উড়ন্ত জাহাজ
থাকত এক বুড়ো আর বুড়ি। তাদের তিন ছেলে: দুুজন বুদ্ধিমান, একজন বোকা। বুদ্ধিমানদের ভালোবাসত বুড়োবুড়ি। হপ্তায় হপ্তায় বুড়ি কামিজ দেয় বুদ্ধিমানদের, আর বোকাটাকে নিয়ে হাসাহাসি করে সবাই, বকাবকি করে। চুল্লির ওপরকার মাচায় সে বসে থাকে খাদি কাপড়ের কামিজ গায়ে; বুড়ি খেতে দিলে খায়, না দিলে উপোসেই কাটায়।
একদিন গাঁয়ে খবর এল: রাজা তার মেয়ের বিয়ে দেবে, গোটা রাজ্যের লোককে ডাকবে নেমন্তন্নে। আর মেয়েকে রাজা সম্প্রদান করবে তাকে, যে উড়ন্ত জাহাজ বানিয়ে তাতে করে উড়ে আসবে।
বুদ্ধিমান ভাইয়েরা গেল বনে।
গাছ কেটে ভাবতে লাগল উড়ন্ত জাহাজ বানাতে পারলে হয়।
তাদের কাছে এল এক থুথুরে বুড়ো: ‘ভগবান মঙ্গল করুন তোমাদের! দাও বাছা পাইপ ধরাবার একটু আগুন।’
‘তোমায় নিয়ে বুড়ো ঝামেলার সময় নেই আমাদের।’
ফের ভাবতে লাগল।
‘শুয়োর খাওয়াবার সুন্দর পাতনা বানাবে বাছারা,’ বললে বুড়ো, ‘রাজকন্যের দর্শনও আর পেতে হচ্ছে না!’
এই বলেই বুড়ো একেবারে অন্তর্ধান করল। ভাইয়েরা ঠোকাঠুকি করে, কিছুই আর দাঁড়ায় না।
বড়ো ভাই বললে, 'চল নগরে যাই ঘোড়ায় চেপে, রাজকন্যের সঙ্গে বিয়ে না হলেও অন্তত ভোজ তো খাওয়া যাবে।’
বুড়োবুড়ি তাদের আশীর্বাদ করল, যাত্রার জন্যে সব গোছগাছ করে দিল। বুড়ি সেঁকে তুলল গমের রুটি, শুয়োরের ছানা রোস্ট করল, ঝাল-ঝাল মদ সঙ্গে দিলে এক ভাঁড়।
ঘোড়ায় চেপে রওনা দিলে দু’ভাই।
বোকাটা শুনল যে ভাইয়েরা রওনা দিয়েছে। বললে: ‘দাদারা যেখানে গেছে, আমিও যাব সেখানে।’
মা বলে, ‘তুই বোকাটা যাবি কোথায়? বনে তোকে নেকড়েতেই খেয়ে ফেলবে।’
‘না, খাবে না।’
কেবলি ‘যাব আর যাব!’ কিছুতেই আর মানে না।
তা বুড়ি তখন তার থলেতে দিল বাসি রুটি আর এক ভাঁড় জল, এগিয়ে দিল বাড়ি থেকে।
বোকাটা যায় বন দিয়ে। পথে এক থুথুরে বুড়োর সঙ্গে দেখা। এমন হদ্দ বুড়ো যে দাড়ি একেবারে শাদা—নেমেছে কোমর পর্যন্ত।
‘কুশল হোক দাদু!’
‘কুশল বাছা!’
‘কোথায় দাদু চলেছ তুমি?’
‘দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াই, কেউ কষ্টে পড়লে উদ্ধার করি। কিন্তু তুমি কোথায় চলেছ?’
‘আমি রাজবাড়িতে যাচ্ছি ভোজ খেতে।’
‘আরে, তুমি তেমন জাহাজ বানাতে পারো নাকি, যা নিজে নিজেই উড়বে?’
‘না, তো, পারি না।’
‘তাহলে যাচ্ছ কেন?’
‘মানে দাদারা যে গেছে, তাই আমিও চললাম। হয়ত আমার কপাল ফিরে যাবে।’
‘তা যাক গে। এসো একটু জিরিয়ে নিই, কিছু পেটে পড়ুক। থলি থেকে বার করো কী তোমার আছে।’
‘যা আছে সে তোমার মুখে রুচবে না দাদু: আছে কেবল বাসি রুটি।’
‘ও কিছু না, বার করো যা আছে।’
থলের মধ্যে থেকে রুটি বার করল বোকা। তবে তা কালোও নয়, ছাতা-পড়াও নয়, মা যা দিয়েছিল, এ যে একেবারে গমের ময়দার ফুলোফুলো পাঁউরুটি—পালে-পার্বনে বাবুদের বাড়িতে যা খাওয়া হয়। বোকাটা হতভম্ব, দাদু কিন্তু হাসে।
তা জিরিয়ে নিল তারা, খেল যেমন খাওয়ার কথা। খাবার জন্যে বোকাকে ধন্যি দিয়ে বুড়ো বললে: ‘শোন ছেলে তোকে যা বলি। বনের মধ্যে গিয়ে সবচেয়ে বড়ো ওকগাছটা খুঁজে বার করবি, ডালগুলো যার আড়াআড়ি মেলা। তিনবার কুড়লের কোপ মারবি সে গাছে, আর নিজে উপুড় হয়ে পড়ে থাকবি যতক্ষণ না কেউ ডাকছে। তখন তোর জাহাজ তৈরি হয়ে যাবে। উঠে বসবি তাতে, উড়ে যাবি যেখানে তোর দরকার। শুধু দেখিস, পথে যাদের পাবি সবাইকেই তুলে নিবি!’
দাদুকে কৃতজ্ঞতা জানাল বোকা, বিদায় নিলে তারা। বোকা গেল বনে, যে ওকগাছটার ডালপালা আড়াআড়ি মেলা, খুজে পেল সেটাকে, তিনবার কুড়ুল বসাল তাতে, নিজে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমচ্ছে তো ঘুমচ্ছেই, হঠাৎ শোনে কে যেন তাকে ডাকছে: ‘ওঠো বন্ধু, সৌভাগ্য তোমার এল বলে।’
ধড়মড়িয়ে উঠে বোকা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments