বন্দী বিহঙ্গ

বারো মাসের ছটা ঋতু আবু মিয়ার মনে ছত্রিশ রকমের চিন্তা বয়ে আনে। ফাল্গুন যখন বনে বনে রঙ চড়ায়, সে রঙে তারো মনে জাগে নেশা। এর পর জ্যৈষ্ঠের বাউল বাতাস আমের তলায় শুকনো পাতাগুলো ওড়ায়, তারো বুকটা শূন্যতায় খা খা করে ওঠে। কলকাতায় বসে কিছুই দেখছে না সে, কিন্তু যখনি ভাবতে বসেছে, মনে হয়েছে তখনি, তাদের গাঁয়ের পাশে পুকুর পাড়ে আপনি-ফোটা ফুলের বনের অন্তরাগ আর উদাস দুপুরের ঝরাপাতার মড়মড় খসখস শব্দ সবই দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে। বড় বড় দু তলা তিন তলা বাড়িগুলোর উপর দিয়ে যে আকাশটুকু দেখা যায়, তাতে যখন মেঘ করে আসে, আর আসে একটা হাল্কা হাওয়া, তখন আবু মিয়ার বিশেষ করে মনে পড়ে একটি মানুষের কথা। তাদের আকাশ কত বড়ো তাতে যখন ঈশান কোন আঁধার করে মেঘ জমে, পুকুরের জলে নেমে আসে তার কালো ছায়া, অতটুকু ছোট পুকুরের বুকে এত বড় কালো ছায়া ধরে না বুঝি হায়, সে কি তখন খড়ো-ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায় না, তারো কি মনে এমন একটি বড় ছায়া ধরি ধরি করেও উপচে ওঠে না—সে কি অনেক কথা—অনেক দিনের রাতের টুকরো টুকরো অনেক কথা—ভাবে না!

বর্ষার দিনগুলি খুব বড়। বেলা পড়ি পড়ি করেও শেষ হতে চায় না। হাতের কাজ শেষ করে হক-নাহক অনেকগুলো কথা ভাবা যায়। কাজের থেকে মন দুষ্ট ছেলের মতো কাজের অদেখা মাস্টারটিকে পালিয়ে ছুটে যেতে পারে, এবং ঘুরে ফিরে ঝড়ো হাওয়ায় অনেক আম কুড়িয়ে মেঘের কালো ছায়ায় অনেকখানি লুটোপুটি খেয়ে অনেকটা সময় কাটিয়ে এলেও তার বেতের ভয় থাকে। তারপর আসে রমজান মাস—পবিত্র উপবাসের মাস। একটি ভাবি আনন্দের অনির্বচনীয়তার মাঝে উপবাসের ক্লিষ্ট দিনগুলি পূর্ণতায় ভরে ওঠে—একটু পবিত্রতার আমেজে হাতের কাজগুলো জলদি জলদি ফুরিয়ে যায়—দিনগুলি দীর্ঘ মনে হয় না—কাজও ফুরোয় দিনও ফুরোয়, ফুরোয় না কেবল আনন্দের একটা আবেশময় মাধুরিমা। এটা ফুরায় না; একটা বিপুল আনন্দ-সঙ্গমের দিকে এটা ক্রম প্রসারিত হয়ে ছুটে চলে। মুসলিম জগতে ঈদের উৎসব আসে আনন্দের পসরা নিয়ে-তারা আমোদ করে, খায়-দায়, পুণ্য কাজ করে, কিন্তু আবু মিয়ার জীবনে যে ঈদ আসে তার আনন্দের তুলনা হয় না—ঈদ এলে আবু মিয়া পনেরো দিনের ছুটি পায়। সারা বছরে তার এই একটি মাত্র ছুটি।

এবার তার ঈদের ছুটিটাই মাটি হয়ে গেছে। ছুটিতে দেশে যেতে পারেনি। শরীর খারাপ ছিল-হাতের টাকাগুলি ঔষধ আর পথ্যের দাম দিতে দিতেই খরচ হয়ে গেছে; কোথায় পাবে সে গাড়ি ভাড়ার টাকা। আর শুধু-হাতে যাবেই বা কেমন করে!

কিন্তু মানুষের মন বড় ঘাতসহ। একবার আশা-ভঙ্গ হলে আবার সে কোমর বাঁধে। বছরে কেবল একবারই ঈদ আসে। কিন্তু এক বছরেই তো নিঃশেষ হয়ে যায় না। বছরের পিছনে বছর যেমন, তেমনই ছুটির পিছনে ছুটি, সে তো আছেই।

আবু মিয়ার বিস্রস্ত মন গুটিয়ে এনে কাজে বসাতে দেরি হয় না। কিন্তু মুশকিল হয়েছে হেমন্ত-শেষের দিনগুলিকে নিয়ে। বেলা চড়তে না-চড়তেই শেষ হয়ে যায়। শেষ কেবল বেলাটুকুই হয়, হাতের কাজ ফুরোতে চায় না। এই স্বল্পজীবী সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলা আবু মিয়ার মনে হয় রেস-খেলার মতো ক্লান্তিকর। পরাজিত বিপর্যস্ত আবু বিদ্যুতের কড়া আলোতে অনেক রাত অবধি কাজ করে চোখ কচলাতে কচলাতে মেসে গিয়ে ঢুকে। যেন তার মাথা ঘুরছে, কান দুটো কনকন করছে, আর চোখ দুটোতে রীতিমতো ঝাপসা দেখছে।

আবু মিয়ার চিঠিপত্র এই মেসের ঠিকানাতেই আসে। সেদিনও তেমনই একটা চিঠি এসেছে। ঘরের ভেতরে মাথা গলাতে না গলাতেই জনৈক রুম-মেট খবরটা দিলেন। নিশ্চয়ই জমিলার চিঠি। আবু মিয়ার ব্যগ্রতা দুর্বার হয়ে ওঠে।

চিঠিখানা খুব

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice