-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে সমস্ত জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতা সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন, তাদের প্রথম সারির মধ্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অবিভক্ত ভারতের সর্বত্র সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এই নামটি সবচেয়ে সুপরিচিত। মওলানা আজাদ তাঁর আত্মজীবনীতে নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে যে কথাগুলি লিখে গেছেন, তা থেকেই আমরা ভারতের এই প্রতিভাশালী, সদা সক্রিয়, স্থিরবুদ্ধি ও দৃঢ়চিত্ত চরিত্রটির পরিচয় পেয়েছি।
মওলানা আজাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন বাবরের ভারত অভিযানের সময় হিরাট থেকে এদেশে এসেছিলেন। মোগল রাজত্বের যুগে এই বংশের বহু কৃতি পুরুষ ধর্মীয় ক্ষেত্রে এবং সরকারী প্রশাসন কার্যে বিশিষ্ট স্থান গ্রহণ করে এসেছেন। মওলানা আজাদের পিতামহের যখন
-
যে কোনো মুক্তি আন্দোলন, গণ আন্দোলন বা শ্রেণী আন্দোলনের পেছনে তার অনুকূল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পটভূমি থাকলে তা উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। অবশ্য সকল ক্ষেত্রে যে তার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে তা নয়। সময় সময় বর্হিজগতের আন্দোলনের তরঙ্গও তার উপরে এসে ঘা মারে। ফরাসী রাষ্ট্রবিপ্লব, ইতালী ও আয়ারল্যাণ্ডের মুক্তি আন্দোলন এবং সর্বশেষে রুশিয়ার সর্বহারা বিপ্লব, ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছিলো।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে সর্বভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তার প্রাথমিক প্রেরণা লাভ করেছিলো, এ বিষয়ে কোনো মতদ্বৈধতা নেই। বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাথমিক অধ্যায়গুলিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরী হয়ে উঠেছিলো, একথা অবশ্যই বলা চলে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা
-
খিলাফত সমস্যা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে এক ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে তুলেছিল। যুদ্ধপূর্বে সংঘটিত ঘটনাবলী দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এবং নেতৃবৃন্দের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে চলেছিল। ভারতের বিপ্লবীরা এই যুদ্ধের সংকটের সুযোগে ব্রিটিশের শক্র জার্মানীর সহায়তা নিয়ে ভারতে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান সৃষ্টি করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন, এ কথা ইতিপূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
শুধু বিপ্লবীরাই নয়, যুদ্ধকালীন ও যুুদ্ধপরবর্তী ঘটনাগুলির মধ্য দিয়ে সারা দেশের মানুষের রাজনৈতিক আশা-আকাক্সক্ষার দ্রুত রূপান্তর চলেছিল। ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯১৬ সাল বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই ১৯১৬ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে লক্ষ্ণৌ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। লক্ষ্ণৌর যুক্ত সম্মেলনে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে জিন্নাহ মহম্মদ
-
পাঞ্জাবের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা ড. সাইফুদ্দিন কিচলু ১৮৮৮ সালে অমৃতসর শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার কলেজ জীবন কেটেছিল আগ্রা ও আলীগড়ে। আলীগড় কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করার পর তিনি উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য ইউরোপে যান। ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. ডিগ্রী এবং জার্মানী থেকে পি. এইচ. ডি. ডিগ্রী লাভ করেন। এছাড়া তিনি লণ্ডনে ব্যারিস্টারি পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
১৯১৫ সালে ইউরোপ থেকে স্বদেশে ফিরে আসার পর তিনি অমৃতসর শহরে ব্যারিস্টার হিসেবে আইন-ব্যবসা শুরু করলেন। এই সময় তিনি শহরের বিভিন্ন সামাজিক ও জনহিতকর কাজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতেন। এই সমস্ত কাজের মধ্য দিয়ে তিনি যে জনপ্রিয়তা লাভ করেন, তার ফলে
-
ডা. আনসারী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সর্বজন পরিচিত নেতা। তার পুরো নাম ডা. মুখতার আহ্মদ আনসারী। তাঁর পূর্বপুরুষেরা সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে বাইরে থেকে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় থেকেই তাঁরা সরকারের সামরিক ও বেসামরিক বিভাগে বিশিষ্ট পদ অধিকার করে এসেছেন। ডা. আনসারী ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুর গ্রামে। ডা. আনসারী তাঁদের পরিবারের অন্যান্যদের মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করার পরেই তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য নিজাম সরকারের বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে চলে গেলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন এবং পর্যায়ক্রমে এল.
-
হাকিম আজমল খান
সর্বভারতীয় কংগ্রেসী নেতাদের মধ্যে হাকিম আজমল খানের নাম সুপরিচিত। তাঁর পূর্বপুরুষেরা মুগল সম্রাট বাবরের সঙ্গে এদেশে চলে আসেন এবং তখন থেকেই ডা. আনসারীর মত হাকিম আজমল খানের পূর্বসূরীরাও চিকিৎসা বিদ্যায় সমগ্র উত্তর ভারতে অসামান্য খ্যাতিলাভ করেছিলেন। তাঁর পূর্বপুুরুষদের মধ্যে একজন সম্রাট আকবরের আমলে চিকিৎসাকে তার পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। তাঁরই এক বংশধর ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজকীয় চিকিৎসক। তারপর থেকে তঁাঁদের বংশধরদের মধ্যে কেউ কেউ রাজ চিকিৎসক হিসাবে কাজ করে এসেছেন।
এই বিখ্যাত চিকিৎসক বংশের উপযুক্ত বংশধর ছিলেন হাকিম আজমল খান। তাঁর জন্ম ১৮৬৩ সালে। তাঁর পিতার নাম গোলাম মহম্মদ খান।
শিক্ষার দিক দিয়ে তিনি প্রাথমিক বাধ্যতামূলক কোরান
-
হোসেন আহমদ মাদানি তাঁর কৈশোরে দেওবন্দ শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থী হিসাবে এসেছিলেন, তিনি মাহমুদ আল হাসানের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। কিন্তু এখানকার শিক্ষা শেষ হওয়ার আগে তাঁর পিতা ১৮৮৯-১৮৯০ সালে তাঁকে নিয়ে মক্কায় চলে যান। তাঁরা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। তখন থেকে ষোল বছর বয়স পর্যন্ত হোসেন আহমদ প্রধানতঃ হেজাজে অবস্থান করতেন, তবে মাঝে মাঝে ভারতে আসতেন। মাহমুদ আল হাসান যখন ভারত থেকে মক্কা এলেন তখন পর্যন্ত হোসেন আহমদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো সর্ম্পক ছিলনা। কিন্তু মাহমুদ আল হাসানের সঙ্গে আলাপ আলোচনার ফলে তিনি ভারতের সংগ্রামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। মাহমুদ আল হাসানের প্রিয় শিষ্য এবার তাঁর সহকর্মী ও পরামর্শদাতা হয়ে দাঁড়ালেন।
মাহমুদ
-
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের ফলে সারা দেশ হতাশা ও অবসাদে ছেয়ে গিয়েছিল একথা সত্য, কিন্তু এই আশা ভঙ্গের বেদনা ও অবসাদ খুব বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। ইতিপূর্বে স্বাধীনতা ছিল একটা দূর সুখ-স্বপ্ন, যাকে ঘিরে মানুষ কল্পনার জাল বুনত। কিন্তু এ যুগে নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে স্বায়ত্বশাসন শুধু স্বায়ত্বশাসন নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের কাছে নিকট ও অনিবার্য আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভারতবাসীদের এই চিন্তাধারা দ্রুত প্রবাহে এগিয়ে চলেছিল। ১৯১৯ সালের মণ্টেণ্ড চেমসফোর্ড রিফর্মকে তারা অবজ্ঞায় আবর্জনার স্তুপে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের পুরনো দিনের ধারণাকে আঁকড়ে ধরে বসেছিল। তারা আশা করছিল ১৯২৮ সালে পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গ সভ্যদের দ্বারা গঠিত সাইমন
-
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আবদুল গফফার খানের ভূমিকা চিরস্মরণীয়। সেই কারণেই তিনি ভারতের সর্বত্র ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন। শুধু ভারতেই নয়, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বীর দেশপ্রেমিকের খ্যাতি ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। পাঠানদের হৃদয়রাজ্যের তিনি ছিলেন একচ্ছত্র রাজা। এই দুর্ধর্ষ ও যুদ্ধপ্রিয় পাঠান জাতিকে তিনি কি করে কোন্ মন্ত্রে শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অহিংস সংগ্রামের সৈন্যবাহিনীতে পরিণত করতে সমর্থ হয়েছিলেন, দেশ বিদেশের লোকের মনে তা গভীর বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল।
তাঁর জন্ম ১৮৯০ সালে, পেশোয়ার জেলার চরসদ্দার তহশীলের অন্তর্গত উৎমন্জাই গ্রামে। তিনি এক বিশিষ্ট ভূস্বামী খান-পরিবারের সন্তান। সীমান্ত প্রদেশের পাঠান জাতির এই সমস্ত খান বা সমাজপতিরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ অফিসারদের তাঁবেদারী
-
মওলানা হাবিবুর রহমান লুধিয়ানী ছিলেন পাঞ্জাবের লুধিয়ানার অধিবাসী। তাঁদের বংশে একটি দেশপ্রেমিক ঐতিহ্য ছিল, যেটা নিঃসন্দেহে তাঁর চরিত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখানে সেই পুরানো দিনের কাহিনীটির উল্লেখ করছি।
এই ঐতিহ্যের উৎস সন্ধানে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের যুগে। লুধিয়ানের ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বিশিষ্ট পরিবারটি এই মহাবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল। পরিবারের প্রধান ছিলেন আবদুল কাদের। দিল্লীশ্বর বাহাদুর শাহ্ স্বাধীনতার ঘোষণার পর আবদুল কাদেরকে দিল্লীতে চলে আসার জন্য নির্দেশ পাঠালেন। সেই নির্দেশ পেয়ে আবদুল কাদের এবং তাঁর বীর ছেলেরা দিল্লীর পথে যাত্রা করলেন। কিন্তু সে পথ বড় বিপজ্জনক, পথে পথে ব্রিটিশ সৈন্যদের ঘাঁটি। আবদুল কাদেরের সশস্ত্র দল সেই প্রতিরোধের
-
বালুচ জাতির বাসভূমি বেলুচিস্তান। এই বালুচরা উত্তর পশ্চিম-সীমান্ত প্রদেশের পাখতুন বা পাঠানদের মতো এই ইতিহাসের অজানা কোনো এক অধ্যায়ে সীমান্তের ওপার থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। সে কতকাল আগের কথা, কেনই বা তাদের নিজেদের দেশ ছেড়ে এই দুর্গম অঞ্চলে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছিল, তা নিয়ে পণ্ডিতে পণ্ডিতে নানারকম মতভেদ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তারা মোটামুটিভাবে একমত যে এই বালুচরা যে কোনো কারণেই হোক একদিন কাম্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ উপকূলের আদিভূমি ত্যাগ করে এখানে চলে এসেছিল।
কিন্তু আজকের দিনের বালুচরা এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। বংশপরম্পরা সূত্রে প্রাপ্ত অতীত যুগের সেই স্মৃতি তাদের মন থেকে একেবারেই মুছে গেছে। এই বেলুচিস্তানকেই তারা
-
উনিশ শতকের রুশকথাশিল্পী ফিওদর দস্তয়েভস্কি সম্বন্ধে ‘উপন্যাসের তত্ত্ব গ্রহে হাঙ্গেরীর মার্কসবাদী সৌন্দর্যতত্ত্ববিদ গিওর্গি লুকাচ ১৯১৪ সালে লিখেছিলেন যে, দস্তয়েভস্কি অনাগত লেখক লেখিকাদের জন্যে এক নতুন ধরনের বাস্তববাদের খসড়া রেখে গিয়েছেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি এই ‘খসড়াগুলো’ সমগ্র বিশ শতকের বিশ্ব সাহিত্যের প্রাণবন্ত ধারা হিসেবে আজও সক্রিয়। বাংলা সাহিত্যের কল্লোল যুগের গল্পে উপন্যাসে দস্তয়েভস্কির উপন্যাস ‘ক্রাইম এণ্ড পানিশমেন্ট’ এবং ‘দি ইডিয়ট’ উদ্দাম মানবতাবাদী যৌবনের ভাবের ঘোর যুগিয়েছিল। সেই থেকে দস্তয়েভস্কির গল্প-উপন্যাস বাংলাভাষী পাঠক-পাঠিকাকে টানে তাঁর এই পরিচিতিকে সামনে রেখে। বিশ্ব সাহিত্যে বিশেষ করে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের দিনবদলের পালায় তাঁকে ঘিরে যে ভাবাদর্শের লড়াই চলছে সেটাই বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
দস্তয়েভস্কির কষ্টিপাথরে সাহিত্যে
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
উৎস
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.