নবজাগরণের গল্প
এর আগের গল্পগুলোতে তোমরা জানতে পেরেছ যে বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছিল প্রাচীন গ্রিসে এবং সে সময়টি ছিল যিশুখ্রিস্ট জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা বাধা পায় খ্রিস্ট জন্মের কয়েকটি শতাব্দী পর—আর সে বাধার মূল কারণটি কিন্তু তারই প্রচারিত নতুন ধর্ম-খ্রিস্ট ধর্ম। কীভাবে এ বিষয়টি ঘটলো, সেটাই এখন তোমাদের সংক্ষেপে বলছি। আর ধর্মের সে বাধাটি জয় করে তার হাজার বছর পর বিজ্ঞান আবার আমাদের ফিরে এলো—সে গল্পটিই হচ্ছে রেনেসাঁ বা নবজাগরনের গল্প। তাহলে এসো, সে গল্পটিই এখন কাছে শোনা যাক।
ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মের উত্থান শুরু হয় চতুর্থ শতকে, যখন রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন নিজে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহন করে একে বাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করেন। এর ফলে একসময়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া খ্রিস্টান যাজক ও তাদের অনুসারীরা সম্রাটের আনুকূল্যে সারা রোমান সাম্রাজ্য জুড়েই প্রভাব বিস্তার করতেথাকেন। ধর্মের লৌহকঠিন নিয়মকানুনগুলো ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা শতাব্দী-প্রাচীন দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রগুলো ধর্মের পতাকাবাহী শক্তি দ্বারা একে একে আক্রান্ত হতে থাকে।
সক্রেটিসের শিষ্য ও প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক প্লেটোর সেই বিখ্যাত জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র আকাদেমি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী শহর আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চার একটি নিভু নিভু দীপশিখা জ্বালিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ১১৫ খ্রিস্টাব্দে সে ক্ষীণ দীপশিখাটিকেও স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। এ গ্রন্থাগার ও দর্শনচর্চা কেন্দ্রটির সর্বশেষ দার্শনিক ও গণিতবিদ, অনিন্দ্যসুন্দরী কুমারী হাইপেশিয়া ছিলেন দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চায় নিজেকে উৎসর্গ করা একজন। আর সেই উৎসর্গিত প্রাণ দার্শনিক-বিজ্ঞানীকে প্রকাশ্য রাজপথে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে সিরিল নামক এক খ্রিস্টান যাজকের লেলিয়ে দেওয়া ধর্মান্ধ উন্মত্ত জনতা। আর সে অমূল্য গ্রন্থাগারটি তাদেরই দেওয়া আগুনে শত শত দুষ্পাপ্য পাণ্ডুলিপিসহ ভস্মীভূত হয়। আর সর্বশেষ মারাত্মক আঘাতটি আসে ৫২৯ খ্রিস্টাব্দে, যখন ন্যায়পরায়ণ বলে পরিচিত বাইজেন্টাইন সম্রাট জাষ্টেনিয়ান সমগ্র পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যে দর্শনশ্চর্চা নিষিদ্ধ করে দর্শনের সবগুলো পাঠশালা বন্ধ করে দেন।
অবশ্য এ আদেশের ফলে দর্শনের চর্চা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা বলা ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে তা চালু ছিল কোথায়, তা জানো? তা চালু ছিল গির্জা বা চার্চের অভ্যন্তরে পাদরিদের মধ্যে। শুধুমাত্র তাদের কাছেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিগুলো পড়ার ও চর্চার সুযোগ ছিল। তবে তাদের এই জ্ঞানচর্চার ফসল সীমাবদ্ধ রইল গির্জার লৌহকপাটের ভেতরই—সাধারণ জনগণের কাছে তা কোন উপকার নিয়ে আসেনি। এভাবেই আমাদেরকে কাটাতে হয়েছে প্রায় পুরো একটি সহস্রাব্দ—ইতিহাসে যাকে বলা হয় অন্ধকার যুগ। একে কেন অন্ধকার যুগ বলা হয়, তা জানো? একে অন্ধকার যুগ এজন্যে বলা হয়, কারণ সে যুগে সবকিছু থাকলেও একটি জিনিস ছিলনা—আর তা হচ্ছে বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা।
কিন্তু একসমযে মধ্যযুগের এই সূচীভেদ্য অন্ধকারও কাটতে শুরু করে, ধীরে ধীরে দেখা দিতে শুরু করে নতুন এক জাগরণের ঊষার আলোক। তোমরা হয়তো বুঝতে পারছ যে এই নতুন ঊষার আলোকই ইতিহাসে পরিচিত নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বলে। এটি শুরু হওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে মুসলিম অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় মোহাম্মদ কর্তৃক ১৪৫৩ সনে খ্রিস্টান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল বিজয়। এই শহরটি কোনটি, তা কি তোমরা জানো? এই শহরটিই হচ্ছে ইউরোপ ও এশিয়াকে ভাগ করা বসফোরাস প্রণালীর তীরে অবস্থিত বর্তমান তুরস্কের ইস্তাম্বুল নগরী। তুরস্কে মুসলমান সম্রাট মোহাম্মদের এই বিজয়ের ফলে খ্রিস্টান যাজকদল তাদের সব পুঁথিপুস্তক শকটে চাপিয়ে পশ্চিম ইউরোপ অভিমুখে পলায়ন করে। এ সমস্ত জ্ঞানী সন্ন্যাসীদেরকে আশ্রয় দেয় ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, হল্যান্ড, ইংল্যান্ড ইত্যাদি উদারপন্থী খ্রিস্টান দেশগুলো। এ ঘটনাটিই পরবর্তীতে ইউরোপের হাজার বছরব্যাপী গুমোট মধ্যযুগীয় আবহাওয়া সরিয়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments