আইন অমান্য আন্দোলন

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহারের ফলে সারা দেশ হতাশা ও অবসাদে ছেয়ে গিয়েছিল একথা সত্য, কিন্তু এই আশা ভঙ্গের বেদনা ও অবসাদ খুব বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। ইতিপূর্বে স্বাধীনতা ছিল একটা দূর সুখ-স্বপ্ন, যাকে ঘিরে মানুষ কল্পনার জাল বুনত। কিন্তু এ যুগে নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে স্বায়ত্বশাসন শুধু স্বায়ত্বশাসন নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা তাদের কাছে নিকট ও অনিবার্য আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ভারতবাসীদের এই চিন্তাধারা দ্রুত প্রবাহে এগিয়ে চলেছিল। ১৯১৯ সালের মণ্টেণ্ড চেমসফোর্ড রিফর্মকে তারা অবজ্ঞায় আবর্জনার স্তুপে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের পুরনো দিনের ধারণাকে আঁকড়ে ধরে বসেছিল। তারা আশা করছিল ১৯২৮ সালে পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গ সভ্যদের দ্বারা গঠিত সাইমন কমিশনের তদন্তের পর আরও কিছু ছিঁটেফোটা অধিকার দিয়ে এই অসন্তোষ ও বিক্ষোভের মুখ কিছুকালের জন্য চাপা দেওয়া যাবে। ভারত যদি অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করতেও পারে, বর্তমান শতাব্দীতে তাদের ইচ্ছা পূর্ণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এই বিষয়ে তারা নিশ্চিত ছিল। তাদের ভরসা ছিল মুসলমান, এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায় এবং দেশের রক্ষণশীল মতাবলম্বী নেতৃবৃন্দের উপর। তারা মনে করেছিল, সাইমন কমিশন বর্জন সম্পর্কে কংগ্রেস যতই গর্জন করুক না কেনো, দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও বিভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যে বোঝাপড়া করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সাইমন কমিশনের সুপারিশগুলি গ্রহণ করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকবে না।

এ সম্পর্কে তদানীন্তন ভারত-সচিব বারকেনহেড স্পষ্ট ভাষায় তাঁর এই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন, “ভারতীয়দের মধ্যে যারা সাইমন কমিশনকে বর্জন করার কথা বলছে, প্রকৃত বাস্তব অবস্থার সঙ্গে তাদের কোনোই সম্পর্ক নেই। এ সম্পর্কে আমার বক্তব্য হচ্ছে এই যে, যারা এই বর্জন আন্দোলনকে সংগঠিত করে তুলছে তাদের মনে এই ধারনা আছে যে তারা পরস্পর বিরোধী উপাদানে গঠিত এই বিশাল দেশের যথার্থ প্রতিনিধি। তাদের এই ধারণা যে কতদূর ভ্রান্ত এখন থেকে প্রতিটি মাসের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে এই সত্যটা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়ে একমাত্র ব্রিটিশ সরকারই হচ্ছে দায়িত্বশীল ট্রাস্টি, তাদের উপরেই এই দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে। তারা যাই মনে করুক না কেন, লক্ষ লক্ষ মুসলমান, অনুন্নত শ্রেণীর হিন্দু এবং ব্যবসায়ী মহল ও এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সম্প্রদায়ের লোকেরা এই কমিশনের কাছে সাক্ষ্য দেবার জন্য এগিয়ে আসবে এবং কমিশন যথাসময়ে পার্লামেন্টে তার রিপোর্ট পেশ করবে। কিন্তু বারকেনহেডের নিজের এই অভিমতের উপর যতই বিশ্বাস থাক না কেনো, কার্যক্ষেত্রে সেটা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছিল। কেননা সাইমন কমিশন বর্জনের এই আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে সার্থক হয়েছিল এবং এই বর্জন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমগ্র ভারতে এক নতুন শক্তির সঞ্চার হয়ে উঠেছিল।

সারাদেশ জুড়ে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলন চলেছিল। ১৯২৮ সালের ১৬ ই ফেব্রুয়ারী তারিখে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে এর বিরুদ্ধে এক প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও সরকার তাদের এই প্রতিবাদের কোনো মূল্য দেওয়া প্রয়োজনবোধ করলেন না। ফলে কংগ্রেসের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধিতার মনোভাব আরও তীব্র হয়ে দেখা দিল।

১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে উপস্থিত ১৫০০০ লোকের সামনে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপিত হলো এবং বিপুল ভোটাধিক্যে গৃহীতও হলো। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য হলো এই যে এখন থেকে কংগ্রেস ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করল। অতঃপর কংগ্রেস দেশের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদসমূহ ও সরকার কর্তৃক গঠিত যে কোন সংস্থা বর্জন করে চলবে এবং সংগ্রামের পন্থা হিসাবে যেখানে প্রয়োজন মনে করবে সেখানেই আইন অমান্য আন্দোলন এমনকি প্রয়োজন বোধে ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলনও পরিচালনা করবে।

১৯২৯ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice