বই
অগ্রন্থিত গল্পাবলি
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র জীবৎকালে তাঁর তৃতীয় কোনো গল্পগ্রন্থ বেরয়নি। সাংবাদিক গবেষক সৈয়দ আবদুল মকসুদ ও অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন অন্তত ৩২টি অগ্রন্থিত গল্প খুঁজে পেয়েছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র। লক্ষ করা যাচ্ছে, এদের সবই প্রায় চল্লিশের দশকে ‘সওগাত’ ও ‘মোহাম্মদী’-তে প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ ‘নয়নচারা’র যুগের রচনা এগুলো। স্বাভাবিক নিয়মে এসব গল্প নিয়ে এক বা একাধিক সংকলন প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা, অথচ হয়নি।
-
—তোমার মুখে ও কিসের আভা?
থামের আড়ালে ছায়া: সে-ছায়ায় ময়লা ও জীর্ণ সবুজ আলখাল্লা গায়ে যে-বৃদ্ধ ফকির নিমীলিত চোখে নিশ্চল হয়ে বসেছিল সে এবার চোখ মেলে চাইলে, প্রথমে দেখলে দুটি জ্বালাময় তীব্র দৃষ্টি। তার সামনে উবু হয়ে যে ছেলেটি বসে তাকিয়েছিল তার পানে, তার কোমল মুখ রিক্ততায় প্রখর, ক্ষীণ দীর্ঘ দেহ দীনতায় চঞ্চল, আর জ্বালাময় তীক্ষ্ণ চোখদুটি পদ্মশূন্য ও ছোট। তার পরনের কাপড় ময়লা, কিছুটা ছেঁড়া, আর তার মাথার রুক্ষ লালচে চুলগুলো এলোমেলো, সেগুলো ছড়িয়ে রয়েছে কানের পাশে, ঘর্মাক্ত কপালের ওপর।
—তুমি কে?
ছেলেটির কাছ হতে সে-প্রশ্নের কোনো উত্তর এল না। তার পানে কতক্ষণ চেয়ে থেকে ফকির আবার প্রশ্ন করলে:
-
কালো গভীর চোখের তন্দ্রার মতো ম্লান কোমলতা দ্বীপের সবুজ রঙে নিবিড় হয়ে উঠেছে। এখন অপরাহ্ণ: সাগরের বুকে হাওয়া থেমে গেছে, নারকেলগাছের পাতাগুলো ঝুলে পড়েছে। সৈকতে যে-নীলজল ক্ষীণ হয়ে ভেঙে পড়ছে তার আওয়াজ নম্র হাওয়ার মতো, আর তার হালকা রঙে দূর হতে দেখা বনানীর অস্পষ্টতা। প্রশান্ত মহাসাগরের অতলতা ওপরে উঠে এসেছে, তাই দূরবিস্তৃত জলরাশি যেন বরফের মতো জমাট বেঁধে গেছে, কোথাও কোনো কম্পন নেই, কোনো শব্দও নেই।
এ-বিরাট বিচিত্র মহাসাগরের প্রান্তবর্তী জলে পা ছড়িয়ে বালুর ওপরে শুয়ে ক’টা নগ্নদেহী পুরুষ ও নারী হালকা নীল আকাশের পানে চেয়ে নিশ্চল হয়ে রয়েছে। তাদের দেহের রং ‘কারারা’ মর্মরের মতো শুভ্র; দেহগুলো বাইরের মাটির মতো
-
সন্ধের দিকে কোত্থেকে একটা জমাট মেঘ উড়ে এল, যার অভিক্ষেপগুলো কৌণিক ও তীক্ষ্ণ। মেঘ এল আর সাথে সাথে দুর্দান্ত হাওয়া শুরু হল, বাগানের ঝাউগাছগুলোতে প্রচণ্ড সাড়া পড়ে গেল। নওয়াজের স্ত্রী সকিনা ধূসর রঙের শাড়ি পরে ওঘর থেকে বেরিয়ে এল, বারান্দায় নওয়াজকে বললে: দেখেছ, কেমন হাওয়া?
—ভালো লাগছে তোমার?
—বাগানে যাবে? গিয়ে বসবে ওই ঝাউগাছগুলোর তলায়?
ঝাউগাছগুলোতে এমন একটা বিচিত্র শোঁ-শোঁ আওয়াজ, ওরা দুজন তার তলায় না গিয়ে পারলে না। গিয়ে তারা একটা দীর্ঘতর ঝাউগাছের তলায় বসলে। সকিনা তার মাথার রুক্ষ চুল ছেড়ে দিলে, প্রবল হাওয়ায় বোশেখি মেঘের মতো সে-চুল উড়তে থাকল। নওয়াজ কোনো কথা না-কয়ে শুধু তার একটি হাত নিজের
-
দক্ষিণের জানালাটা খোলা, পর্দাও সরানো। গুমট গরমের পর বাইরে হাওয়া দিয়েছে, তার কিছু জানলা গলে ভেতরেও আসছে।
সন্ধেয় বেড়িয়ে ফেরার পর আকরমের এক পেয়ালা চা খাবার অভ্যেস। আজ বেড়িয়ে ফিরে জামা-কাপড় ছেড়ে একটা পাতলা সিল্কের লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ইজিচেয়ারটাতে হেলান দিয়ে বসেছে, এমন সময় হোমেরা চায়ের পেয়ালা নিয়ে আস্তে ঘরে এল। ইজিচেয়ারের পাশে টিপয়, তার ওপর সে পেয়ালাটা নাবিয়ে রাখলে। চা দেবার পর আর কোনো কাজ নেই, কোনো কথাও নেই, তাই হোমেরা দরজার পানে আবার চলতে শুরু করেছে তখন আকরম পেছন থেকে আস্তে ডাকলে: শোন।
—কী? হোমেরা দাঁড়াল।
টিপয় থেকে পেয়ালা তুলে তাতে আকরম এক চুমুক দিলে, তারপর স্বাভাবিক
-
ভোর হতে সন্ধে পর্যন্ত এ স্থান ভরে শুধু খটাখট শব্দ। এতগুলো লোক, সবাই নীরব, কারো মুখে কোনো কথা নেই। এরা নৌকো তৈরি করে, বিভিন্ন প্রয়োজনের বিভিন্ন ঢঙের নানারকম নৌকো। সাম্পান হতে শুরু করে তিনশ' চারশ' মনের সাগরে মাছ ধরবার বা মাল বইবার বড়-বড় নৌকো এরা অনায়াসে তৈরি করতে পারে এবং করে।
কর্ণফুলী নদীর এ-ধারটা ঝোপঝাড়ে ঢাকা পাহাড়, তার ঠিক নিচেই নদীর তীর দিয়ে যে-খানিকটা সমতলভূমি, সেখানে তাদের নৌকো বানাবার কারখানা। একপাশে বিরাট টিনের গুদাম, সেখানে তারা কাঠ রাখে। তার পাশেই ছোট চালার ঘর, রাতে সেখানে লোক থাকে আর পাহারা দেয়। পাহাড়টা পেরিয়ে কাছেই গাঁ। এ-গাঁয়ের লোকদের পেশাই নৌকো বানানো, পুরুষানুক্রমে
-
কখনো স্বপ্ন গড়িয়ে আসে। অদ্ভুত কথা, তবু সত্যি। মনের উচ্চতম শিখরে স্বপ্ন যেন জমাট বেঁধে রয়েছে বরফের মতো, হঠাৎ কখন কিসের উত্তাপ এসে পড়ে তার শীর্ষে, সে-জমাট-বাঁধা স্বপ্ন গড়িয়ে আসে মন বেয়ে। গড়িয়ে আসে হয়তো লাভার মতো, হয়তো স্নিগ্ধ শীতল পানির মতো, কখনো-বা হয়তো পর্বত-দেহে আঘাত পেয়ে ফিরে আসা হাওয়ার মতোই আসে। সব জীবন-তো আর এক নয়।
আকবরের স্বভাব শান্ত। শান্তভাবে চলে শান্তভাবে কথা কয়ে সে আই. এ. পাস করেছে এবং শান্তভাবেই বাপের মৃত্যু সহ্য করে শান্তভাবে কেরানিগিরি করতে শুরু করেছে। কথা সে এত কম কয় যে কখনো মনে হয় তার যেন মন নেই, সে যেন ভাবে না; অথচ এ-কথা
-
[ ওর পরিচয়: ওর বয়স পঁচিশ। চেহারা ধারালো, ক্ষুদ্র উজ্জ্বল চোখদুটো অস্মিতাময়। জীবনে ওর অখণ্ড অবসর, এবং ব্যাংকে অজস্র অর্থ। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এই: কেউ গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে অর্থহীন পুলকে প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দিলে ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।]
সহজ গতি:
ওর ভাষায় আজ সন্ধ্যার কথা:
সায়ন্তন শান্ত অথচ উজ্জ্বল আকাশে রঙের অসংখ্যতা ও সীমাহীনতা। এবং সে-বর্ণঝর্না যেন আজ অত্যুজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে গুঞ্জনময় কোলাহলমুখর আলোকিত শহরের বুকে। চারধারে ঝলমলানি, অস্ফুট সৌন্দর্যের মৃদু অথচ কঠিন অভিব্যক্তি, প্রাণ-স্নাত নরনারীর সংস্কৃতি-তরঙ্গের অনাবিল ঝিকিমিকি, এবং সে-ঝিকিমিকির একান্ত অন্তরালে ও নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে—হঠাৎ ফুটন্ত অস্বাভাবিক উত্তুঙ্গ পুষ্পটির পাপড়িগুলো হতে দূরে, ধূসর-স্নিগ্ধ—নির্জনতার একান্তে। (সেটা দোতলার দক্ষিণ
-
কত গভীর রাতে আফজল রাতের নিঃশব্দতায় কান পেতে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। এবং কখনো- কখনো মনে হয়েছে রাতের উত্তুঙ্গ শিখরে দাঁড়িয়ে তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে সে চেয়ে রয়েছে নিশ্ছিদ্র অতল অন্ধকারের পানে, তারপর মনটা শূন্য হয়ে উঠে ঐ অন্ধকারের, যে-অনুবন্ধী অন্ধকার চিহ্নশূন্য অথচ অবান্তর নয়, সে অন্ধকারের ক্ষুদ্রতম কণাতম অংশই যথেষ্ট তার সীমাহীনতার প্রমাণ দিতে সে অন্ধকারের মতোই হয়ে উঠেছে।
অথচ তারাময় দেয়ালে হেলান দিয়ে অন্ধকারের পানে সে চেয়ে দেখছে। পেছনে তাহলে বিন্দু-বিন্দু যে-আলোর কণা ছড়িয়ে ছিল, তা কি মহাআলোর বিনয়? থেকে-থেকে কাঁটার মতো বিদ্রোহী মনোভাব খুঁচিয়ে উঠেছে। কী একটা সংগ্রাম। সংগ্রাম!
এবং অনেক রাত ঠেকেছে বিভীষিকাময়।
অথচ সে-বিভীষিকায় নেশা।
শারদীয়
-
সামনের মাঠটা উঁচু হয়ে উঠে গিয়ে কিছু দূর হতে আবার নেবে গেছে। নেবে গেছে অনেকখানি। এতখানি নেবে গেছে যে, দূরের সুপুরিগাছ দুটোর শুধু আগা দেখা যায় এখান থেকে।
আকাশটা আজ নীল-ঝকঝকে নীল। এবং সে আকাশের তলে সবুজ মাঠটি মানিয়েছে ভালো। জানলার কাছে দাঁড়িয়ে রাবেয়া সেদিকে চেয়ে আছে বটে কিন্তু তাঁর মন নেই সেখানে। নির্দিষ্টভাবে নেই কোথাও, কিন্তু সামনের মাঠটার নেবে-গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কেমন একটা নীরব উদাসীনতা, তাতে তার মনটা থেকে থেকে বেদনায় ছলছল করে উঠছে।
ওপাশে ইজিচেয়ারে আধ-শোয়া হয়ে আকবর খবর কাগজ পড়ছিল, হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল রাবেয়ার পানে। ক্ষণকাল পরে শুধাল: কী দেখছ অত?
—মাঠ—মাঠ দেখছি
-
ক-দিন হল সামনের বাগান ও লনওয়ালা দোতলা বাড়ির মালিকরা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে। তাদের আগমনে খালি পড়ে থাকা মৃতপ্রায় সে বাড়িটা হঠাৎ প্রাণ পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠল। শুধু প্রাণ তো নয়, দীপ্ত যৌবনেরও আবির্ভাব ঘটেছে বলা যেতে পারে। রাতারাতি আচমকা পরিবর্তন ঘটে গেল সে-বাড়িটায়। দরজা-জানলায় ঝুলতে লাগল রঙিন পর্দা, মোটা ও ভারি এবং আমেঝে পর্যন্ত ঝোলানো, আবার কোনোটা পাতলা ঝিরঝিরে। সিঁড়ি, রেলিং ও বারান্দার প্রান্তের ওপর-নিচ পূর্ণ হয়ে উঠল নানারঙা ফুল ও পাতাগাছের টবে-টবে। তাছাড়া কখনো পিয়ানোর ও রেডিয়োর আওয়াজে, কখনো উচ্চকলহাসিতে অহরহ মুখর হয়ে উঠল গোটা বাড়িটা।
মালিকদের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে সেলিমা উত্তরের গরাদ-দেয়া কিছু-ভাঙা জানলাটার পাশে কাজের ফাঁকে
-
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি নাবল দেখে কামরুল হাসান পা-দুটো গুটিয়ে বসল, তারপর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে হঠাৎ বললে: বুঝেছ, কালচার জিনিসটার যেন একটা গন্ধ আছে যা নাকে এসে লাগে। আর সে গন্ধ রজনীগন্ধার বা হানাহানার গন্ধ নয়, অনেকটা যেন ভালো পাতিনেবুর গন্ধের মতো। আর রং? রংটাও বসরা গোলাপ, সূর্যমুখী-রক্তজবা ইত্যাদির মতো অমন চোখ-ধাঁধানো জলুস তীব্র গোছের নয়, অনেকটা যেন, চাঁদনিরাতের আকাশের বিচিত্র নীলিমার মতো।
বলে কামরুল চোখ বুজল, বুজে আরেকটা কড়া টান দিলে সিগ্রেটে। আসর আজকে জমল না; অসময়ে হঠাৎ বর্ষার জন্যেই এল না কেউ। তবু কামরুলের ভাগ্য ভালো যে, রাসেল (অর্থাৎ রসুল) এসেছে। রসুলের নাম রাসেল হয়েছে তার ঘোরতর চার্চ-প্রীতি থেকে।
-
একটু ঘুম এলেই গলায় শ্লেষ্মা ঘন হয়ে ওঠে। আবার কালুর ঘুম ভেঙে গেল, একটা বিদ্ঘুটে আওয়াজ করে সে চোখ মেলে তাকালে অন্ধকারের পানে। কেমন ঘুটঘুটে ঘন অন্ধকার, তাকালে মনে হয় যেন চোখই নেই, কোটর দুটো শূন্য—ওই অন্ধকারের মতো কালো।
মশার আওয়াজ তীক্ষ্ণতম হয়ে উঠেছে, ওদের রাজ্যে যেন হিংস্র-উল্লাসের বন্যা এসেছে। কিন্তু তবু ঘুমোতে হবে, ঘুমোতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আবার গলা বেয়ে শ্লেষ্মা ঠেলে উঠে শ্বসনে ব্যাঘাত জন্মায়। কালু এবার ওপাশ ফিরে শুল। কিন্তু পা-দুটো টেনেছে কী অমনি তাতে কী যেন ঠেকল, ঠাণ্ডা আর কিছু নরম।
—কে ওখানে, কে?
কে কখন পায়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছে, কুষ্ঠরোগী না ক্ষয়কাশরোগী—খোদা জানেন। কোনো
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.