হাজেরার নির্ব্বাসন
বিহি হাজেরা কাঁদে দূর মরু ময়দানে,
ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ তাঁরে ত্যাজে কোন প্রাণে।
সারা ও হাজেরা বিবি সতীন দুইজন,
হাজেরাকে ইব্রাহিম দেন নির্বাসন;
মরু আরবের ময়দানে একা কাঁদিছে হায়!
ধূ ধূ বালু-পানি হায় নাহি কোন খানে।
‘পানি কোথা পানি দাও’ পানি বলি ফুকারে নারী;
পিপাসায় প্রাণ বাহিরায়—কোথায় বারী।
দেহ পুড়ে যায় সাহারার ‘লু’ হাওয়ায়
আগুন ঢালিছে রোদ প্রাণ বুঝি যায়-
থৈ-থৈ জ্বলে বালু-বালুর সাগর,
মরীচিকা মনে হয় ওই সরোবর,
অভাগী ছুটিয়া যায় পানির সন্ধানে।
নয়নে অশ্রু নাই-দেহ ফেটে লহু বুঝি ঝরে,
এক ফোঁটা পানি দাও—কলিজা বিদরে!
শিশু ইসমাইল পড়ে মাটিতে লুটায়
হাত পা ছুঁড়িয়া শিশু খেলা করে তায়,
পায়ের আঘাতে তার জমিন ফাটিয়া
পানির ঝরনা-ধারা আসে বাহিরিয়া,
হাজেরা শোকর করে খোদা মেহেরবানি।
হাজেরা বিবি সেই ‘আবে জম্ জম্’ পান করে প্রাণ বাঁচালেন।
হযরত ইব্রাহিম একবার ভ্রমণ করতে বেরিয়ে নানা স্থানে ঘুরতে ঘুরতে হারাম দেশে এসে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে কিচুদিন বাস করার পরে সারা খাতুনকে বিবাহ করবার তার সুযোগ ঘটে। আরো কিছুকাল সেখানে কাটিয়ে তিনি মিশর রাজ্যে গিয়ে সেখানকার সুলতানের আতিথ্য গ্রহণ করলেন। সম্রাট তাঁর সৌজন্য ও সহৃদয়তার পরিচয় পেয়ে অতিশয় আকৃষ্ট হলেন এবং তাঁর ধর্মালোচনায় মুগ্ধ হয়ে একান্ত অনুগত হয়ে পড়লেন। কিছুকাল থাকবার পর ইব্রাহিম মিশর ত্যাগ করবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে সম্রাট তাকে বহু ধনরত্ম পারিতোষিক প্রদাণ করেন এবং সেই সঙ্গে একটি পবিত্র-চরিত্রা বাঁদীও তাকে উপহার দেন। সেই বাঁদীটির নাম হাজেরা। হাজেরাকে সঙ্গে নিয়ে নানা দেশ-বিদেশে পরিভ্রমণ করে অবশেষে তিনি প্যালেস্টাইন এসে উপনীত হলেন।
সারা খাতুনের কোন সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করলো না। প্রতিবেশীরা মনে ভাবলেন, তিনি বন্ধ্যা। হযরত ইব্রাহিম পুত্রমুখ দেখতে না পেয়ে মনের কষ্টে দিন কাটান। তাঁকে সর্বদা অতিশয় ম্লান দেখানো। স্বামীর দুঃখ বুঝতে পেরে সারা খাতুন চিন্তাকরলেন, তাঁর নিজের গর্ভে তো সন্তানাদি হলো না। হাজেরার সাথে স্বামীর বিবাহ দিলে হয়তো সকলের মনস্কামনা পূর্ণ হতে পারে।
কথাটা তিনি একদিন প্রসঙ্গক্রমে স্বামীর নিকটে ব্যক্ত করলেন। হযরত ইব্রাহিম অনেকক্ষণ চিন্তা করলেন। অনেক দ্বিধার পর তিনি সারা খাতুনকে খুশী করবার অভিপ্রায়ে অবশেষে স্বীকৃত হলেন। এক শুভক্ষণে ইব্রাহিম বিবি হাজেরার পাণি গ্রহণ করলেন এবং সন্তান কামনা করে খোদাতা’লার অনুগ্রহ প্রার্থনা করলেন।
ভক্তের প্রার্থনা কখনো বিফলে যায় না। খোদাতা’লা তাঁর আরজ মঞ্জুর করলেন। যথাসময়ে ইব্রাহিমের একটি চাঁদের মতো শিশু জন্মগ্রহণ করলে। শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বিষন্নপুরী আনন্দে মশগুল হয়ে উঠলো। শিশুটির নাম রাখা হইল ইসমাইল।
নারীর মন অতি বিচিত্র। যে সন্তানের জন্য সারা খাতুন স্বেচ্ছায় সপত্নী গ্রহণ করলেন চাঁদের মতো সেই সন্তানকে দেখে তাঁর মনে হিংসার উদ্রেক হলো। ক্রমে এমন অবস্থা হলো যে, সতীনের পুত্রকে কিছুতেই তিনি আর বরদাশত করতে পারলেন না। এক বাড়িতে নিজের চোখের সম্মুখে সপত্মীপুত্রকে সহ্য করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠলো। তিনি হযরত ইব্রাহিমকে সর্বদা বিবি হাজেরার দুর্নাম শোনাতে লাগরেন এবং তাদের পরিত্যাগ করবার জন্য স্বামীকে অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু ইব্রাহিম তাঁর অন্যায় আবদার রক্ষা করলেন না।
কিন্তু ভাগ্য যাদের অপ্রসন্ন দুঃখ তাদের সইতেই হয়! শেষ অবধি হাজেরাও খোদার রোষ থেকে রক্ষা পেলেন না। আল্লাহতা’লা ইব্রাহিমকে হাজেরা ও তাঁর পুত্রকে মক্কা নগরীর নিকটে এক মরুভূমিতে নিয়ে গেলেন, তার পর অশ্রুপূর্ণ কণ্ঠে হাজেরাকে বললেন: খোদার হুকুমে তোমাকে এখানে রেখে যাচ্ছি। তাঁর ইচ্ছাই পূর্ণ হোক। এই বলে তিনি এক মশক পানি ও কিছু খেজুর তাঁকে দিয়ে চলে গেলেন। কিছু দূরে গিয়ে প্রার্থনা করলেন: হে খোদা, তোমারই হুকুমে আমার স্ত্রী ও পুত্রকে এস্থানে রেখে যাচ্ছি।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments