বই
অগ্রন্থিত গল্পাবলি
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জীবৎকালে তাঁর তৃতীয় কোনো গল্পগ্রন্থ বেরয়নি। সাংবাদিক গবেষক সৈয়দ আবদুল মকসুদ ও অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন অন্তত ৩২টি অগ্রন্থিত গল্প খুঁজে পেয়েছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র। লক্ষ করা যাচ্ছে, এদের সবই প্রায় চল্লিশের দশকে ‘সওগাত’ ও ‘মোহাম্মদী’-তে প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ ‘নয়নচারা’র যুগের রচনা এগুলো। স্বাভাবিক নিয়মে এসব গল্প নিয়ে এক বা একাধিক সংকলন প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ হয়নি।
-
সামনের মাঠটা উঁচু হয়ে উঠে গিয়ে কিছু দূর হতে আবার নেবে গেছে। নেবে গেছে অনেকখানি। এতখানি নেবে গেছে যে, দূরের সুপুরিগাছ দুটোর শুধু আগা দেখা যায় এখান থেকে।
আকাশটা আজ নীল-ঝকঝকে নীল। এবং সে আকাশের তলে সবুজ মাঠটি মানিয়েছে ভালো। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রাবেয়া সেদিকে চেয়ে আছে বটে কিন্তু তাঁর মন নেই সেখানে। নির্দিষ্টভাবে নেই কোথাও, কিন্তু সামনের মাঠটার নেবে-গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কেমন একটা নীরব উদাসীনতা, তাতে তার মনটা থেকে থেকে বেদনায় ছলছল করে উঠছে।
ওপাশে ইজিচেয়ারে আধ-শোয়া হয়ে আকবর খবর কাগজ পড়ছিল, হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল রাবেয়ার পানে। ক্ষণকাল পরে শুধাল: কী দেখছ অত?
—মাঠ—মাঠ দেখছি
-
হাতে এত অবসর যে মনে হয় আকাশটা কত বড় হয়ে উঠেছে : এত বিশাল এত গভীর এবং এত মৌন আকাশ সে যেন দেখে নি কখনো। দেহ শুধু ক্লান্তিতে জড়িয়ে ওঠে, আর সে ক্লান্তিতে কেমন নেশা।
এখন সকাল। বোশেখি রোদ এখনো তেতে ওঠে নি, পশ্চিমের ঘরটায় এখনো কোমল ছায়া। দক্ষিণের জানলার পাশে ডেক-চেয়ারে আমজাদ বসে রয়েছে নিশ্চুপ হয়ে, আর হয়তো চেয়ে দেখছে অদূরে মাইল-স্তম্ভের পাশে বুড়ো জামগাছটার পানে। মৃদু-মৃদু হাওয়া বইছেই, জামগাছের পাতা নড়ছেই। কিন্তু কখনো-কখনো হাওয়া জোর হলে জোরে কেঁপে ওঠে, আবার স্তব্ধ হয়ে গেলে গাছময় এ-অবসরের মতো নিশ্চলতা জমে ওঠে। বাসাটা শহরের প্রান্তে বলে এধারে কোলাহল নেই এবং কোলাহল
-
আফিয়ার আব্বা গম্ভীর প্রকৃতির লোক। চেহারাটা ভারি, বৃহৎ বাঁকা নাক। আর চোখদুটি অদ্ভুত রকম স্থির। কখনো-কখনো তাতে গাম্ভীর্য বা বিরক্তি ঘনিয়ে ওঠে বটে, কিন্তু হাসির উচ্ছলতা তাতে ধরা পড়ে না।
ছোটবেলায় আব্বার সঙ্গে আফিয়ার তবু ঘনিষ্ঠতা ছিল। আদর করে কথা কইতেন, মিষ্টি করে হাসতেন। তাছাড়া প্রয়োজন হলে শাসনও করতেন। বাড়িতে পয়সা চুরি যাওয়ার ব্যাপারটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে তার। সেবার মুন্নু, রেজিয়ারা এসেছিল। ওরা আত্মীয় বটে, কিন্তু বিদেশে তারা থাকত বলে আগে কখনো দেখেনি তাদের। মেহমান পেয়ে আফিয়ার আনন্দ হল, ভাব করল তাদের সঙ্গে। কিন্তু দুয়েক দিন পরে বুঝলে ওদের যেন কেমন ছ্যাঁচড়া অভ্যাস, এটা-সেটা চুরি করবার ঝোঁক। আব্বা বরাবর
-
বৃদ্ধ লোকটি যখন তার কথার মাঝামাঝি এসে পৌঁছেছে তখন যুবকটি মুখ তুলে তার পানে কয়েকবার তীক্ষ্ণভাবে তাকাল। ধারালো খাড়া নাক, মাথায় লাল ফেজ ; আর তার মোটা, রুক্ষ ঠোঁটটা কেমন আলগোছে ঝুলছে। তারপর সে বৃদ্ধের চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল, কতক্ষণ শুনল। কিন্তু আশ্চর্য, বৃদ্ধের কথা কখন শেষ হল সে টেরই পেল না, কারণ তার আগেই এক সময়ে হঠাৎ কী হল, সে যেন গড়িয়ে গেল, ধসে গেল, তারপর জানল যে সে রক্ত দেখেছে। অন্তত তেমনি তার মনে হল। সে রক্ত দেখল, যে-রক্ত কেমন একটু বিচিত্র ধরনের আর যা কেমন নিঃশব্দে গড়িয়ে গড়িয়ে এসে রক্তের সাগর তৈরি করছে।
সে অনেকক্ষণ এসব দেখল।
-
স্যাতস্যাতে দিনে মনটাও কেমন ভিজে ভিজে হয়ে ওঠে। কেবল বৃষ্টি আর বৃষ্টি, ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটছে সর্বক্ষণ, তবু মেঘের যেন অন্ত নেই। কাছারির ওধারে বড় পুকুরটা কানায় কানায় টলোমলো; আর ওধারের কাঁচা রাস্তাটায় কাদা ছাড়া কিছু নেই। কখনো একটা কিংবা দুটো জানলা-তোলা গাড়ি যাবে, অথবা একটা-দুটো লোক। কারো ছাতি আছে, কারো নেই। কিন্তু জুতো নেই কারো পায়ে। কাদা আর পানি রাস্তায়, জুতো সেখানে চলে না, খালি পায়েও অতি সাবধানে পা টিপে টিপে চলতে হয়-পিচ্ছিল কাদায় একবার পিছলে গেলে দেহের আর কিছু থাকবে না।
খড়খড়িটা তুলে করিমন পথ দেখছিল। ঘরে আবছা অন্ধকার, তোলা-খড়খড়ি দিয়ে যা বা ম্লান আলো আসছে, সে-আলো তার মুখে
-
ফনুর একটা মস্ত সুবিধা। সেটা হল তার নানিবাড়ি। নানিবাড়ি তো নয় যেন সত্যিকার কেল্লা। গোটাকয়েক আম-জাম-লিচুগাছ আর কেমন জাতছাড়া হলদে রঙের বাঁশঝাড়ের পাশে নানির যে-ক্ষুদ্র বাড়িটি, সেটাই হল তার বিপদ-আপদের রক্ষাদুর্গ; এবং এ-রক্ষাদুর্গ থাকতে তার দুনিয়ায় ভয় নাই কিছুকে—এমন কি বাপের ঠেঙানিকেও না। মাঝে-মাঝে অবশ্য উঁই ফুঁড়ে যেন মছিবত ছোবল তুলে দাঁড়ায়। তখন আথালি পাথালি ছুটেও দিশে পাওয়া যায় না, নানির বাড়ির কেল্লা রীতিমতো চোখে সর্ষে হয়ে ফোটে তখন। এমন মছিবতের সম্মুখীন হলে অন্য কেউ হয়তো ঠাণ্ডা হয়ে যেত, কিন্তু ফনুর পেটে অহরহ শয়তান গুঁতায়, যে-গুঁতুনি আবার নানির বাড়ির কেল্লার নিশ্চিন্ত আরামে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে ওঠে।
কেল্লায় গা-ঢাকা দিয়ে থাকাকালে একদিন
-
সোনাকান্দি হতে মাঝের হাট দূর নয়। কিন্তু বর্ষায় নৌকা ছাড়া গতি নেই। তখন এ-পথটা অতিক্রম করতে গোটা একদিন লেগে যায়। এ-নদী সে নদী; এ খাল সে-নালা। স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ পানির আর মাছের, কচুরিপানার আর ধানের; নৌকায় ভরাট গন্ধ ভেজা কাঠের, ডহরের পানির আর খাঘুরি তামাকের। আকাশের বর্ষাশেষের শ্রান্ত মেঘ নিস্তেজভাবে ঘোরে। হাওয়া নেই। পালশূন্য শ্লথগতি পানসি ঘাসী গয়না ও ডিঙির আর তেজের গরম নেই। এত পানি আর দিগন্তপ্রসারী খোলামেলা প্রসারতার মধ্যেও দমবন্ধ করা ভাব। হঠাৎ কখনো-সখনো একটু হাওয়া যদি আসে চুড়ির মতো মিহিন ঢেউ তুলে পানিতে, বড় ভালো লাগে। দেহ শীতল হয়।
নৌকা আর নদী আর প্রসারতা আর মেঘ কেউ দেখে
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.