-
অগস্ত্য মুনি সাগরের জল খাইয়া ফেলিয়াছিলেন, এ কথা তোমরা শুনিয়াছ। সেই সাগর অনেকদিন শুকনোই পড়িয়াছিল;তারপর যে কেমন করিয়া তাহাতে জল আসিল, সে অতি আশ্চর্য ব্যাপার।
অযোধ্যায় এক রাজা ছিলেন; তাহার নাম ছিল সগর। রাজার বড় রানীর একটি ছেলে ছিল, তাহার নাম অসমঞ্জ। তাঁহার ছোট রানীর ষাট হাজার ছেলে ছিল, তাহাদের নাম জানি না।
অসমঞ্জ এমনি দুষ্ট ছিল যে ছোট ছোট ছেলেদিগকে ধরিয়া সে জলে ফেলিয়া দিত আর তাহারা খাবি খাইয়া মরিবার সময় হাসিত। কাজেই রাজা বিরক্ত হইয়া তাহাকে তাড়াইয়া দিলেন। যা হোক, অসমঞ্জের পুত্র অংশুমান বড় ভালো ছেলে ছিল; রাজা যত্নের সহিত তাহাকে মানুষ করিলেন।
ইহার অনেক বৎসর পরে একবার
-
ইক্ষবাকু বংশে সগর নামে একজন অতি প্রসিদ্ধ রাজা ছিলেন। বীরত্বে তাঁহার সমান আর সেকালে কোন রাজাই ছিলেন না। রূপে, গুণে, বিদ্যায়, সব বিষয়েই তিনি সুখী ছিলেন, কেবল এক বিষয়ে তাঁহার বড়ই দুঃখ ছিল, তাঁহার পুত্র ছিল না। পুত্র-লাভের জন্য তিনি তাঁহার বৈদর্ভী এবং শৈব্যা নাম্নী দুই রানীকে লইয়া কৈলাস পর্বতে গিয়া কঠিন তপস্যা আরম্ভ করিলেন। কিছুদিন পরে শিব রাজার তপস্যায় ভুষ্ট হইয়া তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন, ‘মহারাজ, তুমি কী চাও?’
রাজা ভক্তিভরে শিবকে প্রণাম করিয়া জোড়হাতে বলিলেন, ‘ভগবান, আমার পুত্র নাই। আমার মৃত্যুর পর আমার বিশাল সাম্রাজ্য ভোগ করিবার লোক থাকিবে না, আমার বংশ লোপ হইয়া যাইবে। সুতরাং যদি আমার
-
জরৎকারু মুনি সর্বদাই কঠিন তপস্যায় ব্যস্ত থাকিতেন। বিবাহ বা সংসারের অন্য কোনো কাজ করার ইচ্ছা তাঁহার একেবারেই ছিল না। তপস্যা করিয়া আর তীর্থে স্নান করিয়া তিনি পৃথিবীময় ঘুরিয়া বেড়াইতেন। ঘর, বাড়ি কিছুই তাঁহার ছিল না, যেখানে রাত্রি হইত, সেখানেই নিদ্রা যাইতেন। এমন লোককে ধরিয়া আনিয়া বিবাহ করাইয়া দেওয়া কি সহজ কাজ। এ কাজ হওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না, যদি ইহার মধ্যে একটি আশ্চর্য ঘটনা না হইত। ঘটনাটি এই—জরৎকারু নানাস্থানে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন দেখিলেন যে, একটা ভয়কর অন্ধকার গর্তের মুখে কয়েকটি নিতান্ত দীন-হীন, রোগা হাড্ডিসার মানুষ একগাছি খস্খসের শিকড় ধরিয়া ঝুলিতেছে। উহাদের পা উপর দিকে, মাথা নীচের দিকে। একটা ইঁদুর ক্রমাগত
-
জন্তুকে না দেখিয়া কেবলমাত্র তাহার শব্দ শুনিয়াই যে তাহাকে তীর দিয়া বিঁধিতে পারে, তাহাকে বলে ‘শব্দবেধী’।
রাজা দশরথ একরূপ ‘শব্দবেধী’ ছিলেন। যুবা বয়সে অনেক সময় তিনি রাত্রিতে বনে গিয়া এইরূপে কত হাতি, মহিষ, হরিণ শিকার করিতেন। বর্ষার রাত্রে তীরধনুক লইয়া চুপিচুপি সরযূর ধারে বসিয়া থাকিতে তাঁহার বড়ই ভাল লাগিত। নদীর ঘাটে নানারূপ জন্তু জল খাইতে আসিত; সেই জলপানের শব্দ একটিবার দশরথের কানে গেলে আর সে জন্তুকে ঘরে ফিরিতে হইত না।
একবার এইরূপ বর্ষার রাত্রিতে দশরথ সরযূর ধারে তীর ধনুক লইয়া বসিয়া আছেন, মনে আর কোন চিন্তা নাই, জানোয়ারের শব্দ শোনা যাইবে। ভোর হইতে আর বেশি বাকি নাই। খালি কান পাতিয়া
-
দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের ভয়ানক শত্রুতা ছিল। দিনরাতই কেবল ইহাদের মারামারি চলিত, তাহাতে অনেক সময় অসুররাও হারিত, অনেক সময় দেবতারাও হারিতেন। দেবতারা অসুরদের জালায় অস্থির থাকিতেন; আবার অসুরেরা তপস্যা করিলে তাহাদিগকে বর না দিয়াও পারিতেন না। বর দিয়া তারপর তাহার ধাক্কা সামলাইতে তাহাদের প্রাণান্ত হইত।
একটা অসুর ছিল, তাহার নাম ময়। জাদু, মায়া, ভেলকিবাজি যত আছে ময় তাহার সকলই জানিত, আর তাহার জোরে সময় সময় দেবতাদিগকে সে ভারি নাকাল করিত।
একবার যুদ্ধে হারিয়া ময় তপস্যা করিতে লাগিল। বিদ্যুন্মালী আর তারক নামে আর দুই অসুরও তাহার দেখাদেখি তপস্যা আরম্ভ করিল। তাহার উপবাস করিয়া, শীতে ভূগিয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া এমনি তপস্যা করিল যে, ব্রহ্মা
-
গণেশ কেমন যুদ্ধ করিয়াছিলেন তাহা বলিয়াছি, গণেশের বিবাহ কেমন করিয়া হইয়াছিল আজ তাহা বলিব।
যুদ্ধের পর হইতে শিব গণেশকে যারপরনাই স্নেহ করতেন, আর পার্বতীর তো কথাই নাই। কার্তিক যেমন শিব আর পার্বতীর পুত্র, গণেশ তাঁদের তেমনি পুত্র হইলেন, আর তাঁদের নিকট তেমনি স্নেহ পাইতে লাগিলেন।
কার্তিক আর গণেশ যখন বড় হইলেন, তখন একটা কথা লইয়া দু-জনের মধ্যে বড়ই তর্ক উপস্থিত হইল; কার্তিক বলেন, ‘আমি আগে বিবাহ করিব,’ গণেশ বলেন, ‘না, আমি আগে বিবাহ করিব।’
তাঁহাদের এইরূপ তর্ক শুনিয়া শিব আর পার্বতী বড়ই ভাবনায় পড়িলেন। দুই পুত্রকেই তাঁহারা সমান স্নেহ করেন; ইহাদের কাহাকে চটাইয়া কাহার বিবাহ আগে দেন? শেষে অনেক ভাবিয়া
-
দধীচি মুনির নাম হয়ত তোমরা অনেকেই শুনিয়াছ। তাঁহার মতন তপস্যা অতি অল্প লোকেই করিয়াছে। মহর্ষি দধীচি অতিশয় শান্ত আর পরম দয়ালু ছিলেন। গঙ্গার ধারে নিজের আশ্রমে থাকিয়া পত্নী প্রাতিথেয়ীকে লইয়া ভগবানের নাম করা, গাছপালার প্রতি যত্ন, সকল জীবে দয়া আর অতিথি আসিলে তাহার সেবা করা, এ সকল ছাড়া তাঁহার আর কাজ ছিল না। কিন্তু এই নিরীহ লোকটির তপস্যার এমনি তেজ ছিল যে, তাহার ভয়ে অসুরেরা তাহার আশ্রমের কাছে আসিতেই থর থর করিয়া কাঁপিত। অথচ দেবতাদিগকে সেই অসুরেরা জ্বালাতনের একশেষ করিত। কতকাল ধরিয়া যে ইহাদের যুদ্ধ চলিয়াছিল তাহার ঠিকানাই নাই। সেই যুদ্ধে কখনও দেবতারা জিতিতেন, কখনও বা অসুরদিগের নিকট হারিয়া বিধিমত
-
এক রাজা ছিলেন, তাঁহার নাম ছিল রৈবত ককুম্মী। পশ্চিম সমুদ্রের ধারে কুশস্থলী নামক নগরে তিনি বাস করিতেন। রৈবতের একটি কন্যা ছিল, তাহার নাম রেবতী। রেবতীর গুণের কথা আর বলিয়া শেষ করা যায় না। মেয়েটি দেখিতে যেমন অপরূপ সুন্দরী তেমনি সুশীলা ও মিষ্টভাষিণী আর বুদ্ধিমতীও যতদূর হইতে হয়।
রেবতী যতই বাড়িয়া উঠিলেন, রাজার মনেও ততই ভাবনা হইল যে, ‘আহা! আমার এই স্নেহের মেয়েটিকে এখন কাহার হাতে সমর্পণ করি?’
সংসারের যত ভাল ভাল রাজপুত্র একে একে সকলের সংবাদই রাজা লইলেন, কিন্তু; কাহাকেও তাঁহার পছন্দ হইল না। মন্ত্রী, পুরোহিত, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সকলকেই বলিলেন, কেহই তেমন ভাল একটি পাত্রের সন্ধান দিতে পারিল না।
শেষে
-
সে যে কত কালের কথা, তাহা আমি জানি না। সেই অতি প্রাচীনকালে আমাদের দেশে উত্তানপাদ নামে এক রাজা ছিলেন। উত্তানপাদের দুই রানী ছিলেন, একটির নাম সুনীতি, আর একটির নাম সুরুচি।
সুনীতি বড় লক্ষ্মী মেয়ে ছিলেন, কিন্তু সুরুচি ছিলেন ঠিক তাহার উল্টো। আর সুনীতিকে তিনি প্রাণ ভরিয়া হিংসা করিতেন। রাজা সেই সুরুচিকে এতই ভালবাসিতেন, যে উহার কথা না রাখিয়া থাকিতে পারিতেন না। সুরুচি তাঁহার নিকট সুনীতির নামে কত মিথ্যা কথাই বলিতেন, তিনি ভাবিতেন, তাহার সকলই বুঝি সত্য। শেষে রাজা একদিন সুরুচির কথায় সুনীতিকে রাজপুরী হইতে বাহির করিয়া দিলেন।
দুঃখিনী সুনীতি তখন আর কী করেন? মুনিদের তপোবনে গিয়া আশ্রয় লওয়া ভিন্ন তাঁহার
-
পুরাণে আছে যে বিষ্ণু সময়-সময় নানারূপে জন্তু ও মানুষের রূপ ধরিয়া অনেক আশ্চর্য কাজ করিয়াছিলেন। বিষ্ণুর এই সকল রূপ ধারণকে তাঁহার এক একটি ‘অবতার’ বলা হয়।
এই যে সৃষ্টি, তাহার জীবন নাকি এক কল্প কাল। এক এক কল্প পরে ‘প্রলয়’ অর্থাৎ সৃষ্টি নাশ হইয়া আবার নাকি নূতন সৃষ্টি হয়। এখনকার এই জগতের সৃষ্টি হইবার পূর্বে আর এক জগতের প্রলয় হইয়াছিল। বিষ্ণু তাহার পূর্বে বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে প্রলয়ের কাল উপস্থিত হইয়াছে। তখন তিনি একটি খুব ছোট মাছের রূপ ধরিয়া কৃতমালা নামক নদীতে উপস্থিত হইলেন। সেই সময়ে সূর্যের পুত্র বৈবস্বত মনু সেই নদীর নিকট থাকিয়া তপস্যা করিতেছিলেন। একদিন মনু কৃতমালার জলে নামিয়া
-
দুর্গার এক নাম ‘পার্বতী’, অর্থাৎ, পর্বতের মেয়ে। তাঁর পিতা হিমালয়, মা মেনকা। শিবের সঙ্গে যাতে তাঁর বিয়ে হয় এজন্য পার্বতী অনেক দিন ধরে কঠিন তপস্যা করেছিলেন, তার ফলে শেষে শিবের সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হল।
পার্বতীর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব তাঁকে বিবাহ করতে চাইলেন। কিন্তু বর যে, সে তো আর নিজে কনের বাপের কাছে গিয়ে বিয়ে ঠিক করতে পারে না, তাহলে লোকে হাসে। কাজেই শিব সপ্তর্ষিদের ডেকে পাঠালেন। সপ্তর্ষিরাও তখনই সোনার বল্কল পরে, মুক্তামালা গলায় দিয়ে, মণি-মানিকের গহনা ঝলমলিয়ে তাঁর কাছে এসে জোড় হাতে বললেন, ‘আমাদের কী সৌভাগ্য! প্রভু আজ আমাদের স্মরণ করেছেন। আজ্ঞা করুন, আমাদের এখন কী করতে হবে।’
শিব
-
সকলের আগে যাঁহাকে লোকে রাজা বলিয়াছিল, তাঁহার নাম ছিল পৃথু। তিনি সূর্যবংশের লোক ছিলেন, তাঁহার পিতার নাম ছিল বেণু।
‘রাজা’ কি, না, যে রঞ্জন করে অর্থাৎ খুশি রাখে। পৃথু নানারকমে প্রজাদিগকে খুশি করিয়াছিলেন, তাই সকলে মিলিয়া তাঁহাকে ‘রাজা’ নাম দিয়াছিল। পৃথুর পূর্বে লোকের দিন বড়ই কষ্টে যাইত। সেকালে গ্রাম নগর পথ-ঘাট কিছুই ছিল না। ঝোপে জঙ্গলে, পর্বতের গুহায় সকলে বাস করিত। পৃথু তাহাদিগকে বাড়ি বাঁধিয়া এক জায়গায় থাকিতে শিখান, আর পথ বানাইয়া চলা-ফেরার সুবিধা করিয়া দেন। সেই হইতে শহর বস্তির সৃষ্টি হইল। সেকালের লোক চাষবাস করিতে জানিত না। ফলমূল খাইয়া অতি কষ্টে দিন কাটাইত।
জমিতে কাঁকর, আকাশে মেঘ নাই, শুকনা
ক্যাটাগরি
উৎস
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.