয়ে করবে এক উড়নচণ্ডিকে।
বাই
-
গার্ম শহর থেকে এক পালোয়ান এল হীসার শহরের বাজারে সেখানকার পালোয়ানের সঙ্গে শক্তির লড়াই করে দেখার ইচ্ছা হল তার।
‘এস দেখা যাক, আমাদের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী?’ বলল গার্মের পালোয়ান।
লড়াই আরম্ভ হল তাদের। সে লড়াই দেখতে লোক জড় হল।
লড়াই করতেই লাগল তারা, কিন্তু কেউ কাউকে হারাতে পারে না কিছুতেই। সূর্য পাটে বসেছে। আঁধার নামছে ওদিকে। তখন গার্মের পালোয়ান গীসারের পালোয়ানকে বলল, ‘চল, চাখানায় যাওয়া যাক, চা খাওয়া যাবে আর বাজি রেখে দেখব কে যেতে। আমাদের মধ্যে যে বলতে পারবে সবচেয়ে বড় গাঁজাখুরি গল্প যে গল্পে উপস্থিত শ্রোতাদের কেউ বিশ্বাস করবে না, সেই জিতবে।’
‘ঠিক আছে।’ বলল হীসারের পালোয়ান।
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭)
- আন্দ্রেই দুগিনেৎস (১)
- আলেক্সান্দর বাত্রভ (১)
- ইউরি ইয়াকভলেভ (১২)
- খান মোহাম্মদ ফারাবী (১২)
- খালিদা হাসিলভা (১)
- গজেন্দ্রকুমার মিত্র (৫)
- গোলাম মোরশেদ খান (৭)
- চার্লস ডিকেন্স (৩)
- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- নিকোলাই নোসভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (৫৩)
- প্রযোজ্য নয় (৩)
- ফরহাদ খুররম (১২)
- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (৮)
- ভিক্টর গোলিয়ভকিন (১)
- ভিক্তর দ্রাগুনস্কি (১)
- ভ্লাদিমির জেলেজনিকভ (১)
- ভ্লাদিমির বইকো (১)
- ভ্লাদিস্লাভ ক্রাপিভিন (১)
- মহমেৎ ইয়াখিয়ায়েভ (১)
- লীলা মজুমদার (১)
- শিবরাম চক্রবর্তী (১)
- সত্যেন সেন (১৯)
- সুবীর বৈরাগী (১)
- সেমিওন শুরতাকভ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.