-
এত বড়ো বটগাছ সচরাচর দেখা যায় না। পিরপুরের হাটকে যদি চিনিতে হয়, তবে যে-কোনো অশীতিপর ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেও ইহার উত্তর মিলিবে—দূরে, সে যত দূরেই হোক না কেন, যেন আকাশেরও প্রায় অর্ধেক ছাইয়া আছে, এমন একটা দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড গোলাকার গাছের দিকে দারুণ তৎপরতায় শীর্ণ হাতটি উঠাইয়া সে বলিবে, ‘আরে, তুমি কি কানা? ওই দৈত্যিটার বরাবর চলে যেতে পার না?’ যাহাকে বলা হইবে, সে যেন কোনো ব্যবসায়ী, ওই হাটের দিকেই যাইতেছে, আর কোনো উদ্দেশ্য তাহার নাই। পিরপুর গ্রামটি অন্যান্য গ্রামের মতো নয়, সেখানে কেউ ঘর বাঁধিয়া বাস করিতে পারে, একথা কেউ ভুলেও কল্পনা করিতে পারে না। কেবল একটি হাট লইয়াই
-
হঠাৎ চিৎকার দিয়ে সুমির ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নে সুমি দেখেছে এক মরুভূমিতে সে হারিয়ে গেছে। হাঁটছে আর হাঁটছে, কিন্তু ফেরার কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছে না। তার স্বামী অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। পরদিন সে আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাবে। সুমির বিয়ে হয়েছে দুই মাস। অচেনা ঘরে ঘুম থেকে উঠেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। তার মনে হচ্ছে এ কোন ভুবনে সে এসে পড়েছে! বিয়ের পর বাবার বাসায় গিয়েছে, তবে খুব কম। ওদের বিয়ে পারিবারিকভাবেই ঠিক করা। শ্বশুরবাড়ির অচেনা অনভ্যস্ত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। এই নতুন জায়গায় তাকে স্বামীবিহীন একাই দিন কাটাতে হবে, যত দিন না ভিসা হয়। অনার্স, মাস্টার্স পরীক্ষাকেও এমন কঠিন
-
লিরার খুব মন খারাপ। ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে। আজকে ওর ক্লাসে পরীক্ষার খাতা দিয়েছে, ও খুব কম মার্কস পেয়েছে। সর্বোচ্চ উঠেছে বিশে আঠারো, আর গতবার ক্লাসে প্রথম হয়েও ও পেয়েছে বারো। এবার ক্লাস ফোরেও ও যদি প্রথম না হয় তাহলে মা আর বাবা মিলে যে কী করবে, সে কথা ভাবলেও ওর ভয় লাগছে। লিরা কোথাও খেলতে যেতে পারে না, শুধু পড়া আর পড়া। ওর মা-বাবার একটাই কথা, পরীক্ষায় প্রথম হতেই হবে, যতই কোচিং করতে হোক। বড় হয়ে ওকে ডাক্তার হতে হবে। মাঝে মাঝে তাই ওর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। পথশিশুদের মতো ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে। ওদের কী মজা,
-
কয়েক দিন ধরে নিলুফার ইয়াসমীন খুব চিন্তায় আছেন। তাদের একমাত্র ছেলে বর্ণকে খুব অন্যমনস্ক মনে হচ্ছে। হঠাৎ করেই ও একধরনের দূরত্ব রেখে চলছে। আগে এসেই স্কুলের সব গল্প করত। তার পাশে বসে থাকত। এখন ও ক্লাস নাইনে উঠেছে। একটু বড় বড় ভাব। তাকে এড়িয়ে চলছে। শুধু তা-ই নয়, খাওয়ার সময়ও নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে একাই খাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, তিনি নিজের ছেলেকেই আর চিনতে পারছেন না।
হঠাৎ করে কেন এই দূরত্ব তৈরি হলো তাদের মাঝে? এই ছেলেকেই তিনি কিছুদিন আগে নিজ হাতে খাইয়েও দিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছেন যে ছেলেটা মানসিকভাবে এখন একটা কঠিন সময় পার করছে। কিন্তু তিনি কোনো
-
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের নারীদের রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। বহু নারী যুদ্ধের সময় জীবন দিয়েছেন। অস্ত্র হাতে পুরুষের পাশাপাশি লড়াই করেছেন, নানা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছেন। তেমনি সে সময় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন নারী মুক্তিযোদ্ধারা। বহু নারী মুক্তিযোদ্ধা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেছেন শিল্পী হিসেবে, যা প্রতি ক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর, অস্ত্র আদান-প্রদানের কাজ করেছেন তারা। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব থেকেই নারীসমাজ পালন করে আসছিল অগ্রণী ভূমিকা। তেমনি তিন মহীয়সী নারী মুক্তিযোদ্ধার কথাই বলছি।
নাসরীন রব রুবা
১৯৭১ সালের ১০ মার্চ। তখন তিনি হলি ক্রস কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সেদিনই হঠাৎ করে জানতে পারেন ১৪
-
খবরটা শুনিয়াই বাহির হইয়া পড়িলাম। হারাণকে বরাবর দেখিয়াছি শান্ত-প্রকৃতি, মৃদু স্বভাব, এমন ভীষণ কাজ সে করিয়া বসিল কেন? গুরুভার প্রশ্ন, প্রশ্নের চাপেই সমস্ত মন যেন অবশ্য হইয়া পড়িয়াছে, উত্তর খুঁজিবার চেষ্টা করার সামর্থ্য নাই, উত্তর পাইবার প্রত্যশাও নাই, পা দুইটাকে পর্যন্ত যেন টানিয়া চলিতে হইতেছে।
আমার চৈতন্য ফিরিল বৃদ্ধ ভচার্যকে দেখিয়া। তিনি হন্ হন্ করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছেন আমাকে দেখিয়া বলিলেন- ‘নারকী, মহাপাতক, ঘোর পাপিষ্ঠ।’
বলিয়া প্রসারিত-বাহু নরকের গ্রাস এড়াইতেই যেন তিনি আবার ছুটিয়া চলিলেন। এই বৃদ্ধের সম্বন্ধে মনটা আমার তিক্ত বিরক্ত হইয়া উঠিল। ধর্ম যেন শুধু মানুষকে অমানুষ করিবার জন্যই।
ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়া দেখিলাম আশেপাশের পাঁচটা গ্রামের লোক ইতিমধ্যেই আসিয়া জড়
-
সতীশ ওঠেনি, শিবু ওঠেনি, মনুর মা ওঠেনি, এমনকী সূর্যও আকাশে দেখা দেয়নি, তার শুধু আলো পৌঁছেছে পৃথিবীতে।
কিন্তু শ্রীবিলাস উঠেছে।
বিছানা থেকে উঠেই প্রথমে খুঁজল লাঠি,—এটা ছাড়া সে চলতে পারে না, তার অন্ধত্বকে সে কতকটা উপহাস করে এই লাঠির সাহায্য নিয়ে। ওই লাঠি তার মস্ত বড়ো সাথি। খুঁজতে খুঁজতে সাথিকে সে খুঁজে পেলও, তার ডগাটি একবার ডান পাশে, একবার বাঁ পাশে ফেলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল এবং আন্দাজে দিক ঠিক করে করজোড়ে সূর্যকে প্রণাম করল।
ঘরের ভিতর তার স্ত্রী বিন্দু, দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে, ভোরের বাতাসের ছোঁয়াচে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে।
লাঠিটা একপাশে রেখে শ্রীবিলাস দেয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝেয় বসে পড়ল।
-
আশ্চর্য, এমন একটা ছবি রানির ভালো লাগল না। অর্ধেকও হয়নি, তখনি সে অস্বস্তি বোধ করছিল। আগে, পেছনে ও পাশের দর্শকগুলো তন্ময় হয়ে দেখছে, কিন্তু রানি তার চোখদুটি যদিও পর্দার দিকে রেখেছে, ভালো লাগছে না তার। অথচ এখানে আসতে তারই আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি।
সে বিমলকে চুপি চুপি বললে, চলো বাড়ি যাই।
—কেন, ভালো লাগছে না?
—না, তুমি চলো।
বিমল বললে, দাঁড়াও ইন্টারভ্যালটা তো হোক।
হলের ভেতরের হাওয়া যেন ভারী হয়ে উঠেছে, রানি নিশ্বাস ফেলতে পারছে না।
বিশ্রাম হল, কিন্তু বিমল যা মনে করেছিল তা হল না, রানি আর থাকল না। সে আর কী করে, নীল আলোর নীচ দিয়ে বাইরে এসে
-
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সান্ধ্যভ্রমণ শেষ হয়নি; পার্কের যে-দিকটা জনবিরল সেখানে কখনও লাল কাঁকরের পথে, কখনও নরম ঘাসের উপরে স্যার বিজয়শংকর নীরবে পায়চারি করছিলেন। অদূরে মানুষের ভিড় থেকে, যানবাহন-পীড়িত পথের চলায়মান জনতা থেকে, একটানা কোলাহল শোনা যায়। মাঝে-মাঝে উজ্জ্বল আলো এসে পার্কের দেহাবরণ খুলে সমস্ত প্রকাশ করে দিচ্ছে।
স্যার বিজয়শংকর নিজের মনে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন।
—বাবা, ও বাবা!
কান্নায় বিকৃত একটি ছোট্ট মেয়েলি স্বর যেন কাছে কোথাও শোনা গেল! স্যার বিজয় থমকে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন।
—আপনি আমার বাবাকে দেখেছেন?
মেয়েটি তাঁর কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে—ফ্রক-পরা, স্যার বিজয়শংকর চমশা-চোখে সেই স্বল্পালোকেই তাকে দেখলেন। ঘাড় পর্যন্ত চুল, দু-হাত আর পা নিরাভরণ, মুখ চোখের
-
ছোটো দোতলা বাড়ি, তবুও আমাদের পক্ষে বেশি হয়ে যায় বলে নীচের ঘরে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় একজন ভাড়াটে আনলাম।
লোকটির নাম শৈলেশ, সঙ্গে স্ত্রী আর চারটি ছেলে-মেয়ে।
যেদিন তারা প্রথম এল তখন রাত্রি, লোকটাকে সেদিন আর দেখিনি। কিন্তু পরদিন কলের পাড়ে মুখ ধুতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম তার চেহারা দেখে। মিশকালো তার গায়ের রং, চোখদুটি বড়ো, লম্বা আর ভয়ানক জোয়ান, সমস্ত গা লোমে ভর্তি, মাথায় চুল উলটানো। তার সবচেয়ে বিস্ময়কর যা তা হচ্ছে তার গোঁফ-জোড়া। স্যার আশুতোষেরও বোধ করি এমন গোঁফ ছিল না। নিজেকে ধন্যবাদ দিলাম, এই ভেবে যে রাতে না দেখে ভালোই করেছি, দেখলে হয়তো মূর্ছা যেতাম। এখানে বলে রাখা
-
ঘরে আর কেউ নেই।
মালতী জিনিসটা এপিঠ-ওপিঠ করে বললে, ‘আহা, এটা কী দিয়ে তৈরি বলুন তো?’
সুব্রত ঢালটি পরীক্ষা করে বললে, ‘নিশ্চয় লোহা’।
মালতী খিল খিল করে হেসে উঠল, হাসতে হাসতে বললে, ‘মোটেই নয়, তার ধার-কাছ দিয়েও নয়। এটা গন্ডারের চামড়া দিয়ে তৈরি। দেখতে ঠিক লোহার মতো মনে হয়, না?’
সুব্রত বিস্ময়ের স্বরে বললে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এ দিয়ে গুলি ফেরানো যায়?’
—‘হুঁ, খুব যায়। গন্ডারের চামড়া যে খুব শক্ত এটা জানেন না?’
—‘জানি।’
—‘তার চেয়েও শক্ত এটা। জলে ভিজিয়ে রোদে শুকিয়েছে, একেবারে লোহার মতো হয়ে গেছে। এগুলো আগে আরও অনেক ছিল, হাতে হাতে কতগুলো নিখোঁজ হয়ে গেছে, এখন এই কয়টি
-
রমলা বিরক্ত হয়ে উঠল। যেন এত বিরক্তি তার কোনোদিন আসেনি। নইলে ইকনমিক্সের পপুলেশন চ্যাপ্টারটা তো জমে ওঠবার কথা কিন্তু আজকার ক্লাসে কিছুতেই যেন তার লেকচার গভীর হয়ে উঠল।
এমন এক-একটা দিন আসে সত্যি যখন কিছই ভালো লাগে না। আজ যেন তাই। সে যেন আজ প্রথম টের পেল, ইস্কুলের মেয়েদের চেয়ে কলেজের মেয়েরা গোলমাল করে বেশি। অথচ এখানে কিছুই বলা যায় না, ইস্কুলের মতো যায় না বেঞ্চির ওপর দাঁড় করানো, যায় না কান মলে দেওয়া। ইস্কুল থেকে কলেজে উঠে মনে করে, কী-না-কী করে ফেললাম; দুর্ভাগ্য সব। তার মেয়ে যদি হয়, সে কোনোদিন তাকে কলেজে পড়াবে না। পড়িয়ে বা লাভ কী? কিছু
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.