ধূর্ত কবি
একসময় বুখারাতে ছিল এক চারণকবি। তার খুব সুন্দর গলা ছিল। প্রতি শুক্রবারে মসজিদের সামনে লোক জড় করে তার রচিত বিভিন্ন কাহিনী শোনাত। লোক জড় হত সবসময় প্রচুর। একদিন সে কাহিনী শেষ করার পর লোকেদের কাছ থেকে পয়সা নিতে লাগল এই বলে: ‘ভাইরা, খোদার দয়ায় আমি জাদুর ভেলকী দেখাতে জানি। তোমরা প্রত্যেকে কিছু কিছু করে দাও আমি তোমাদের জাদুর ভেলকী দেখাব।’
লোকেদের জাদুর ভেলকী দেখতে ইচ্ছে হল তাই তারা সবাই পয়সা দিল। কবি সব পয়সাগুলো নিয়ে বলল: ‘ভাইরা, আজ দেরী হয়ে গেছে খোদাবন্দের ইচ্ছা যে আজ আমি যেন ভেলকী না দেখাই। পরের শুক্রবারের দেখতে পাবে ভেলকী।’
কবি বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। লোকেরাও বাড়ি চলে যেতে যেতে বলাবলি করতে লাগল: ‘এ কবিটা, ওর বাপের মুখ পুড়ুক, ঠকাল আমাদের।’ তিনজন লোকের ভীষণ রাগ হল, তারা ঠিক করল: ‘ঠগটাকে ভাল করে শিক্ষা দিতে হবে। ওকে ধোলাই না দিলে হিসাব মেটান যাবে না ওর সঙ্গে।’
তারাও চলল কবির পিছন। কবি থাকত বুখারার মাদ্রাসাতে। ঘরে এসে সে ডেকচি উনুনে চাপিয়ে পোলাও রান্না করতে আরম্ভ করল, এমন সময় হুড়মুড় করে তার ঘরে এসে ঢুকল সেই তিনজন যারা তাকে ধোলাই দিতে চেয়েছিল। কবি বুঝল ঠিকই কি জন্য এসেছে তারা, কিন্তু বসতে বলল তাদের, ‘আসুন, আসুন, অতিথিরা আসতে আজ্ঞা হোক। ঠিক সময়েই এসেছেন। এখুনি পোলাও তৈরী হয়ে যাবে। ততক্ষণ আসুন চা খাওয়া যাক।’
প্রত্যেকের দিকে পেয়ালা এগিয়ে দিল সে। অনাহুত অতিথিরা দেখল সত্যিই পোলাও প্রায় তৈরী, চোখ টেপাটেপি করে ঠিক করল প্রথমে খেয়ে নেবে তারপর শিক্ষা দেবে। বসল তারা, কবি তাদের সামনে চা এগিয়ে দিচ্ছে আর বলছে ওদিকে, ‘ যখন বয়স কম ছিল খুব মিষ্টি গলা ছিল আমার। সপ্তাহে একদিন করে আমি কাহিনী শোনাতাম আমীর দরওয়াজার কাছে, গোটা বুখারার লোক জড় হত আমার কাহিনী শুনতে। একদিন যখন আমি বলছি আমার কাহিনী, দেখি দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে এক সুন্দরী আমার কথাগুলো শুনছে প্রচণ্ড আগ্রহে। সেদিকে তাকিয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেল আমার। প্রতিদিন যেতে লাগলাম দরওয়াজার কাছে। যেই কাহিনী বলা আরম্ভ করতাম অমনি এসে দাঁড়াত মেয়েটি, চুরি করে তার সৌন্দর্য উপভোগ করতাম আমি। ক্রমশ আমার মনে জ্বলে উঠল প্রেমের আগুন। শেষে একদিন মাঝরাতে এলাম আমি দরওয়াজার কাছে, অনেকক্ষণ ঘুরলাম দরওয়াজার কাছে পিঠে যতক্ষণে না প্রহরীদের সতর্ক চোখ ফাঁকি দিয়ে পাঁচিল পেরিয়ে ঢুকতে পারলাম ভিতরে। চারদিক অন্ধকার, কেবল একটা ঘরে আলো জ্বলছে। জানলায় উঁকি দিয়ে দেখি সে ঘরে ঘুমোচ্ছে চল্লিশটি মেয়ে। মনে মনে বললাম: ‘আমার হৃদয়ের অধিকারিণীও নিশ্চয়ই এখানে।’ ঢুকলাম ঘরে, মেয়েরা রূপে একে অপরকে হার মানায়। ভাবলাম: ‘এদের মধ্যে কে সেইজন যে আমাকে এমন নির্ভয় করে তুলেছে?’ দেখি, শুয়ে আছে সে একেবারে সবার মাঝখানে, তার মাথার কাছে রয়েছে বাতিদান, তাতে জ্বলছে চল্লিশটা বাতি। তার কাছে এগিযে যাব ভেবে যেই এগিয়েছি ধাক্কা লেগে গেল একটি মেয়ের গায়ে। মেয়েটির ঘুম ভেঙে গেল, সে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করতে লাগল, ‘বাবা গো, মা গো, চোর, চোর!’
কবি হাত তালি দিয়ে আবার চিৎকার করল, ‘বাবা গো, চোর, চোর, ধর!’
সে চিৎকার শুনে উঠোন থেকে ছুটে এল মাদ্রাসার ছাত্ররা। কবি অনাহূত অতিথিদের দেখিয়ে তাদের বলল, ‘ওই যে চোর, মার ওদের!’
ছাত্ররা তাদের মারতে মারতে বার করে দিল মাদ্রাসা থেকে। কোনক্রমে প্রাণে বাঁচল তারা।
আর কবি নিজের এই চাতুরীতে খুব খুশী হয়ে হাঁড়িভর্তি পোলাও রান্না করে তার রক্ষাকর্তাদের সবাইকে খাওয়াল পেটভরে।
তাজিক লোককাহিনী, অনুবাদ: পূর্ণিমা মিত্র, আঁকিয়ে: ইল্যুস মুর্সালিমভ,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments