-
ছিল একটা লোক, ছিল তার একটা বেড়াল, কিন্তু এতই বুড়ো যে ইঁদুর ধরতে পারত না। বাড়ির কর্তা ভাবলে, ‘এ বেড়াল দিয়ে আমার কী হবে? নিয়ে যাই, বনে ছেড়ে দিয়ে আসি।’ তাই নিয়ে গেল।
আমাদের বেড়ালটি ফারগাছের তলে বসে বসে কাঁদে। ছুটে আসে শেয়ালি দিদি শুধোয়: ‘তুমি কে গা?’
বেড়াল তার লোম ফুলিয়ে বললে: ‘হুঁ-হুঁ-হুঁ, আমি রায়বাহাদুর মার্জারচাঁদ!’
এমন গণ্যমান্য এক মহাশয়ের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় ভারি আনন্দ হল শেয়ালির। বললে: ‘আমায় বিয়ে করো। ভালো বৌ হব আমি। খাওয়াব তোমায়।’
‘বেশ,’ বেড়াল বললে, ‘তা বিয়ে করা যাক।’
কথাবার্তা হয়ে গেল, শেয়ালির বাড়িতে থাকতে লাগল তারা ৷
সবরকমে শেয়ালি তোয়াজ করত তার: কখনো
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর ঝুড়ি। তাদের ছিল একটা ছাগল আর একটা ভেড়া। ছাগল আর ভেড়ার মধ্যে ভারি ভাব: যেখানে ছাগল, ভেড়াও সেখানে; শবজি ভুঁইয়ে ছাগল ঢুকল বাঁধাকপি খেতে, ভেড়াও; ছাগল গেল বাগানে, ভেড়াও তার পেছু পেছু।
বুড়ো বললে, ‘আহ্,, পারি না গিন্নি—ছাগল, ভেড়াকে খেদাতে হয়, নইলে আমাদের শবজি ভুঁইও থাকবে না, বাগানও থাকবে না! ... এ্যাই, ভাগ তো, তোদের টিকিও যেন আর না দেখি!’
তা ছাগল আর ভেড়া একটা বস্তা বানিয়ে নিয়ে চলে গেল।F
যেতে, যেতে, যেতে দেখে মাঠের মধ্যে পড়ে আছে একটা নেকড়ের মাথা। ভেড়া তো তাগড়াই, কিন্তু সাহস তেমন নেই, আর ছাগল বেশ সাহসী। কিন্তু নেই তেমন একটা
-
মুরগি চুরি করে শেয়ালি ছুটল। ছুটতে ছুটতে ছুটতে নেমে এল ঘোর-ঘুরঘুটি রাত। দেখে এক চাষিবাড়ি, গেল সেখানে; নিচু হয়ে কুর্নিশ করলে, বললে: ‘কুশল গো ভালোমানুষেরা!
‘কুশল শেয়ালি দিদি।’
‘ভেতরে আসতে দাও, রাত কাটাই এখানে।’
‘হায় রে শেয়ালি দিদি, আমাদের এখানে ঠাসাঠাসি, তোমায় শুতে দেবার জায়গা হবে না।’
‘ও কিছু না, আমি ওই বেঞ্চির তলে গুটিশুটি ঢুকব, লেজটা টেনে নেব, রাতটুকু কেটে যাবে।’
বাড়ির লোকেরা বললে: ‘তাহলে বেশ, রাত কাটাও!’
‘কিন্তু মুরগিটা কোথায় রাখি?’
‘রেখে দাও চুল্লির তলে।’
তাই রাখল সে। আর রাতে উঠল চুপিচুপি, মুরগিটা খেয়ে পালক-টালক ঢিপ করে রাখল কোণে। পরের দিন ভোর-ভোর উঠল, মুখ ধুল ধবধবে করে, বাড়ির
-
বহুকাল আগে নিঝুম বনের মধ্যে দেখা দিল এক সিংহ, এমন সে জাঁদরেল আর ভয়ংকর যে একবার গর্জন করলেই সমস্ত জন্তু-জানোয়ার ভয়ে কাঁপত বেতস পাতার মতো। আর যখন শিকারে বেরত, সামনে যে পড়ত, তাকেই কামড়ে কুটিকুটি করত। বনশুয়োরদের পালে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাইকে মেরে ফেলত, আর খাবার জন্যে রাখত কেবল একটাকে। ভারি ভয় পেয়ে গেল জন্তুরা, ভেবে পায় না কী করে। সবাই জুটল পরামর্শ করতে।
ভালুক তখন বললে: ‘শোনো, মশাইরা, এমন দিন যায় না যে সিংহ গোটা দশেক করে জন্তু না মারে, কখনো কখনো বিশটাও। আর খায় কেবল একটা-দুটো, বাকিগুলো খামকা মরছে, কেননা রোজ সে নতুন নতুন ধরছে, আগের দিনে মারা জন্তু
-
তীরের কাছে ভাসছিল মরাল। ঘাড় বাঁকিয়ে সে জল দেখছিল। কাছেই ছিল একটা বোয়াল মাছ। মাছটা জিগ্যেস করলে: ‘আচ্ছা বলো তো, নদী জমে গেলে তুমি কোথায় উড়ে যাও?’
‘তা জেনে তোমার কী লাভ?’
‘শীতকালে কোথাও পালিয়ে থাকতে চাই। নইলে জমা বরফের তলে তাজা বাতাস থাকে না, দম আটকে মরি।’
‘শীতকালে আমি উড়ে যাই গরম দেশে, বসন্ত পর্যন্ত সেখানে থাকি।’
বোয়াল বললে, ‘আমাকেও সেখানে নিয়ে চলো।’
‘তা বেশ! যদি চাও, একসঙ্গেই উড়ে যাব। সঙ্গী থাকলে ভালোই কাটবে।’
কথাবার্তাটা কানে গেল চিংড়ির। বললে: ‘আমাকেও সঙ্গে নাও।’
‘তা বেশ! তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে, আনন্দে কাটবে। শরৎ পর্যন্ত এখানে থাকব, বলব কখন উড়ে যেতে হবে।’
-
বনের পশুরা একদিন জুটে পরামর্শ করতে লাগল কাকে রাজা করা যায়, সবাই যাকে কেবল ভয়ই করবে না, ন্যায্য বিচারক বলে মান্যও করবে। কিন্তু রাজা ঠিক করা গেল না—জমায়েতে সবাই আসে নি: সবচেয়ে বড়োসড়ো বলবান জন্তুরাই হাজির ছিল না। তখন ঠিক হল আবার সবাইকে ডাকা হবে―ছোটো থেকে বড়ো পর্যন্ত সবাইকে, যাতে ব্যাপারটা চুকে যায়।
সব জন্তুই এল সেদিন। ছিল: হাতি, সিংহ, বাঘ, জলহস্তী, গণ্ডার, ভালুক, নেকড়ে, হরিণ, উট, শেয়াল, খরগোশ, বনশুয়োর, জেব্রা, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া, গরু, কুকুর, বেড়াল, মেরু-বেড়াল, ধেড়ে ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর, যতরকম জন্তু ছিল দুনিয়ায়; বলতে-কি গাধাও বাদ যায় নি।
সবাই যখন জুটল, প্রথম কথা বলতে শুরু করল হরিণ:
-
এক-যে ছিল বুড়ো আর বুড়ি। বুড়ো হল কিন্তু ছেলেপুলে নেই ৷ কষ্ট হয়, দুঃখ, করে, ‘বুড়ো বয়সে কে আমাদের দেখবে? মরণকালে কে আমাদের পাশে থাকবে?” বুড়োকে বুড়ি বলে: ‘বনে যাও গো, আমার জন্যে একটা কাঠের পায়া আর একটা দোলনা বানিয়ে দাও; পায়াটাকে দোলনায় রেখে দোলাব। অন্তত খানিক মন-ভুলানি তো হবে।’
বুড়ো প্রথমটা গা করে নি, বুড়ি কিন্তু কেবলি মিনতি করে; শেষ পর্যন্ত বুড়ো শুনল তার কথা, বনে গেল। কাঠের একটা পায়া চেঁছে তুলল, দোলনা বানাল। বুড়ি পায়াটাকে দোলনায় রেখে দোলায় আর গুনগুন করে:
তেলেসিক, যাদু আমার,
রেঁধেছি তোর জইয়ের মাড়,
রেঁধেছি তুলতুলে খাবার,
তেলেসিক, যাদু আমার!
দোলাতে, দোলাতে, শেষে ঘুমিয়ে
-
অনেকদিন আগে, কেউ জানে না কবে, ভরত পাখি ছিল রাজা, আর মূষিকা ছিল রানী। নিজেদের মাঠ ছিল তাদের। গম বুনল তাতে। গম ফলার পর দানা ভাগাভাগি করতে লাগল। কেবল একটা দানা রয়ে গেল বাড়তি। মূষিকা বললে: ‘ওটা আমিই নিই।’
কিন্তু ভরত বলে: ‘না, ওটা আমার।’
‘বেশ, আধাআধি চেরা যাক।’
ভরত পাখি রাজি হল। ভাঙার জন্যে দানায় কামড় দিয়েই-না মূষিকা সেটা মুখে করে পালাল গর্তে। ভরত পাখি তখন জিগির দিলে, মূষিকা রানীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়ো করল বনের সব পাখি, রানী জড়ো করল সব পশুদের, যুদ্ধ বাধল।
লড়াই চলল সারা দিন, সন্ধেয় জিরিয়ে নেবার জন্যে থামল সবাই। মূষিকা রানী তাকিয়ে দেখে, ডাঁশেরা
-
এক-যে ছিল রাখাল ছেলে, একেবারে ছোটোটি থেকে কেবল ভেড়াই চরায়, আর কিছুই করত না, কিছুই জানত না। একদিন আকাশ থেকে পড়ল পাথর, আর পাথর বলতে পাথর—আট মন ভারি। পাথরটা নিয়ে মজা করতে ভালো লাগত রাখাল ছেলের: কখনো সেটা বাঁধত তার পাঁচনবাড়ির সঙ্গে, কখনো আকাশে ছড়ে দিয়ে নিজে ঘুমিয়ে নিত, ঘুম ভেঙে দেখত পাথর তখনো আকাশে, মাটিতে পড়ে নি, আর যেই পড়ত, দেবে যেত মাটিতে।
মা বকাবকি করত: ‘অমন নুড়িপাথর নিয়ে খেলতে হয়? গায়ে আঁচড় লাগবে।’
ও সেসব খেয়ালই করে না।
এখন রাখাল ছেলে যেখানে থাকত, সে রাজ্যের রাজার পেছনে লাগল এক নাগ, এগল রাজধানীর দিকে; মন তিরিশেক ওজনের এক-একটা পাথর
-
অনেক কাল আগে কিয়েভে ছিল এক প্রিন্স। আর কিয়েভের কাছেই থাকত নাগ। প্রতি বছর নাগকে ভেট দিতে হত: হয় কোনো নওল কুমার, নয় কুমারী। তারপরে তো একদিন প্রিন্সের মেয়েকে পাঠাবার পালা এল। করবার কিছু, নেই: প্রজারা পাঠিয়েছে, প্রিন্সকেও পাঠাতে হয়। নিজের মেয়েকে তাই নাগের কাছে ভেট পাঠাল প্রিন্স।
আর মেয়েটি এত সুন্দরী, এত মিষ্টি যে কাহিনীতে বলবার নয়, কলম, দিয়ে লিখবার নয়।
নাগ তার প্রেমে পড়ে গেল। একদিন মেয়েটি তাকে সোহাগ দেখিয়ে শুধাল: ‘আচ্ছা, দুনিয়ায় এমন লোক আছে যে তোমায় হারাতে পারে?’
নাগ বললে, ‘আছে, তেমন একজন আছে কিয়েভে, নিপার নদীর পাড়ে। বাড়িতে যখন আঁচ দেয়, ধোঁয়ায় আকাশ যায় ছেয়ে,
-
সে অনেকদিন আগেকার কথা, আমাদের বাপ-ঠাকুর্দার তখন হয়ত জন্মই হয় নি, সেই সেকালে বৌয়ের সঙ্গে নিজেদের মতো থাকত এক গরিব মানুষ ৷
তাদের ছিল একটি ছেলে, এমন সে টিংটিঙে মরকুটে যে বলবার নয়। কিছু একটা যে করবে, তা করে না, সারা দিন কাটায় চুল্লির ওপরকার মাচায়। মা যদি মাচায় খেতে দেয় খায়, না দেয় তো না খেয়েই পড়ে থাকে, আঙুলে কুটোটি নাড়ে না।
মা-বাপে বলে: ‘তোকে নিয়ে কী করি বাছা, তোকে নিয়েই আমাদের জ্বালা। সব ছেলেমেয়েই তো তাদের মা-বাপের কত কাজ করে দেয়, আর তুই কেবল রুটির ভুট্টিনাশ করিস!’
দঃখু করে, দুঃখু করে, শেষে বুড়ি একদিন বললে: ‘কী তুমি ভাবছ
-
ছিল একজন লোক। তার ছয় ছেলে, একটি মেয়ে।
গেল তারা জমি চষতে, বোনকে বললে যেন খাবার নিয়ে যায়। বোন বললে: ‘কিন্তু কোথায় তোমরা চষবে? আমি তো জানি না।’
ওরা বললে: ‘যেখানে চষব, বাড়ি থেকে সে জায়গাটা পর্যন্ত ফালের দাগ দিয়ে যাব। তুই সেই দাগ ধরে চলে যাবি।’
এই বলে চলে গেল তারা।
এখন সেই মাঠের কাছে বনে এক নাগ থাকত ৷
দাগটা সে বুজিয়ে দিতে শুরু করল। আর নিজে তার বদলে আরেকটা দাগ টেনে নিয়ে গেল তার নিজের পুরী পর্যন্ত।
মেয়েটি এদিকে ভাইদের জন্যে খাবার নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল সেই দাগ ধরে।
যেতে যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছল একেবারে নাগের আঙিনায়।
ক্যাটাগরি
উৎস
- তাজিক লোককাহিনী
- পরিচয়
- প্রক্রিয়াধীন
- ইউক্রেনের লোককথা
- সোনার পেয়ালা
- স্নেগোভেৎসের হোটেলে
- মনে রেখো আমাদের, হে বাংলাদেশ
- সেকেলে ফ্যাসিবাদ
- তানিয়া
- আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপ
- বৃষ্টি আর নক্ষত্র
- রাঙা পাল
- উক্রাইনীয় উপকথা
- সোমেন চন্দ গল্পসঞ্চয়ন
- কাজাখ লোককাহিনী
- আজেরবাইজানের গল্প-সংগ্রহ
- বাংলাপুরাণ প্রতিস্বর
- সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দেশে দেশে
- রূপের ডালি খেলা
আর্কাইভ
লেখক
- আন্তন চেখভ (১৩)
- আন্দ্রেই দুগিনেৎস (১)
- আলেকজান্ডার ওয়ার্থ (১)
- আলেক্সান্দর গ্রিন (৩)
- আলেক্সান্দর বাত্রভ (১)
- আলেক্সান্দ্র কোনোনভ (১)
- ইউরি ইয়াকভলেভ (১২)
- ইভান ইয়েফ্রেমভ (১)
- ইভান তুর্গেনেভ (১)
- ইলিয়া এরেনবুর্গ (১)
- ইয়াকভ আকিম (১)
- এম এম আকাশ (১)
- কনস্তানতিন পাউস্তোভস্কি (৮)
- কায়ুম তাংগ্রিকুলিয়েভ (৪)
- খালিদা হাসিলভা (১)
- গোপাল হালদার (১)
- চিঙ্গিস্ আইৎমাতভ্ (১)
- ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- নাদেঝদা ক্রুপস্কায়া (১)
- নিকোলাই নোসভ (১)
- নিতাই দাস (১)
- পাভেল লিডভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (৭৫)
- প্রযোজ্য নয় (৩)
- ভিক্টর গোলিয়ভকিন (১)
- ভিক্তর দ্রাগুনস্কি (১)
- ভ্লাদিমির জেলেজনিকভ (১)
- ভ্লাদিমির বইকো (১)
- ভ্লাদিস্লাভ ক্রাপিভিন (১)
- মওলানা হোসেন আলী (১)
- মহমেৎ ইয়াখিয়ায়েভ (১)
- মাৎভেই তেভেলেভ (৯)
- মুজফ্ফর আহমদ (১)
- ম্যাক্সিম গোর্কি (১)
- রণেশ দাশগুপ্ত (২)
- রিয়ার অ্যাডমিরাল সের্গেই পাভিচ জুয়েনকো (১)
- লেভ তলস্তয় (২)
- শাহীন রহমান (১)
- সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার (১)
- সাদ্রিদ্দিন আয়নি (১)
- সেমিওন শুরতাকভ (১)
- সের্গেই বারুজদিন (১)
- সোমেন চন্দ (৫)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.