-
হযরত আদ ও বিবি হাওয়া শয়তাদেরকুচক্রে পড়ে বেহেশতচ্যুত হলেন। তাঁরা আল্লাহতা’লার অভিশাপে পৃথিবীতে এসে বাস করতে লাগলেন। ক্রমে তাঁদের সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করতে লাগলো। হযরত আদমের বংশধরগণের মধ্যে হাবিল ছিলেন অতিশয় ধর্মপ্রাণ। তিনি রাতদিন কেবল খোদার বন্দেগীতে মশগুল হয়ে থাকতেন। অন্য কোন দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিলো না।
ইবলিস আদমের ওপরে হাড়ে হাড়ে চটে ছিলো। সে কেবল সুযোগ খুঁজছিলো কি করে এঁর সন্তানগণকে পথভ্রষ্ট করা যায়। অবশেষে অনেক প্রলোভন দিয়ে কাবিল নামক পুত্রকে আপনার অধীনে আনতে সমর্থ হলো। কাবিল শয়তানের ফেরেরীতে পড়ে মুহুর্তের জন্য ভুলেও একবার আল্লাহতা’লার নাম মুখে আনতো না, বরং দিনে দিনে পাপের পথে অধিক অগ্রসর হতে লাগলো।
একদিন হাবিল
-
হযরত আদম আলাইহিস সালামের বংশধরগণ ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর চারিদিকে পরিব্যপ্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু ধর্মের প্রতি, আল্লাহতা’লার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণই ছিলো না। তারা দিনে দিনে অনাচারী ও পাপাচারী হয়ে উঠতে লাগলো। শেষে এমন অবস্থা হলো—পরশ্রীকাতরতা, পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা, ঝগড়া ও মারামারি তাদের নিত্য-নৈমিত্তিক কর্মের মধ্যে পরিগণিত হয়ে পড়লো। সর্বদা পাপাচরণ করা এবং পাপকার্যে ডুবে থাকা তাদের প্রকৃতি হয়ে উঠলো। তাদের ধর্মপথে আনবার জন্য আল্লাহতা’লা নূহ নবীকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নানা ধর্মোপদেশ দিয়ে তাদের সৎপথে আনবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলেন; কিন্তু কেউ তাঁর কথায় কর্ণপাত মাত্র করলো না। বরঞ্চ হাসি-মস্করা করে এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তাঁকে বেয়াকুব বানাবার চেষ্টা করতে
-
অনেক আগের কথা। আরব দেশে সাদ নামে একটি বংশ ছিলো। এই বংশের লোকদের চেহারা ছিলো যেমন খুব লম্বা এবং চওড়া, গায়েও তেমনি ভীষণ শক্তি।
তারাই ছিলো তখন আরব দেশে প্রবল এবং প্রধান।
তাদের একজন বাদশাহ ছিলো—তার নাম শাদ্দাদ। শাদ্দাদ ছিলো সাত মুলুকের বাদশাহ। তার ধন-দৌলতর সীমা ছিলো না। হাজার হাজার সিন্দুকে ভরা মণি, মুক্তা, হীরা জহরৎ। পিলপানায় লক্ষ লক্ষ হাতী, আস্তাবলে অসংখ্য ঘোড়া। সিপাই-শাস্ত্রী যে কত তার লেখাজোকা ছিলো না। উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র, আমলা-গোমস্তায় তার রঙমহল দিনরাত গম-গম করতো।
সাধারণতঃ মানুষের ধনদৌলত যদি একটু বেশি থেকে থাকে তবে সে একটু অহঙ্কারী হয়ই। শাদ্দাদ বাদশাহের দেমাগ এত বেশী হয়েছিলযে, একদিন সে দরবারে
-
মহাপ্লাবনের পর বহুকাল অতিবাহিত হয়েছে। নূহের বংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বংশে একজন পরম ধার্মিক লোক জন্মগ্রহণ করলেন, তাঁর নাম ইসরাইল। তিনি যে দেশে বাস করতেন তার নাম কেনান। মিশরের বাদশাহ ফেরাউন তাঁকে মিশরে এসে বাস করার আমন্ত্রণ করেন।
তিনি ইসরাইলকে যথেষ্ট প্রীতির চক্ষে দেখতেন। ফেরাউন কালক্রমে পরলোক গমন করলে অপর একজন ফেরাউন সিংহাসনে উপবেশন করলেন। ফেরাউন কোন লোকের নাম নয়। মিশরের বাদশাহদিগকে ফেরাউনবলা হতো, ইহা পদবী যাহা হউক, পরের এই ফেরাউন অত্যাচারী ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী ফেরাউনের একজন উজীর ছিলেন। প্রথমে তিনি খুব সৎস্বভাবের লোক ছিলেন। নানা রকমে প্রজাদের উপকার করতেন।
কোন বৎসর অজন্মা হলে তিনি নানা রকম কৌশল করে প্রজাদের
-
গুরুদয়ালের পায়ে ব্যথা, হাঁটিতে কষ্ট হয়। তবু না হাঁটিলে বুঝি তার চলে না? সকালবেলা বাহির হইয়া যায়। কোনোদিন দুপুরে ফিরে, কোনোদিন ফিরেও না। কোনোদিন সূর্যের অস্তগমনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে ফিরে, ফিরিয়া হয়তো অপরিচ্ছন্ন বিছানাটা হাতড়াইয়া দেশলাই বাহির করিয়া 'ডিবা' জ্বালিল, না-হয় তো বাড়ির পূব দিককার নিমগাছটার তলায় হাত-পা ছড়াইয়া দিয়া গান ধরিল:
রাধে, রাধে গো রাধে,
তোর লাগি মোর পরাণ কাঁদে;
নইলে কি আর কালো শশী
অতি সাধের চূড়া বাঁশী
অই চরণে তুলে দিল সাধে,
রাধে, রাধে গো রাধে...
বাড়ির একমাত্র অধীশ্বর সে। সে ছাড়া এবাড়িতে আর একটিও জীবন্ত প্রাণী নাই। কাজেই তার এই স্বেচ্ছাচারিতা। কেহই বাধা দেয় না।
প্রতিবেশীদের
-
দূর ছাই। জায়গাটা তাকে ছাড়তেই হবে। তমোনাশ রায়ের আর একটা দিনও ইচ্ছা করে না এখানে থাকতে। কী নিয়ে থাকে সে এখানে? কী এখানে আছে? ভোঁস ভোঁস করে এক-একটা ট্রেন আসে; হাত-পা ছুড়ে যেন অচল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কোনোটা পাঁচ মিনিট, আর কোনোটা দু-মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে আবার স্টার্ট দেয়। ক্ষুদ্র প্ল্যাটফর্মে সংখ্যায় অপ্রচুর যাত্রী-যাত্রিনীরা ভিড় করে। বেরোবার একটা লোহার গেট আগলে তমোনাশ আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারা তার সঙ্গে বোঝাপড়া করে, কাকুতি করে, আবার বচসাও করে, বলে, ধনেখালির টিকেট করে ফকিরের হাটে কেন নেমেছি, শুধচ্ছো বাবু! আমরা গরিব, আমরা খেতে পাই না, এক বেলা খাই, তো দুবেলা উপোস করে থাকি।
আমরা
-
মেঘনার পাড় ভেঙে একটা শাখানদী বেরিয়েছিল। তার নাম তিতাস। এখন সে বেশ বড় নদী। আমরা তারই তীরে বাস করি। তার জলের কিনারায় লগি গেড়ে আমরা নাওগুলো বেঁধে রাখি। তার পাড়ের মাটিতে ঘাসের উপর বাঁশের "আড়া" বেঁধে আমরা জালগুলো শুকোতে দিই। পল্লির ভেতর থেকে যে-পথ ঘাটে গিয়ে ঠেকেছে, তারই একপাশে মাটিতে গর্ত করে আমরা জালে গাব দিই, আরেক পাশে ডাঙায় তুলে আমরা না'য়ে দিই আলকাতরা।
আমরা এক সংসারে দুই ভাই। দাদা আর আমি। আমি ধরি মাছ, দাদা করে মাছের ব্যাপার। আমি নদীতে জাল ফেলি, জাল তুলি, রাজপুরে ঘাটে নিয়ে সে-মাছ নগদ দামে বেচে আসি। দাদা না'য়ে না'য়ে ঘুরে তার মাছের ডালি
-
লাইট হাউস
জাহাজ ধীরে ধীরে সাগরে গিয়ে পড়ল। টের পেলুম না, কখন, কি করে সাগরে এসে গেছি। তীরের উপর চোখ রেখে চলছিলুম—সেই তটরেখা এক সময় চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল—স্বপ্ন যে ভাবে মিলিয়ে যায়—তেমনি ধীরে ধীরে।
যাত্রীদের দিকে তাকালে করুণা জাগে—এত বড় একটা সাগর, যার সঙ্গে মিশেছে মহাসাগর—দুনিয়ার সকল মহাসাগরের সঙ্গে যার যোগাযোগ—তার সম্বন্ধে তারা একান্তই উদাসীন। চোখ খুলে তাকাবারও যেন গরজ নেই কারো। বিরাট একখানা উপন্যাসের মত জাহাজটা সাঁতার কেটে চলেছে। তার ভেতরে অনেক চরিত্র, অনেক চঞ্চলতা, অনেক উপাখ্যান—আপনাতে আপনি মশগুল তারা, বাইরের দিকে বড় একটা কেউ তাকায় না—তাকালেই যেন তাদের জীবনের ছন্দপতন হয়ে যাবে। উপন্যাস এগিয়ে চলেছে নিজের
-
একজন পুঁজিপতির অধীনে যখন বহু শ্রমিক উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত হইয়াছে, তখন হইতেই পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদনের শুরু। বহু শ্রমিকের এক সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করাকে মার্কস্ আখ্যা দিয়াছেন ‘কো-ওপারেশন’। পুঁজিতন্ত্রের শুরুতে উৎপাদনের যন্ত্রপাতির চেহারা বদলায় নাই। যন্ত্রপাতির দিক হইতে আগেকার যুগের সহিত পুঁজিতন্ত্রের তখনো তেমন প্রভেদ দেখা দেয় নাই। একজন পুঁজিপতি এখন বহু শ্রমিককে সমবেত ভাবে খাটায়। পূর্ববর্ত্তী যুগের সঙ্গে প্রভেদ শুধু এতটুকুই।
সকল শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতা একই রকম নয়। একজন শ্রমিক ঘণ্টায় যতটুকু উৎপাদন করে, অন্য একজন হয়ত তাহার চেয়ে কম উৎপাদন করে। কিন্তু দশজন শ্রমিক একসঙ্গে সমবেত ভাবে কাজ করিলে, একজনের উৎপাদনের ন্যুনতা অন্য শ্রমিকদের অধিক উৎপাদন দ্বারা পরিপূরণ হইতে
-
পুঁজিতন্ত্রে শ্রমিক পুঁজিপতির নিকট তাহার শ্রমশক্তি বিক্রয় করে। পুঁজিপতি শ্রমিক ভাড়া করে এবং উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের জন্য তাহাকে কারখানায় খাটায়। শ্রমিক তাহার খাটুনির পরিবর্তে পুঁজিপতির নিকট হইতে মজুরী পায়। ইহাই শ্রমশক্তির ক্রয়-বিক্রয়।
শ্রমশক্তি একটী বিশেষ প্রকারের পণ্য। এই পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সমাজের দুইটী মূল শ্রেণীর—বুর্জোয়া ও শ্রমিকের—সম্বন্ধ প্রকাশ করে। আমরা পূর্ব্বেই দেখিয়াছি, শ্রমিকের ভরণ-পোষণের দ্রব্যাদির মূল্যদ্বারাই শ্রমশক্তির মূল্য স্থির হয়। পুঁজিপতি সর্ব্বদাই এই মূল্য অপেক্ষা কম মজুরী দিতে চায়। শ্রমিক কি প্রকারে জীবন যাপন করে, পুঁজিপতির সে দিকে লক্ষ্য রাখার প্রয়োজন নাই।
জীবনধারণের দ্রব্যাদির মূল্যদ্বারা শ্রমিকের শ্রমশক্তির মূল্য স্থির হয়। কিন্তু শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান অনেক রকম অবস্থার উপর নির্ভর করে। জীবনযাত্রার
-
বিনিময় প্রথার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পণ্যোৎপাদন বিকাশ লাভ করিয়াছে। পণ্যোৎপাদনের বিকশিত অবস্থায় সরাসরি দুইটী পণ্যের বিনিময় হয় না। পণ্য ক্রয় বিক্রয় হয়, উহাদের মুদ্রায় পরিবর্তিত করা হয়। মূল্যের মুদ্রারূপটি সম্পর্কে ভাল করিয়া জানার পূর্বে আগেকার মূল্যরূপ এবং উহাদের ক্রমিক বিকাশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া আবশ্যক।
উৎপাদন যখন প্রায় সবটাই ছিল স্বাভাবিক, তখন পণ্যে পণ্যে বিনিময় হইত আকস্মিক ভাবে। পণ্যের সহিত পণ্যের বিনিময় হইত পৃথক পৃথক ভাবে। এইরূপ বিনিময়কে বলা যাইতে পারে প্রাথমিক মূল্যরূপ। ২০ গজ বস্ত্র = ১ কোট, অথবা ক পণ্য ব = খ পণ্য দ; এইরূপ সমীকরণের মধ্য দিয়া প্রাথমিক মূল্যরূপের প্রকাশ হয়। বৈজিক সংখ্যায় সমীকরণটীতে ‘ব’ এবং ‘দ’
-
সোভিয়েট ইউনিয়নে শ্রেণীর অস্তিত্ব লোপ পাইয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে শোষণেরও অবসান হইয়াছে। শ্রেণীই যদি না থাকে, তবে শোষণ করিবে কে কাহাকে? শ্রেণীর মূলোচ্ছেদ করাই ছিল ১৯১৭’র নবেম্বর বিপ্লবের লক্ষ্য। ১৯৩৩’এ, দ্বিতীয় পঞ্চ বার্ষিকী পরিকল্পনার সময়ে এই কাজটি সুসম্পূর্ণ হয়। যদিও শ্রেণীহীন সমাজই শ্রমিকের লক্ষ্য তথাপি সংগ্রাম করিয়াই তাহা অর্জন করিতে হইবে। যে-সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম চালাইতে হইবে, প্রথমত শ্রমিকের পক্ষে উহার আসল রূপটি জানিয়া লওয়া অত্যাবশ্যক।
পুঁজিতন্ত্র শ্রেণীর ভিত্তির উপর স্থাপিত। শ্রেণী পুঁজিতন্ত্রের পূর্ববর্ত্তী সমাজ-ব্যবস্থায়ও ছিল। অবশ্য আদিমযুগে শ্রেণী বলিয়া কোন কিছু ছিল না। পুঁজিতন্ত্রের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, পুঁজিতন্ত্র পূর্বেও ছিল, পরেও থাকিবে। কিন্তু পূর্ববর্তী সমাজ-ব্যবস্থাগুলিকে অস্বীকার করা যখন অসুবিধা
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.