মহিষাসুর
একটা ভারি ভয়ঙ্কর অসুর ছিল। সে মহিষ সাজিয়া বেড়াইত, তাই সকলে তাহাকে বলিত মহিষাসুর।
দেবতারা কিছুতেই মহিষাসুরের সহিত আঁটিয়া উঠিতে পারিতেন না। একশত বৎসর ধরিয়া তাঁহারা তাহার সহিত যুদ্ধ করিলেন। তাহাতে সে তাঁহাদিগকে হারাইয়া স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়া নিজে আসিয়া ইন্দ্র হইল।
দেবতারা তখন আর কী করেন? তাঁহারা ব্রহ্মাকে সঙ্গে করিয়া মহাদেব আর বিষ্ণুর নিকটে গিয়া উপস্থিত হইলেন, বলিলেন, ‘হে প্রভু, মহিষাসুর তো আমাদের বড়ই দুর্দশা করিয়াছে, আমাদিগকে যুদ্ধে হারাইয়া স্বর্গ হইতে তাড়াইয়া দিয়াছে; এখন আপনারা যদি আমাদের রক্ষা না করেন, তবে আমাদের উপায় কী হইবে?’
অসুরদের অত্যাচারের কথা শুনিয়া শিব ও বিষ্ণুর বড়ই রাগ হইল। সেই রাগে তাঁহাদের আর সকল দেবতাদের শরীর হইতে এমন একটা তেজ বাহির হইল যে, সে বড়ই আশ্চর্য! মনে হইল যেন আগুনের পর্বত আকাশ পাতাল ছাইয়া সকলের সামনে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। দেখিতে দেখিতে সেই তেজ জমাট বাঁধিয়া একটি দেবীর মত হইল।
তাঁহাকে দেখিয়া দেবতাদের আনন্দের আর সীমা রহিল না। তাঁহারা সকলে মিলিয়া কেহ অস্ত্র, কেহ বস্ত্র, কেহ বর্ম, কেহ অলঙ্কার আনিয়া তাঁহাকে দিতে লাগিলেন। হিমালয় বিশাল এটা সিংহ আনিয়া তাঁহার বাহন করিয়া দিলেন।
দেবীর হাজারখানি হাত দশদিক ছাইয়া গিয়াছে, তাঁহার মুকুট আকাশ ভেদ করিয়া উঠিয়াছে, তাঁহার ভারে পৃথিবী বসিয়া পড়িয়াছে, ধনুর শব্দে আকাশ পাতাল কাঁপিতেছে। তিনি যখন হাজার হাতে হাজার অস্ত্র লইয়া গর্জন করিলেন, তখন বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড কাঁপিয়া উঠিল; অসুরেরা সেই গর্জন শুনিয়া ছুটিয়া আসিল।
তারপর কি যেমন তেমন যুদ্ধ হইল? মহিষাসুর নিজে যেমন ভয়ঙ্কর, তাহার এক-একটি সেনাপতিও তেমনি। তাহাদের একটার নাম চিকুর, একটার নাম চামর, আরগুলির নাম উদ্বগ্ন, মহাধনু, অসিলোমা, বাস্কল, পারিবারিত আর বিড়ালাক্ষ। এই সকল সেনাপতি আর কোটি কোটি অসুর লইয়া মহিষাসুর দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ করিতে আসিল। সকলে মিলিয়া অস্ত্র যে কত ছুঁড়িল তাহার সীমা সংখ্যা নাই। কিন্তু সে অস্ত্রে দেবীর কিছুই হইল না। তাঁহার এক এক নিশ্বাসে হাজার হাজার ভূত উপস্থিত হইয়া অসুরের দলকে ঠেঙাইয়া ঠিক করিতে লাগিল। দেবীর সিংহও আঁচড়-কামড় দিয়া তাহাদিগকে কম নাকাল করিল না। আর দেবীর নিজের তো কথাই নাই। তাঁহার হাজার হাতে হাজার অস্ত্র; সে অস্ত্রে তিনি অসুরদিগকে কাটিয়া, ফাঁড়িয়া, পিষিয়া, পুঁতিয়া শেষ করিতে লাগিলেন। সেনাপতিগুলির কোনটা দেবীর অস্ত্রের ঘায়, কোনটা তাঁহার কিলে আর চাপড়ে, কোনটা বা সিংহের কামড়ে মারা গেল। তখন আর মহিষাসুর চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। সে শিং নাড়িয়া, লেজ ঘুরাইয়া গর্জন করিতে করিতে দেবীর ভূতগুলিকে এমন তাড়া করিল যে, তাহারা পালাইতে পারিলেই বাঁচিত, কিন্তু বাঁচিতে পারিতে তো পালাইবে! দেখিতে দেখিতে সে ভূতের দলকে শেষ করিয়া দেবীর সিংহের পানে ছুটিয়াছে—তাহার লেজের তাড়ায় সাগর লন্ডভণ্ড, শিংএর নাড়ায় মেঘ সব খন্ড-খন্ড হইতেছে, নিঃশ্বাসের চোটে পাহাড় পর্বত উড়িয়া যাইতেছে। এমন সময় দেবীর সাপ অস্ত্র আসিয়া তাহাকে এমনই বাঁধনে বাঁধিল যে আর তাহার নড়িবার শক্তি নাই। কিন্তু, অসুরের মায়া, সে কি সহজ কথা? চোখের পলকে মহিষটা সিংহ হইয়া বাঁধন ছড়াইয়া লইল। দেবী তখনই সেই সিংহকে কাটিলেন। অমনি দেখা গেল যে, আর সিংহ নাই, তাহার জায়গায় খড়্গ হাতে একটা মানুষ ক্ষেপিয়া আসিতেছে। মানুষ কাটা যাইতে না যাইতে কোথা হইতে এক হাতি আসিয়া দেবীর সিংহকে শুঁড় দিয়া জড়াইয়া ধরিতেছে। দেবী খড়্গ দিয়া যেই তাহার শুঁড় কাটিলেন, অমনি হাতি আবার মহিষ হইয়া গেল, সেটা আবার শিং দিয়া দেবীকে পর্বত ছুঁড়িয়া মারিতে লাগিল। দেবী এক লাফে সেই মহিষের ঘাড়ে চড়িয়া তাহাকে এমনি ঘা মারিলেন যে তখন অসুর মহাশয়কে সেই মহিষের ভিতর হইতে বাহির হইতেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments