বই
কোরাণের গল্প
বন্দে আলী মিয়ার কোরাণের গল্প বইটি ইতিহাস, আখ্যান ও মানবিক বোধের ছোঁয়ার এক জীব আখ্যান। এটি ইসলামী ঐতিহ্যের আলোকে রচিত এক অনন্য গল্পসংকলন। আদি মানব, মহাপ্লাবন, নমরুদের অহংকার কিংবা ইউসুফ ও জুলেখার প্রেম—প্রতিটি গল্পে আছে কোরানের গভীর বার্তা, মানবিক শিক্ষা ও সাহিত্যিক সৌন্দর্য। সহজ ভাষায়, হৃদয়গ্রাহী বর্ণনায় লেখক তুলে ধরেছেন ধর্মীয় আখ্যানের অন্তর্নিহিত মানবিকতা ও নৈতিকতা।
-
মহাপ্লাবনের পর বহু বছর কেটে গেছে।
আরবে আদ নামক একটা জাতি অতিশয় শক্তিশালী হয় উঠেছিলো। তারা খোদাকে মানতো না—ইচ্ছা মতো যা খুশী করতো। কখনো পাথর, কখনো পুতুল, কখনো গাছপালাকে পূজা করতো। খোদাতা’লা তাদের হেদায়েত করার জন্য হুদ (আঃ) কে সৃষ্টি করলেন। হুদ তাদের এই কুকার্য দেখে মনে মনে অতিশয় দুঃখিত হলেন। তিনি আপনার জ্ঞাতিবর্গকে ডেকে বললেন: তোমাদের কুপথ থেকে সৎপথে আনবার জন্য খোদা আমাকে পাঠিয়েছেন। যদি তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান না আন তবে তিনি কঠিন গজব তোমাদের উপরে নাজেল করবেন। তোমরা আল্লাহতা’লার এবাদত করো। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং নিরাকার। তিনি দয়ালু ও মহান।
কাফেররা
-
ইব্রাহিম খলিলুল্লা খোদাতা’লার প্রিয়জন
কোরবানি দেন ইসমাইলে তার সন্তান আপন।
এক রাত্রে তিনি খোয়াব দেখলেন
খোদা যেন তাকে হুকুম করেছেন,
‘ইয়া ইব্রাহিম কোরবানি দে কোরবানি দে’।
(তিনি) তিনি ভোরে উঠে শত উট করলেন জবেহ।
ভাবলেন—খোদার আদেশ হরে সমাপন।
পরের রাতে স্বপন দেখেন হুকুম আল্লাহর
প্রাণের চেয়ে প্রিয় যাহা কোরবাহি দিস তার।
প্রাণের চেয়ে প্রিয়! সে ত অপর কেহ নয়
পুত্র কেবল ইসমাইল জবিউল্লাহ হয়।
ইসমাইলে সঙ্গে নিয়ে ময়দানেতে যান
তাঁরে তিনি বধ করবেন একথা জানান,
শহীদ হবে শুনে পুত্র অতি খুশী হন।
ছুরিহাতে ইব্রাহিম বেঁধে নিলেন আখিঁ,
হয়তো মমতা হবে (খোদার কাজে) আসতে পারে ফাঁকি।
চোখ বেঁধে তাই ছুরি চালন
-
পূর্বে খোদাতা’লার এবাদতের জন্য কোন মসজিদ বা গৃহ নির্দিষ্ট ছিলো না। খোদার আদেশে হযরত ইব্রাহিম সর্বপ্রথম মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই উপাসনা গৃহ নির্মাণ শুধু তিনি ও তাঁহার পুত্র ইসমাইল দু’জনে করেছেন। হযরত ইসমাইল পাথর তুলে দিতেন ও হযরত ইব্রাহিম সেই পাথর দ্বারা দেওয়াল গাঁথতেন। এইরূপে পিতাপুত্রে কাবা ঘরের প্রাচীর নির্মাণ করেন। কিন্তু ইহার ছাদ নির্মাণ তিনি করেননি।
কাবা নির্মাণ করতে বহুদিন সময় লেগেছিলো। এত বেশি দিন লেগেছিলো যে, হযরত ইব্রাহিম যে পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতেন, তার ওপরে তাঁর পায়ের চিহ্ন আঁকা হয়ে গেছে। আজও পর্যন্ত পাথরখানি আছে। হাজিগণ কাবা প্রদক্ষিণের পূর্বে ঐ স্থানে নামাজ পড়ে থাকেন। এর নাম
-
হযরত আদ ও বিবি হাওয়া শয়তাদেরকুচক্রে পড়ে বেহেশতচ্যুত হলেন। তাঁরা আল্লাহতা’লার অভিশাপে পৃথিবীতে এসে বাস করতে লাগলেন। ক্রমে তাঁদের সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করতে লাগলো। হযরত আদমের বংশধরগণের মধ্যে হাবিল ছিলেন অতিশয় ধর্মপ্রাণ। তিনি রাতদিন কেবল খোদার বন্দেগীতে মশগুল হয়ে থাকতেন। অন্য কোন দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিলো না।
ইবলিস আদমের ওপরে হাড়ে হাড়ে চটে ছিলো। সে কেবল সুযোগ খুঁজছিলো কি করে এঁর সন্তানগণকে পথভ্রষ্ট করা যায়। অবশেষে অনেক প্রলোভন দিয়ে কাবিল নামক পুত্রকে আপনার অধীনে আনতে সমর্থ হলো। কাবিল শয়তানের ফেরেরীতে পড়ে মুহুর্তের জন্য ভুলেও একবার আল্লাহতা’লার নাম মুখে আনতো না, বরং দিনে দিনে পাপের পথে অধিক অগ্রসর হতে লাগলো।
একদিন হাবিল
-
অনেকদিন আগের কথা। একদিন হযরত ঈসা সিরিয়ার পথে যেতে যেতে একটা মানুষের মাথার খুলি পড়ে রয়েছে দেখতে পেলেন। সেই খুলিটার সঙ্গে কথা বলবার জন্য তাঁর খেয়াল হলো। তিনি তখনই খোদার দরগায় আরজ করলেন: হে প্রভু আমাকে এই খুলির সঙ্গে কতা বলবার শক্তি দাও।
খোদা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। হযরত ঈসা খুলিকে বললেন: হে অপরিচিত কঙ্কাল, তোমাকে যে কথা জিজ্ঞাসা করবো, তার ঠিক ঠিক উত্তর দাও।
বলবার সঙ্গে সঙ্গে ঈসা শুনতে পেলেন, পরিস্কার ভাষায় সেই খুলিটা ‘কলেমা শাহাদাত’ পাঠ করলো।
ঈসা জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি পুরুষ না স্ত্রী?
খুলি উত্তর করলো: পুরুষ।
ঈসা বললেন: তোমার নাম কি?
খুলি উত্তর করলো: জমজম।
ঈসা
-
তোমরা হয়তো জানো মাটির নিচে সোনা, রূপা, হীরা, মণি-মাণিক্যের খনি এবং সমুদ্রের নিচে ইয়াকুত, জমরদ, প্রবাল ও মুক্তা অনেক আছে। তোমরা শুনে আশ্চর্য হবে যে, এই সবই আগে একজন মাত্র লোকের সম্পত্তি ছিলো।
এত বড়ো ধনী পৃথিবীতে আর একজনও ছিলো না এবং আর কেউ কখনো হবে না। তার সেই ধনসম্পত্তি কিরূপে ছড়িয়ে পড়লো এবং ভূগর্ভে ও সমুদ্রের মধ্যে কেমন করে প্রবেশ করলো সেই আজব কাহিনী আজ তোমাদের কাছে বলবো।
হযরত মুসার জ্ঞাতি সম্পকরঈয় এক চাচাতো ভাই—নাম ছিলো তার কারূণ। কারূণের বরাত ছিল খুব ভাল। দুনিয়ার সব জায়গায় তার মালগুদাম ছিলো। সমস্ত নদীতে ও সমুদ্রে ঝাঁকে ঝাঁকে তার নৌকা ও জাহাজ
-
মাটির দ্বারা প্রস্তুত তুচ্ছ মানব আদমের জন্য আজাযিলের এই দুর্দশা ঘটলো। আজাযিল সেই নিরপরাধ আদমকে জব্দ করবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো।
খোদাতা’লা বেহেশতে বিচিত্র উদ্যান রচনা করে নানারকম সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ সৃষ্টি করলেন। সেই বাগানের দু’টি গাছ সৃষ্ট হলো—তার একটি নাম জীবন-বৃক্ষ, অপরটির নাম জ্ঞান-বৃক্ষ। খোদা আদমকে সেই বাগানে বাস করবার অনুমতি দিলেন। খোদা আদমকে অনুমতি দিলেন—বাগানের সমস্ত গাছের ফল সে খেতে পারে, কিন্তু জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল সে কখনো যেন ভক্ষণ না করে। এই গাছের ফল আহার করামাত্র তার মৃত্যু ঘটবে।
এর পরে অনেক দিন চলে যাবার পর খোদা মনে করলেন আদমেরন একজন সঙ্গিনী সৃষ্টি করা
-
ছামুদ জাতির আরবের অন্তর্গত হজর ও ওয়াদিলকোর অঞ্চলে বাস করতো। তারা পাথর কেটে সুন্দর গৃহ নির্মাণ করতে জানতো। জীবজন্তু মারবার জন্যে পাথর কেটে আশ্চর্য রকম অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করতো। এদের মধ্যে কতক শ্রেণীর লোক পাহাড়ের গুহায় বাস করতো। এরা আল্লাহতা’লাকে মানতো। যা কিছু বড় এবং অদ্ভুত তাদের চক্ষে লাগতো তারই প্রতিমূর্তি পাথর দ্বারা তৈরী করে পূজা করতো। তাছাড়া দিনরাত ঝগড়া ও দাঙ্গাহাঙ্গামা নিয়ে থাকতো। আল্লাহতা’লা তাদের মধ্যে হযরত ছালেহকে নবীরূপে পাঠালেন। হযরত ছালেহ তাদের ডেকে বললেন: ভাইসব খোদা তোমাদের এই মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, আবার এই মাটিতেই লয় করবেন। তাঁর কতা একবার ভেবে দেখ, তিনি ছাড়া তোমাদের কাছে আমি পরমার্থিক আলো
-
বেবিলন দেশের নাম হয়তো তোমরা শুনেছো! সেই দেশের সম্রাট নমরূদ ছিলেন যেমন অহঙ্কারী তেমনি অত্যাচারী। রাজকোষে ছিল তাঁর প্রচুর মণিরত্ন, ধন-ঐশ্বর্য-দেহে বীর্য, অগণিত লোক-মস্কর।
একবার অগণিত সৈন্যসামন্ত নিয়ে তিনি অভিযানে বের হলেন। দেশের পর দেশ তাঁর করায়ত্ত হতে লাগলো। চারদিকে বয়ে গেলো রক্তের নদী—শোনা যেতে লাগলো নিপীড়িতের আর্তনাদ—দুর্বলের হাহাকার—বুকফাটা ক্রন্দন। তবু বিরাম নাই—বিশ্রাম নাই—শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস—জয় আর জয়। গ্রীস, তুরস্ক, আরব, পারস্য ও পাকভারতে তাঁর বিজয়-নিশান উড়তে লাগলো। তিনি হলেন অর্ধ পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি। দম্ভে তাঁর বুক উঠলো ফুলে—দুনিয়াটাকে খেলাঘর বলে তাঁর মনে হতে লাগলো।
একদিন নমরূদ আম-দরবারে বসে অমাত্য-পারিষদ নিয়ে খোশগল্পে মশগুল আছেন, এমন সময়ে একজন ফকির এসে
-
বিহি হাজেরা কাঁদে দূর মরু ময়দানে,
ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ তাঁরে ত্যাজে কোন প্রাণে।
সারা ও হাজেরা বিবি সতীন দুইজন,
হাজেরাকে ইব্রাহিম দেন নির্বাসন;
মরু আরবের ময়দানে একা কাঁদিছে হায়!
ধূ ধূ বালু-পানি হায় নাহি কোন খানে।
‘পানি কোথা পানি দাও’ পানি বলি ফুকারে নারী;
পিপাসায় প্রাণ বাহিরায়—কোথায় বারী।
দেহ পুড়ে যায় সাহারার ‘লু’ হাওয়ায়
আগুন ঢালিছে রোদ প্রাণ বুঝি যায়-
থৈ-থৈ জ্বলে বালু-বালুর সাগর,
মরীচিকা মনে হয় ওই সরোবর,
অভাগী ছুটিয়া যায় পানির সন্ধানে।
নয়নে অশ্রু নাই-দেহ ফেটে লহু বুঝি ঝরে,
এক ফোঁটা পানি দাও—কলিজা বিদরে!
শিশু ইসমাইল পড়ে মাটিতে লুটায়
হাত পা ছুঁড়িয়া শিশু খেলা করে তায়,
পায়ের আঘাতে তার
-
বৃদ্ধ বয়সে বিবি সারা খাতুনের গর্ভে হযতর ইব্রাহিমের এক পুত্র সন্তান জন্মে। তাঁহার নাম ইসরাইল (আঃ)। ইসরাঈলের দুই পুত্র ইয়াশা ও ইয়াকুব। ইয়াকুবের বারোটি পুত্র, তন্মধ্যে একাদশ পুত্র হযরত ইউসুফ। কনিষ্ঠ পুত্রের নাম বনি-ইয়ামিন।
হযরত ইয়াকুব জানতেন যে, ইউসুফ ভবিষ্যৎ জীবনে নবী হবেন। তিনি অতি গুণবান, শ্রী ও লাবণ্যমণ্ডিত ছিলেন। শৈশবেই ইউসুফ ও বনি ইয়ামিন মাতৃহীন হন। নানা কারণে হযরত ইয়াকুব অন্যান্য সন্তান অপেক্ষা ইউসুফকে একটু বেশী আদর যত্ন করতেন। এই জন্য বিমাতার গর্ভে অপর দশজন ভ্রাতা ইউসুফকে একটু ঈর্ষার চক্ষে দেখতেন।
ইউসুফ একদা রাত্রে স্বপ্ন দেখতে পেলেন—সূর্য চন্দ্র ও এগারটি নক্ষত্র তাঁকে যেন অভিবাদন করছে। পরদিন পিতার নিকটে কথাটা
-
অনেক আগের কথা। আরব দেশে সাদ নামে একটি বংশ ছিলো। এই বংশের লোকদের চেহারা ছিলো যেমন খুব লম্বা এবং চওড়া, গায়েও তেমনি ভীষণ শক্তি।
তারাই ছিলো তখন আরব দেশে প্রবল এবং প্রধান।
তাদের একজন বাদশাহ ছিলো—তার নাম শাদ্দাদ। শাদ্দাদ ছিলো সাত মুলুকের বাদশাহ। তার ধন-দৌলতর সীমা ছিলো না। হাজার হাজার সিন্দুকে ভরা মণি, মুক্তা, হীরা জহরৎ। পিলপানায় লক্ষ লক্ষ হাতী, আস্তাবলে অসংখ্য ঘোড়া। সিপাই-শাস্ত্রী যে কত তার লেখাজোকা ছিলো না। উজীর-নাজীর, পাত্র-মিত্র, আমলা-গোমস্তায় তার রঙমহল দিনরাত গম-গম করতো।
সাধারণতঃ মানুষের ধনদৌলত যদি একটু বেশি থেকে থাকে তবে সে একটু অহঙ্কারী হয়ই। শাদ্দাদ বাদশাহের দেমাগ এত বেশী হয়েছিলযে, একদিন সে দরবারে
ক্যাটাগরি
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.