নাগাসাকির ফুকুদা
দিনের পর দিন দারুণ গরমে আমরা সবাই একেবারে নাস্তানাবুদ। সকাল থেকেই শুরু হয় নতুন ব্লেডের মতো ধারালো রোদ্দুরের ঝালাপালা, সারাদিন চলতেই থাকে, মনে হয় যেন রুটি সেঁকার একটা গনগনে তন্দুরে আমাদের ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। পার্থক্যের মধ্যে তন্দুরের রুটিগুলি সেঁকা হয়ে গেলে লম্বা একটা শিক বিঁধিয়ে তুলে আনা হয়, আমাদের তোলা হচ্ছে না, সেঁকতে সেঁকতে মচমচে করা হচ্ছে।
আর বাতাসও নেই বললেই চলে। মাঝে মধ্যে বইছে যা-ও বইছে সে-ও আগুন-গরম। শরীরটা ঠান্ডা তো হয়ই না বরং চোখে মুখে ফোস্কা পড়ার অবস্থা।
ইকবাল মামার ধারণা, সূর্যটা ক্রমশই নিচের দিকে নামছে, অচিরেই মানুষের মাথার উপর চলে আসবে এবং রোজ-কিয়ামত হয়ে যাবে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিনই ও চলে যায় পুকুর-পাড়ে ঝাকড়া পাতার চালতা গাছের নিচে। প্রতি ঘণ্টায় একবার করে পানিতে নেমে গোসল করে আর একটা করে আইসক্রিম খায়। তবুও নাকি শরীর ঠান্ডা হয় না এক রত্তিও। সারাদিনই ওর শুধু হাঁসফাঁস আর হাঁসফাঁস।
শেষে তো একদিন রেগেমেগে ইকবাল মামা বলেই ফেলল—‘ছি এমন দেশেও মানুষ থাকে! এর চেয়ে যদি এস্কিমো হয়ে উত্তর মেরুতে জন্ম নিতাম তবুও ভালো ছিল। সারাদিন বরফে বরফে শিকার করে বেড়াতাম। রাতে বরফের ঘর ইগলুতে শুয়ে ঘুমাতাম। কী ঠান্ড! কী আরাম!
আমি মৃদু হেসে বললাম, ‘মামা, ইচ্ছে করলে বরফ কিনে তুমি এখানেও ইগলু বানাতে পারো’।
‘সত্যি!’ ইকবাল মামার গলায় আকাশ-ছোঁয়া উচ্ছ্বাস। ‘আচ্ছা কয় মণ বরফ হলে একটা ইগলু বানানো যায় বলতে পারিস, বাবলা’?
যদিও আমি ইগলু বিশেষজ্ঞ নই, তবুও সবজান্তা ভঙ্গিতে বললাম, ‘বই-এতে দেখেছিলাম বারো টনের মতো লাগে’।
বারো টন বরফের দাম হিসেব করে ইকবাল মামা একটু দমে গেল। মুখ কালো করে বলল, ‘শুধু শুধু কি আর এস্কিমো হতে চাই! ওদের দেশে তো বরফ কিনতে পয়সাই লাগে না। যত ইচ্ছে আইসক্রিম খাও, যত ইচ্ছে ইগলু বানাও’। কথা শেষ করে উদাস হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে রইল ইকবাল মামা।
হঠাৎ করেই সেদিন বিকেলের দিকে আকাশের উত্তর-পশ্চিমে কোণে এক টুকরো মেঘ দেখা গেল। বাতাসও হয়ে উঠল হালকা ঠান্ডা। শরীরটাকে আরও ঠান্ডা করতে ইকবাল মামা ছুটল নদীর ধারে পার্কে। আমিও গেলাম ওর পিছু পিছু।
পার্কের উত্তর দিকে বাহারি একটা বিদেশি-ফুলের ঝোপের আড়ালে নিরিবিলি জায়গায় ইকবাল মামা ঘাসের উপরে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল। আমি বসলাম একটু দূরে, নদীর দিকে মুখ ফিরিয়ে। নদীর ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাস মুহূর্তেই শরীরমন জুড়িয়ে দিলো। সাথে সাথেই ইকবাল মামা প্রতিদিনের সব বিরক্তি ভুলে তার বিখ্যাত গলায় ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে, আমার জন্মভূমি’—বলে গান জুড়ে দিল।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘মামা! এস্কিমো না হয়ে এদেশে জন্মেই বোধহয় ভালো করেছো, তাই না!’
ইকবাল মামা বোধহয় একটু লজ্জা পেল। অপ্রতিভ একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘ধ্যাত, এস্কিমো হয়ে সারাজীবন কাঁচা মাংস খাই, এই কি তুই চাস!
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে, ইকবাল মামা তার বিখ্যাত হেঁড়ে গলায় আবার গানে মনোনিবেশ করল। ওর গান যে শুনেছে, সেই শুধু জানে কী ভয়ঙ্কর সে গান! কানের কাছে ফুল-স্পিডে চারটি মাইক বাজলেও মামার গলার সমান হবে কি না কে জানে! মণি আর রবিনের ধারণা ইকবাল মামার গান গাড়ির হাইড্রলিক হর্নের চেয়ে বিপজ্জনক। তাই আইন করে হাইড্রলিক হর্নের সাথে ওর গানও বন্ধ করা উচিত। তবে আশার কথা এই, মামা কোনো গানই প্রথম দু-এক লাইনের বেশি জানে না।
একজন বুড়ো-মানুষ আমাদের কাছাকাছি বসে চাকুম-চুকুম করে আইসক্রিম খাচ্ছিলেন। একটু পরেই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এখানেও মাইক!
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments