-
লকড়ি-গুদামটায় উঠে উর্সের কাছে ঘেঁষবে এমন কোনো ছেলের কথা আমি শুনিনি। কিন্তু একটি মেয়ের কথা জানি, কেট—সে এটা পারে। উর্সকে সে ভয় পায় না। কাঁটা-তারের তল দিয়ে সে ঢোকে, উর্স কিন্তু খেঁকিয়ে আসে না, ডাকে না ভাঙা-ভাঙা গলায়, কামড়ে ছেঁড়ে না তার ফ্রক। দু’জনের মধ্যে বেশ ভাব—রোগা সরু ঠেঙে কেট আর দক্ষিণ রাশিয়ার পাহারাদার কুকুর উর্স।
ছেলেপিলেরা বলে, কেট কী একটা মন্ত্র জানে। সেটা বাজে কথা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাতে নাক কুঁচকে ওঠে তার কেউ মিথ্যে কথা বললে সে বরাবরই নাক কোঁচকায়।
উর্স দেখতে প্রকাণ্ড। গায়ের লোম তার ঝুলে ঝুলে থাকে নোলকের মতো। কপালের নোলকগুলো পড়ে চোখর ওপর। চোখের
-
‘চলো বনে যাই। স্কী করব।’
‘দিনটা স্কী করার মতো নয় রে। দেখ-না, কেমন ঝড় উঠেছে।’
‘উঠুগ গে ঝড়।’
‘স্কীয়ের পথগুলো নিশ্চল বরফে ঢেকে গেছে।’
‘নতুন পথ কাটব আমরা। আমি যাব আগে-আগে। নাও, পোষাক পরো।’
‘কালকে গেলে হয় না?’
‘আমি গিয়ে স্কী নিয়ে আসছি, তুমি পোষাক পরে নাও।’
‘বেশ।’
ছেলে তার জেদ ছাড়লে না। স্কী আনতে গেল সে, আর অনিচ্ছায় জুতো পরতে লাগল বাপ।। ঠাণ্ডা,কড়া জুতো, পশমের মোটা মোজা পরা পা তাতে কিছুতেই ঢুকতে চাইছিল না। তারপর বহুক্ষণ ধরে ফিতে বাঁধতে লাগল সে, যেন ইচ্ছে করেই সময় নিচ্ছে: ঠাণ্ডায় বেরতে চাইছিল না।
ছেলে ওদিকে স্কী নিয়ে, পোষাক পরে, এসে দাঁড়িয়েছে পাশেই,
-
সুবচনীর খোঁড়া হাঁস এই সব বুনো-হাঁসদের দলে ভিড়ে উড়তে, আর এ-গ্রামের সে-গ্রামের সব সরাল, ঘেংরালদের দেখে হাসি-মস্করা করতে পেয়ে, ভারি খুশি হয়েছে। সে ভুলে গেছে যে নিজেই সে এত-কাল পালা-হাঁসই ছিল—ঐ সরাল-ঘেংরালের মতো ঘর আর পুকুর করে কাটিয়েছে। তার উপর সে আজন্ম-খোঁড়া, সবে আজ নূতন উড়ছে। বুনো হাঁসের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে চলা তার কর্ম নয়! খোঁড়ার ডানার তেজ ক্রমেই কমছে আর দমও ক্রমে ফুরিয়ে আসছে, সে হাঁপাতে-হাঁপাতে তাড়াতাড়ি ডানা ঝাপটেও আর পেরে উঠছে না মধ্যে থেকে এক-এক-করে প্রায় আটহাঁস পিছিয়ে পড়েছে। সেথো হাঁসরা যখন দেখলে খোঁড়া পিছিয়ে পড়ে, আর পারে না, তখন পাণ্ডা-হাঁসকে ডাক দিয়ে জানালে—“চকা-নিকোবর, চকা-নিকোবর!”
চকা উড়তে-উড়তেই
-
মেঘনার মোহানায় চর যে কখন কোথায় পড়ে, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। আজ যেখানে জল, কাল সেখানে দেখা গেল চড়া পড়ে বালি ধূ-ধূ করছে; কাল যেখানে দেখেছি চরে উলু-ঘাস, বালু-হাঁস; বছর ফিরতে সেখানে দেখলেম চরও নেই, হাঁসও নেই—অগাধ জল থৈথৈ করছে! এক-রাতের মধ্যে হয়তো নদীর স্রোত ফিরে গেল—জলের জায়গায় উঠল বালি, বালির জায়গায় চলল জল।
বাগদী-চরে হাঁসেরা যখন উড়ে বসল, তখন চরের চারদিকে জল—ডাঙা থেকে না সাঁতরে চরে আসা মুশকিল। অপার মেঘনার বুকে একটুকরো ময়লা গামছার মতো ভাসছিল চরটি, কিন্তু রাত হতেই জল ক্রমে সরতে লাগল, আর দেখতে-দেখতে সরু এক-টুকরো চড়া, ডাঙা থেকে বাগদীচর পর্যন্ত, একটি সাঁকোর মতো দেখা দিলে।
চাঁদপুরের জঙ্গলে
-
ঝাউ-গাছের উপর থেকে খোঁড়া হাস ঠোঁটে-করে রিদয়কে বাগদী-চরের থেকে একটু দূরে নালমুড়ির চরে নামিয়ে দিয়ে সারাদিন বুনো হাঁসের দলের সঙ্গে শেয়ালকে নিয়ে ঝপ্পটি আর দাঁতকপাটি খেলে বেড়াচ্ছে। ক্রমে সন্ধ্যে হয়ে এল দেখে রিদয় ভাবছে, নিশ্চয়ই হাঁসেরা রাগ করে তাকে ফেলে গেছে, এখন কেমন করে সে বাড়ি যায়? আর কেমন করেই বা ঐ বুড়ো-আংলা চেহারা নিয়ে বাপ-মায়ের সঙ্গে দেখা করে? ঠিক এই সময় মাথার উপর ডাক দিয়ে হাঁসের দল উড়ে এসে নালমুড়িতে ঝুপঝাপ পড়েই জলে নেমে গেল। চরে মেলাই কাছিমের ডিম, রিদয় তারি একটা ওবেলা, একটা এবেলা খেয়ে পেট ভরিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। এমনি সে-রাত কাটল। ভোর না হতে হাঁসের দল
-
সুরেশ্বর ছেড়ে বৃষ্টি আরম্ভ হল। এতদিন রোদে কাঠ ফাটছিল। সকালে যখন হাঁসের দল যাত্রা করে বার হল তখন আকাশ বেশ পরিষ্কার কিন্তু ব্রহ্মপুত্র-নদের রাস্তা ধরে যতই তারা উত্তর-মুখে এগিয়ে চলল, ততই মেঘ আর কুয়াশা আর সঙ্গে-সঙ্গে বৃষ্টি দেখা দিলে! হাঁসের ডানায় পাহাড়ের হাওয়া লেগেছে, তারা মেঘ কাটিয়ে হু-হু করে চলেছে; মাটির পাখিদের সঙ্গে রঙ-তামাশা করে বকতে-বকতে চলবার আর সময় নেই, তারা কেবলি টানা স্বরে ডেকে চলেছে—“কোথায়, হেথায়, কোথায়, হেথায়।”
হাঁসের দলের সাড়া পেয়ে ব্রহ্মপুত্রের দুপারের কুঁকড়ো ঘাঁটিতে-ঘাঁটিতে জানান দিতে শুরু করলে। পুব পারের কুঁকড়ো হাঁকলে—“সাতনল, চন্দনপুর, কোমিল্লা, আগরতলার রাজবাড়ি, টিপারা, হীলটিপারা!” পশ্চিম পারের কুঁকড়ো হাঁকলে—“মীরকদম, নারাণগঞ্জ, ঢাকার নবাববাড়ি, মুড়াপাড়া।” পুবে
-
উত্তর থেকে বড়নদী দেখানে ব্রহ্মপুত্রের জলে এসে মিলেছে ঠিক সেই বাঁকের মুখেই কতকালের পুরানো ডিমরুয়ার আসামী রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি। নাটবাড়ির নিচেই নদী মজে গিয়ে মস্ত চর পড়েছে। এত কাল থেকে হাড়গিলে পাখিরা এই চর দখল করে আছে যে, ক্রমে চরটার নামই হয়ে গেছে হাড়গিলার চর। এই চরের ওপারেই দেওয়ানগিরি মস্ত একটা বুড়ো আঙুলের মতো আকাশের দিকে ঠেলে উঠেচে। এই দেওয়ানগিরি হল যত ফরিয়াদি পাখির আড্ডা। একপারে রইল আসামী মাছেদের রাজা আড়িমাওয়ের নাটবাড়ি আর এক পারে দেওয়ানী ফরিয়াদির আড্ডা দেওয়ানগিরি, মাঝখানে বসে রয়েছেন হাড়গিলে। আসামী ফরিয়াদিতে লড়াই মোকদ্দমা প্রায়ই হয়, তাতে দুই দলই মাঝে-মাঝে মারা পড়ে।
হাড়গিলের খাম্বাজং রাজা দুই দলের
-
আমার বিশ্বাস, প্রাণকান্ত ভুল করিতেছে।
গণেশ পপুলার লোক। জনপ্রিয় হইতে হইলে যে সকল গুণাবলী থাকা নিতান্তই প্রয়োজন গণেশের সে সকল আছে। সংক্ষেপে, সে মিথ্যাবাদী, মিষ্টভাষী এবং প্রয়োজনীয়। অনর্গল মিথ্যাভাষণ সত্ত্বেও তাহার মিষ্টবচনে আমরা বিগলিত হইয়া যাই এবং নিজেদের প্রয়োজনের খাতিরে তাহাকে ত্যাগ করিতে পারি না। গণেশের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিলে প্রাণকান্তের পরাজয় অনিবার্য।
জনপ্রিয় বলিয়া গণেশ যে অজাতশত্রু এমন কথা বলিতেছি না। জনপ্রিয় বলিয়াই তাহার শত্রু আছে। কিন্তু এই সকল শত্রু এখনও পরোক্ষচারী। প্রকাশ্যত গণেশের বিরুদ্ধাচরণ করিবার মতো শক্তিসংগ্রহ এখনও তাহারা করিতে পারে নাই। মনে মনে তাহারা গণেশ-চরিত্রের ছোট বড় নানা দোষের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করে এবং সুযোগসুবিধামতো সেগুলিতে নানা রঙ ফলাইয়া
-
সেদিন প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি নামল সন্ধ্যার আগেই। দুপুর থেকে গুমোট হয়েছিল, বিকেল বেলা মেঘ এল আকাশ ছেয়ে। অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক। কড় কড় করে বাজ পড়ল কোথায় যেন। তাড়াতাড়ি বাড়ির সদর দরজাটা বন্ধ করে দিল শঙ্করী। তারপর ঘরের জানালাগুলোও।
একটা জানালা বন্ধ করা গেল না। ছিটকিনি ছিল না। বার বার খুলে যেতে লাগল সেটা। জলের ছাঁট ঢুকতে লাগল ঘরের ভিতর। জানালার নীচেই দড়ির খাট ছিল একখানা, তার উপর বিছানা ছিল। সেইটে টেনে সরিয়ে নিয়ে এল শঙ্করী। তারপর জানালাটা ঢেকে দিলে একটা মোটা কম্বল দিয়ে। তবু জল আসতে লাগল, কপাট দুটো দড়াম দড়াম শব্দও করতে লাগল। শঙ্করী ভ্রূকুঞ্চিত করে চেয়ে রইল সেদিকে
-
শালা হারামিকা বাচ্চা...
একটু চটলেই এই তার বুলি, কখনও স্বগত কখনও প্রকাশ্যত। ছোট নিষ্ঠুর চোখ দুটো, মুখময় ছোট বড় কতকগুলো আঁচিল, একটা ছোট আবও আছে ডান দিকের চোয়ালটার নীচে। ভ্রূ নেই বললেই হয়। দাড়ি আছে। কটা, কোঁকড়ানো, অবিন্যস্ত। হঠাৎ দেখলে মনে হয় একটা ওলের উপর কটা চুল গজিয়েছে, কতকগুলো। তাকে কেউ বোঝে না, সে-ও কাউকে বুঝতে চায় না। তাই উদীয়মান কমিউনিস্ট লেখক কমরেড দুলাল দত্ত যখন গল্প লেখার রসদ সংগ্রহ করবার উদ্দেশ্যে তার বাড়ি গিয়ে জিন্না-গান্ধী-সম্পর্কিত আলোচনা করে মুসলমানের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং পাকিস্তান যে কতদূর ন্যায়সঙ্গত তা বিচার করে তার প্রকৃত-মনোভাব জানবার চেষ্টা করছিল তখন যদিও সে তার হলদে শ্বা-দন্ত
-
একেই বলে বিড়ম্বনা।
আমি একজন ডেলি প্যাসেঞ্জার। সেদিন সমস্ত দিন আপিসে কলম পিষে ঊর্ধ্বশ্বাসে হাওড়ায় এসে লোকাল ট্রেনের একখানি থার্ড ক্লাসে বসে হাঁপাচ্ছি—এমন সময় দেখি সামনের প্লাটফর্ম থেকে বোম্বে মেল ছাড়ছে আর তারই একটি কামরায় এমন একখানি মুখ আমার চোখে পড়ে গেল যাতে আমার সমস্ত বুক আশা আনন্দে দুলে উঠল।
বহুদিন আগে আমার এক ছেলে তারকেশ্বরে মেলা দেখতে গিয়ে ভিড়ে কোথায় হারিয়ে যায়—আর ফেরেনি। অনেক খোঁজ-খবর করেছিলাম, কিছুতেই কিছু হয়নি। ভগবানের ইচ্ছা বলে মনকে প্রবোধ দিয়েছিলাম। আজ হঠাৎ তারই মুখখানি—হ্যাঁ, ঠিক সেই মুখটিই বোম্বে মেলের একটা কামরায় দেখতে পেলাম।
আর কি থাকতে পারি?
তাড়াতাড়ি গিয়ে বোম্বে মেলে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে
-
বেড়ালের বাচ্চাটা খুঁত খুঁত করে কাঁদছিল।
ওর মা জিজ্ঞাসা করল, কিরে, অমন করে কাঁদছিস কেন? কি, হয়েছে কি?
বা রে, কাঁদব না? আমার খিদে পেয়েছে যে।
ও মা, খিদে পেয়েছে তো খা। কান্নাকাটির কি হয়েছে? তোকে নিয়ে আর পারি না বাপু, খুত খুত আর খ্যাঁত খ্যাঁত দিন রাত লেগেই আছে। যা, কাল রাত্তিরে দুটো ইঁদুর মেরে খাটের তলায় রেখে দিয়েছি। ওর মধ্যে বাচ্চা ইঁদুরটা খা গিয়ে। বড়টা কিন্তু খাসনে। ও তুই হজম করতে পারবি নে। যা তোর শরীর, পেটের অসুখ তো লেগেই আছে।
বাচ্চা যেমন ছিল তেমনি বসে রইল। মার কথাটা যে ওর মনে লাগে নি। একটু বাদেই সে আবার
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭)
- আন্দ্রেই দুগিনেৎস (১)
- আলেক্সান্দর বাত্রভ (১)
- ইউরি ইয়াকভলেভ (১২)
- খান মোহাম্মদ ফারাবী (১২)
- খালিদা হাসিলভা (১)
- গজেন্দ্রকুমার মিত্র (৫)
- গোলাম মোরশেদ খান (৭)
- চার্লস ডিকেন্স (৩)
- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- নিকোলাই নোসভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (৫৩)
- প্রযোজ্য নয় (৩)
- ফরহাদ খুররম (১২)
- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (৮)
- ভিক্টর গোলিয়ভকিন (১)
- ভিক্তর দ্রাগুনস্কি (১)
- ভ্লাদিমির জেলেজনিকভ (১)
- ভ্লাদিমির বইকো (১)
- ভ্লাদিস্লাভ ক্রাপিভিন (১)
- মহমেৎ ইয়াখিয়ায়েভ (১)
- লীলা মজুমদার (১)
- শিবরাম চক্রবর্তী (১)
- সত্যেন সেন (১৯)
- সুবীর বৈরাগী (১)
- সেমিওন শুরতাকভ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.