-
সারার পা দুখানা অচল হয়ে পড়ার আগে সে আমাদের কাছেই কাজ করতো। খুবই মোটা ছিল সে আর তার গায়ের রঙ ছিল হালকা হলদেটে-বাদামী, যেন একটা বেলুনের মতো, বেলুন ফোলালে যেমন রঙটা তার হালকা হয়ে যায়, পিগমেন্টের (প্রাণী ও উদ্ভিদের তত্ত্বরঞ্জক পদার্থ বিশেষ) পাতলা স্তরের নিচের মেদ বৃদ্ধি হলে সেটা টানটান হয়ে আরও বেশি পাতলাভাবে ছড়িয়ে যায়। গিল্টি করা ছোট্ট সরু ফ্রেমের চশমা পরতো সে আর ভালো রাঁধুনী ছিল, মাখনের ব্যাপারে শুধু যা তার হাতটা ছিল দরাজ।
তার সম্বন্ধে এই সব জিনিসগুলোই আমরা লক্ষ্য করেছিলাম।
কিন্তু এর ওপর তার ছিল একটি মাত্র স্বামী, আইনসম্মতভাবে তার সঙ্গে গীর্জায় বিবাহিত, আর ছিল তিনটি
-
আরচিল ঘুমোতে পারলো না...। সে হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ছাদের দিকে ক্লান্তভাবে তাকিয়ে চিৎ হয়ে শুচ্ছিলো, নয় তো উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশের মধ্যে তার উত্তপ্ত মুখখানা গুঁজছিলো। চোখ বুজলেই চোখের সামনে ভাসছিলো কেতিনোর পাণ্ডুর মুখখানা। তুষার-ধবল বালিশের গায়ে তার কুচকুচে কালো চুল যেন আরও কালো লাগছিল। তার কালো কালো চোখ দুটো আঁখিপল্লবে ঢাকা, তার ঠোঁট দুটি কাঁপছিল, যেন সে ফিস ফিস করে কিছু বলছে।
আরচিল উঠে বসলো, চোখ খুলে যে ভয়ঙ্কর স্বপ্নগুলো তার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তাদের মন থেকে তাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো।
উদ্বিগ্ন এক মা তার অসুস্থ কন্যার শয্যার উপর ঝুঁকে পড়েছে। নিদ্রাহীন রাতগুলোর পর ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই
-
হোঁচট খেতে খেতে, টলতে টলতে বুড়ো লোকটি বালির রাস্তায় বেয়ে উঠছিল। সরু সরু আগাছা আর ঝোপে ঢাকা নিচু একটা টিলার গা বেয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে রাস্তাটা।
কাছে পিঠের শহরতলি থেকে কাজের শেষে ফেরার মুখে মেরি তাকে পার হয়ে এলো। পিছন থেকে বুড়ো লোকটির ডাকে মেরি থমকে দাঁড়ালো, সে কোন রকমে টলতে টলতে মেরির দিকে এগিয়ে এলো। ছেঁড়া জুতোর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা, রাঙাধুলোর পুরু প্রলেপ মাখা ফাটা ফাটা আঙুলগুলো মেরিকে বলে দিলো লোকটি আসছে বহু দূর থেকে।
“এন’ গুলা!” লোকটি চেঁচিয়ে উঠলো। “হ্যাঁ গো মা, ‘নেটিভ ক্যাম্পে (আদিবাসী শিবির) এন’ গুলা বলে কোনো মেয়ে আছে কিনা জানো?”
“কস্মিন কালে
-
আবু তালেব মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন সাহেব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মাঝে-মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ করাটা পারিবারিক ফরজ হিসেবেই দেখেন। যতদিন দুনিয়াদারির কাজে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন ততদিন সে-কর্তব্যটি ইচ্ছানুযায়ী পালন করতে পারেন নি। আজ তাঁর দায়িত্বের ভার অপেক্ষাকৃতভাবে লঘু হয়েছে বলে সে-কর্তব্য পালনে বাধাবিপত্তিও কমেছে।
সালাহ্উদ্দিন সাহেব যখন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যান তখন তার পূর্ব-আয়োজনটি রীতিমতো সফরের আয়োজনের মতোই মনে হয়। বিনা খবরে ঝট্ করে কারো বাড়িতে তিনি উপস্থিত হন না। দেখা করতে আসবেন বলে আগাম খবর পাঠান দিনকয়েক আগে। সময় প্রহর জানান, সঙ্গে-সঙ্গে এ-কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি চা-মিষ্টি কিছুই গ্রহণ করেন না, পান-দোক্তা তামাকের অভ্যাসও তাঁর নেই। তাছাড়া ডাক্তারের কড়া নির্দেশে পথ্য
-
কারিগর গ্রিগরী পেত্রোভ, একজন অত্যুৎকৃষ্ট শিল্পকারী এবং একজন পাকা মদ্যপ ও নিষ্কর্মা বলে সারা গালচিনো জেলায় যার সুপ্রতিষ্ঠিত খ্যাতি, তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে জেমস্তভো হাসপাতালে। তাকে যেতে হবে ৩০ ভেস্ত (দৈর্ঘ্যের রুশীয়মাপ ১/৩ মাইল) আর পথ খুবই ভয়াবহ; এমন কি ডাক হরকরার পক্ষেও পেরে ওঠা ভার, সেখানে কারিকর গ্রিগরীর মতো একজন অলস মানুষের কথা না বলাই ভালো। একটা কনকনে তীব্র বাতাস তার মুখে এসে লাগছিল। তুষারকণাগুলো বিরাট বিরাট মেঘের আকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল, আকাশ থেকে তৃষার পড়ছে না মাটি থেকে উঠছে তা বোঝা কঠিন হচ্ছিল। তুষারের জন্য মাঠ-ঘাট, টেলিগ্রাফের পোষ্টগুলো কিংবা বনবাদাড়ও দেখা যাচ্ছিল না, আর বিশেষ করে যখন দমকা
-
ঐ আসছে ওরা! সুবিন্যস্তভাবে সারিবদ্ধ হয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে—একটা, আর একটা, তৃতীয়টা—তাদের গায়ে বিড়ালের চোখের মতো সাদা বৃত্ত আর তার মাঝখানে কালো ক্রুশ চিহ্ন আঁকা। পিওতর ফিলিপোভিচ-এর পিছনে দাঁড়িয়ে, প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা নিজের গায়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলো। ঘড় ঘড় শব্দে ট্যাঙ্কগুলি এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পিওতর ফিলিপোভিচ লাফ দিয়ে জানালার ধারের বেঞ্চির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে, জানলার কাঁচের গায়ে মুখ লাগালো ভালো করে দেখবে বলে।
প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা তার সর্বাঙ্গে ক্রুশ চিহ্ন আঁকার পর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার তারের মতো কড়া খসখসে দাড়ির মধ্যে প্রায় দন্তহীন একটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো।
গ্রামের কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে ট্যাঙ্কগুলোর পিছু পিছু সারিবদ্ধভাবে আসছিল বিরাট ট্রাকে জোড়া
-
সে দিন রাত্রে মা আমাদের দোকানে গিয়েছিল আর ফিরে আসেনি। কখনো না। কি হয়েছিল? জানি না। আমার বাবাও একদিন চলে গিয়েছিল, কখনো আর ফিরে আসেনি; কিন্তু বাবা তো গিয়েছিল যুদ্ধে, লড়াই করতে। আমরাও তো যুদ্ধের মধ্যেই ছিলাম, কিন্তু আমরা তো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, আমরা ছিলাম আমাদের দিদিমা আর দাদুর মতোই, আমাদের বন্দুক পিস্তল ছিল না। আমাদের বাবা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, আমাদের সরকার তাদের বলতো—ডাকাত—তারা চারিদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল আর আমরা কুকুর খেদানো মুরগির মতো তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। কোথায় যে পালাবো তা জানতাম না। আমাদের মা দোকানে গিয়েছিল, কে যেন তাকে বলেছিল রান্নার তেল পাওয়া যাবে। আমরাও খুশি হয়েছিলাম
-
বন্যার জল নেমে গেলে নদীর পাশের গরিব মানুষদের আবার গোড়ার থেকে জীবন যাত্রা শুরু করতে হয়।
অবশেষে বন্যার জল নেমে গেল। কর্দমাক্ত মাঠগুলোর মধ্যে দিয়ে একটু করে সরু রশিতে বাঁধা শ্রান্ত একটা গাইকে টেনে নিয়ে চলেছে কৃষ্ণাঙ্গ এক বাপ, কৃষ্ণাঙ্গ এক মা, আর কৃষ্ণাঙ্গ এক শিশু। একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে তারা কাঁধের ওপরের পোঁটলাপুটলিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে রাখলো। যতদূর দৃষ্টি যায় চারিপাশের জমি বন্যার জলে বয়ে আসা পলিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ছোট মেয়েটি শীর্ণ একটা আঙুল তুলে কর্দমাক্ত এক কুটিরের দিকে দেখালো।
“বাবা দেখো। ওই তো আমাদের বাড়ি, তাই না?” আনত কাঁধ, নীল রঙের জীর্ণ ওভার অল (একত্রে সংযুক্ত সার্ট
-
[সামাজিক বৈষম্য, বিশেষ করে বর্ণবৈষম্যের ওপর লিখিত তাঁর গল্পগুলির জন্য সুবিদিত লেখিকা নাডাইন গর্ডিমারের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। পঞ্চাশ দশকে যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা সম্বন্ধে তাঁর জোরালো গল্পগুলি লিখতে আরম্ভ করেন তখন ওটা ঠিক ফ্যাশানও ছিল না বা শ্বেতাঙ্গ শাসনের অবিচারগুলোর কথা প্রকট করা যুক্তিযুক্তও ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাহসের এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি তা ব্যক্ত করে গেছেন। অগণিত ছোটগল্প ছাড়া বেশ কয়েকটি উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। ১৯৯১ সালে সাহিত্যের জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।]
রক্তিম দিগন্তের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে একক সিধা রেল লাইন ধরে সবেগে তাদের দিকে নেমে এলো। স্টেশন মাস্টার তার ছুঁচোলো
-
রাত্রের ট্রেনে যে সব যাত্রীরা রোম ছাড়তো, ফাব্রিয়ানা স্টেশনে তাদের ভোর পর্যন্ত থাকতে হতো তারপর সালমোনার মেল লাইন ধরবার জন্য হেরকালের ছোট্ট একটা লোকাল ট্রেনে করে তাদের যেতে হতো। দমবন্ধ করা, ধোঁয়া ভরা একটা সেকেন্ড ক্লাস গাড়ি, ইতিমধ্যেই পাঁচজন লোক যার মধ্যে রাত কাটিয়েছে, ভোরবেলায় সেটাতে গভীর শোকের পোশাক পরা প্রায় বেঢপ একটা বস্তার মতো এক মহিলাকে টেনে তোলা হলো। তার পিছনে হাঁফাতে হাঁফাতে, কাতরাতে কাতরাতে উঠে এসেছিল তার স্বামী—ছোট্ট এতটুকু এক লোক। রোগাটে আর নিস্তেজ, মুখ তার মড়ার মতো ফ্যাকাশে, চোখগুলো ছোট ছোট আর চকচকে, তাঁকে কেমন যেন সলজ্জ আর অস্থির দেখাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত একটা সীটে বসে পড়ে সে,
-
ম্যাকের সঙ্গে আমার দেখা হয় মেক্সিকোয়—চিহুয়াহুয়া সিটিতে—নববর্ষের পূর্ব সন্ধ্যায়। সে ছিল স্বদেশের এক ঝলক বাতাস, অমার্জিত এক আমেরিকান। আমার মনে পড়ে চী-লীতে একপাত্র টম-আর-জেরির (Tom and Jerry—সুরাসারযুক্ত পানীয় বিশেষ) জন্য হোটেল থেকে আমরা যখন হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছিলাম তখন প্রাচীন ক্যাথিড্রালে মধ্যরাত্রের মাস (Mass)[১]-এর জন্য ফাটা ঘন্টাগুলো উন্মত্তের মতো বাজছিল। আমাদের মাথার ঊর্ধ্বে তপ্ত মরুভূমির তারার দল। সারা শহর জুড়ে কুয়ারটেলগুলো (Cuartels—শিবিরগুলো), যেখানে ভিলার (Villa)[২]সেনাবাহিনী সন্নিবেশিত ছিল সেখান থেকে, নিরাবরণ পাহাড়গুলোর ওপরের সুদূর ছাউনিগুলো থেকে রাস্তাগুলোর রক্ষীদের কাছ থেকে পরম উল্লসিত গুলির শব্দ আসছিল। প্রমত্ত এক অফিসার আমাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফিয়েস্তাকে (Fiesta—উৎসব) ভুল করে
-
কম্পমান বেলে পাথরের সুড়ঙ্গের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে সুবিন্যস্ত অগণিত কলাবাগানগুলো পেরিয়ে চলতে শুরু করলো, বাতাস হয়ে গেলো সেঁতসেঁতে, সমুদ্রের হাওয়া আর তারা পাচ্ছিল না। কামরার জানলা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ধোঁওয়ার একটা প্রবাহ ভেসে এলো। রেল লাইনের সমান্তরাল একটা সরু রাস্তার ওপর সবুজ সবুজ কলার কাঁদি ভর্তি বলদের সব গাড়ি। রাস্তার ওপাশে অকর্ষিত জমির ওপর ইতঃস্ততভাবে ছাড় দিয়ে দিয়ে তৈরি ইলেকট্রিক পাখা দেওয়া অফিসগুলো, লাল ইঁটের সব ইমারত, ধুলো মাখা তাল গাছ, গোলাপের ঝোপগুলোর মাঝে ছাদের ওপর সাদা রঙের ছোট ছোট টেবিল চেয়ার সাজানো বসতবাড়িগুলো। বেলা তখন এগারোটা, তাপটা তখনও প্রখর হতে শুরু করেনি।
“জানালাটা বন্ধ করো,” মহিলাটি বললে। “মাথাটা
ক্যাটাগরি
লেখক
- অ্যাগনেস স্মেডলি (১)
- আন্তন চেখভ (১)
- আমা আতা আইদু (১)
- আলেক্সেই তলস্তয় (১)
- ইভোন ভেরা (১)
- এলবার্ট মালজ (১)
- ওয়ান্ডা ওয়াসিলেস্কা (১)
- কনস্তানতিন লর্তকিপানিৎজে (১)
- ক্যাথারিন সুসানাহ প্রিচার্ড (১)
- গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১)
- গিয়োরগি শাটবেরাশভিলি (১)
- জন রিড (১)
- নাডিন গর্ডিমার (৩)
- পাভেল লিডভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ভ্যালেনটিনা ডিমিট্রিয়েভা (১)
- মাও টুন (১)
- মিখাইল শলোখভ (২)
- ম্যাক্সিম গোর্কি (২)
- রিচার্ড রাইট (১)
- লুইজি পিরানদেল্লো (১)
- সিনডিউই ম্যাগোনা (১)
- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (৯)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.