-
হোঁচট খেতে খেতে, টলতে টলতে বুড়ো লোকটি বালির রাস্তায় বেয়ে উঠছিল। সরু সরু আগাছা আর ঝোপে ঢাকা নিচু একটা টিলার গা বেয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে রাস্তাটা।
কাছে পিঠের শহরতলি থেকে কাজের শেষে ফেরার মুখে মেরি তাকে পার হয়ে এলো। পিছন থেকে বুড়ো লোকটির ডাকে মেরি থমকে দাঁড়ালো, সে কোন রকমে টলতে টলতে মেরির দিকে এগিয়ে এলো। ছেঁড়া জুতোর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা, রাঙাধুলোর পুরু প্রলেপ মাখা ফাটা ফাটা আঙুলগুলো মেরিকে বলে দিলো লোকটি আসছে বহু দূর থেকে।
“এন’ গুলা!” লোকটি চেঁচিয়ে উঠলো। “হ্যাঁ গো মা, ‘নেটিভ ক্যাম্পে (আদিবাসী শিবির) এন’ গুলা বলে কোনো মেয়ে আছে কিনা জানো?”
“কস্মিন কালে
-
রাস্তার ধারে ধুলোভারাচ্ছন্ন বৈঠকখানায় বসে খানবাহাদুর মোত্তালেব সাহেব ভাবেন। ভাবেন যে সে-কথা তাঁর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চোখের নিচে মাংসের থলে। বড় গোছের চোখ দুটো তার মধ্যে ভারি দেখায়। অনেকটা মার্বেলের মতো। তাও ড্রেনের কোণে হারিয়ে যাওয়া নিশ্চল মার্বেল।
তিনি তাঁর বয়সের কথা ভাবেন। তাঁর সমগ্র মাথায় আজ পক্ককেশ, কিন্তু তার জন্যে বয়সকে দোষ দেওয়া যায় না। বিস্তারিত ওকালতি ব্যবসা সৃষ্টি করবার জন্যে যে কঠোর শ্রম করেছেন বছরের পর বছর, সে-শ্রমই পক্ককেশের জন্যে দায়ী। পক্ককেশ মিথ্যার একটি প্রলেপ মাত্র। এ কথা ঠিক যে, যারা তাঁর বয়সের কথা জানে না এবং চুলের অকালপক্বতার খোঁজ রাখে না, তারা তাঁকে বৃদ্ধ বলেই
-
ম্যাকের সঙ্গে আমার দেখা হয় মেক্সিকোয়—চিহুয়াহুয়া সিটিতে—নববর্ষের পূর্ব সন্ধ্যায়। সে ছিল স্বদেশের এক ঝলক বাতাস, অমার্জিত এক আমেরিকান। আমার মনে পড়ে চী-লীতে একপাত্র টম-আর-জেরির (Tom and Jerry—সুরাসারযুক্ত পানীয় বিশেষ) জন্য হোটেল থেকে আমরা যখন হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছিলাম তখন প্রাচীন ক্যাথিড্রালে মধ্যরাত্রের মাস (Mass)[১]-এর জন্য ফাটা ঘন্টাগুলো উন্মত্তের মতো বাজছিল। আমাদের মাথার ঊর্ধ্বে তপ্ত মরুভূমির তারার দল। সারা শহর জুড়ে কুয়ারটেলগুলো (Cuartels—শিবিরগুলো), যেখানে ভিলার (Villa)[২]সেনাবাহিনী সন্নিবেশিত ছিল সেখান থেকে, নিরাবরণ পাহাড়গুলোর ওপরের সুদূর ছাউনিগুলো থেকে রাস্তাগুলোর রক্ষীদের কাছ থেকে পরম উল্লসিত গুলির শব্দ আসছিল। প্রমত্ত এক অফিসার আমাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফিয়েস্তাকে (Fiesta—উৎসব) ভুল করে
-
কম্পমান বেলে পাথরের সুড়ঙ্গের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে সুবিন্যস্ত অগণিত কলাবাগানগুলো পেরিয়ে চলতে শুরু করলো, বাতাস হয়ে গেলো সেঁতসেঁতে, সমুদ্রের হাওয়া আর তারা পাচ্ছিল না। কামরার জানলা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ধোঁওয়ার একটা প্রবাহ ভেসে এলো। রেল লাইনের সমান্তরাল একটা সরু রাস্তার ওপর সবুজ সবুজ কলার কাঁদি ভর্তি বলদের সব গাড়ি। রাস্তার ওপাশে অকর্ষিত জমির ওপর ইতঃস্ততভাবে ছাড় দিয়ে দিয়ে তৈরি ইলেকট্রিক পাখা দেওয়া অফিসগুলো, লাল ইঁটের সব ইমারত, ধুলো মাখা তাল গাছ, গোলাপের ঝোপগুলোর মাঝে ছাদের ওপর সাদা রঙের ছোট ছোট টেবিল চেয়ার সাজানো বসতবাড়িগুলো। বেলা তখন এগারোটা, তাপটা তখনও প্রখর হতে শুরু করেনি।
“জানালাটা বন্ধ করো,” মহিলাটি বললে। “মাথাটা
-
আরচিল ঘুমোতে পারলো না...। সে হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ছাদের দিকে ক্লান্তভাবে তাকিয়ে চিৎ হয়ে শুচ্ছিলো, নয় তো উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশের মধ্যে তার উত্তপ্ত মুখখানা গুঁজছিলো। চোখ বুজলেই চোখের সামনে ভাসছিলো কেতিনোর পাণ্ডুর মুখখানা। তুষার-ধবল বালিশের গায়ে তার কুচকুচে কালো চুল যেন আরও কালো লাগছিল। তার কালো কালো চোখ দুটো আঁখিপল্লবে ঢাকা, তার ঠোঁট দুটি কাঁপছিল, যেন সে ফিস ফিস করে কিছু বলছে।
আরচিল উঠে বসলো, চোখ খুলে যে ভয়ঙ্কর স্বপ্নগুলো তার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তাদের মন থেকে তাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো।
উদ্বিগ্ন এক মা তার অসুস্থ কন্যার শয্যার উপর ঝুঁকে পড়েছে। নিদ্রাহীন রাতগুলোর পর ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই
-
"শত্রুকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতে না শিখলে তাকে পরাজিত করা যায় না।"
[জে স্তালিন, এ অর্ডার অব দ্য ডে, মে ডে ১৯৪২, পিপলস কমিসার অব ডিফেন্স, ইউএসএসআর]
যুদ্ধের সময় মানুষের মতো গাছদেরও নিজ নিজ ভাগ্য থাকে। আমি দেখেছি বিশাল এক বনভূমিকে আমাদের কামানের গোলায় ধ্বংস হয়ে যেতে। খুবই সম্প্রতি, অমুক গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে জার্মানরা এখানে বেশ ভালোভাবে গেড়ে বসেছিল, ভেবেছিল বহুদিন থাকবে এখানে, কিন্তু গাছগুলোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু তাদেরও ধ্বংস করে দিয়েছিল। ভাঙা গুঁড়িগুলোর তলায় মৃত জার্মানরা পড়েছিল, ফার্ন আর ব্র্যাকেন-এর সজীব শ্যামলিমার মধ্যে তাদের খণ্ডবিখণ্ড দেহগুলো পচছিল; কামানের গোলায় বিদীর্ণ পাইন গাছগুলোর আঠার সুগন্ধ ঐসব পচা দেহগুলোর শ্বাসরুদ্ধ
-
বন্যার জল নেমে গেলে নদীর পাশের গরিব মানুষদের আবার গোড়ার থেকে জীবন যাত্রা শুরু করতে হয়।
অবশেষে বন্যার জল নেমে গেল। কর্দমাক্ত মাঠগুলোর মধ্যে দিয়ে একটু করে সরু রশিতে বাঁধা শ্রান্ত একটা গাইকে টেনে নিয়ে চলেছে কৃষ্ণাঙ্গ এক বাপ, কৃষ্ণাঙ্গ এক মা, আর কৃষ্ণাঙ্গ এক শিশু। একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে তারা কাঁধের ওপরের পোঁটলাপুটলিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে রাখলো। যতদূর দৃষ্টি যায় চারিপাশের জমি বন্যার জলে বয়ে আসা পলিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ছোট মেয়েটি শীর্ণ একটা আঙুল তুলে কর্দমাক্ত এক কুটিরের দিকে দেখালো।
“বাবা দেখো। ওই তো আমাদের বাড়ি, তাই না?” আনত কাঁধ, নীল রঙের জীর্ণ ওভার অল (একত্রে সংযুক্ত সার্ট
-
যখন বৃষ্টি পড়ে (ইমেরেতিতে মার্চ-এপ্রিল মাসে বরাবরই বৃষ্টি হয়) আর রিয়োনির ঝোপগুলো থেকে বাতাস পীচ আর বুনো প্লাম ফুলের গন্ধ আনে, ছোট্ট ৎসাবুনিয়া তার মাকে জিজ্ঞাসা করে, “মা, তোমার চাদরটা কি আমি গায়ে দিতে পারি?”
“হ্যাঁ, বাছা।”
ৎসাবুনিয়া পুরোনো বাক্স থেকে ওটাকে টেনে বার করলো, পাখির পালকের মতো চাদরটা বাতাসে সাদা পায়রার মতো উড়তে লাগলো।
ৎসাবুনিয়া চাদর দিয়ে নিজেকে এমন আঁট সাঁট ভাবে জড়িয়ে নিলো যে শুধু তার মেছেতার দাগ ওয়ালা ছোট্ট নাকটি আর তার আগুনে সেঁকা লাল লাল পাগুলো দেখা যেতে লাগলো। বাচ্চা মেয়েটির জন্য তার বাপের গলোশগুলো (বৃষ্টি বাদল থেকে বাঁচাবার জন্য জুতোর ওপর পরবার একরকম জুতো) পাপোষের
-
[ভ্যালেনটিনা আইয়োভোভনা ডিমিট্রিয়েভা (১৮৫৯-১৯৪৭) সারাটোভ গুরেবিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন ভূমিদাসের কন্যা। গ্রামার স্কুলে শিক্ষালাভ করে চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষার জন্য ১৮৮৬ সালে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গে যান। গ্রামের একটি স্কুলে শিক্ষকতাকালে জনশিক্ষা ব্যবস্থার শোচনীয় অবস্থার সমালোচনা করে তিনি পত্রপত্রিকায় নানা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এর ফলে তার চাকরি যায় এবং শিক্ষকতা করার ব্যাপারে তার ওপর চিরকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর পর বহুকাল ধরে তিনি ভোরোনেজ গুবেরনিয়ায় চিকিৎসক হিসাবেই খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেন।
বহু ঐতিহাসিক ঘটনার তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী এবং অংশগ্রহণকারী। ছাত্রদের বৈপ্লবিক মিছিলগুলিতে যোগদান করার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ম্যাক্সিম গোর্কি, লিওনিড অ্যানড্রাইয়েভ
-
কারিগর গ্রিগরী পেত্রোভ, একজন অত্যুৎকৃষ্ট শিল্পকারী এবং একজন পাকা মদ্যপ ও নিষ্কর্মা বলে সারা গালচিনো জেলায় যার সুপ্রতিষ্ঠিত খ্যাতি, তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে জেমস্তভো হাসপাতালে। তাকে যেতে হবে ৩০ ভেস্ত (দৈর্ঘ্যের রুশীয়মাপ ১/৩ মাইল) আর পথ খুবই ভয়াবহ; এমন কি ডাক হরকরার পক্ষেও পেরে ওঠা ভার, সেখানে কারিকর গ্রিগরীর মতো একজন অলস মানুষের কথা না বলাই ভালো। একটা কনকনে তীব্র বাতাস তার মুখে এসে লাগছিল। তুষারকণাগুলো বিরাট বিরাট মেঘের আকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল, আকাশ থেকে তৃষার পড়ছে না মাটি থেকে উঠছে তা বোঝা কঠিন হচ্ছিল। তুষারের জন্য মাঠ-ঘাট, টেলিগ্রাফের পোষ্টগুলো কিংবা বনবাদাড়ও দেখা যাচ্ছিল না, আর বিশেষ করে যখন দমকা
-
সারার পা দুখানা অচল হয়ে পড়ার আগে সে আমাদের কাছেই কাজ করতো। খুবই মোটা ছিল সে আর তার গায়ের রঙ ছিল হালকা হলদেটে-বাদামী, যেন একটা বেলুনের মতো, বেলুন ফোলালে যেমন রঙটা তার হালকা হয়ে যায়, পিগমেন্টের (প্রাণী ও উদ্ভিদের তত্ত্বরঞ্জক পদার্থ বিশেষ) পাতলা স্তরের নিচের মেদ বৃদ্ধি হলে সেটা টানটান হয়ে আরও বেশি পাতলাভাবে ছড়িয়ে যায়। গিল্টি করা ছোট্ট সরু ফ্রেমের চশমা পরতো সে আর ভালো রাঁধুনী ছিল, মাখনের ব্যাপারে শুধু যা তার হাতটা ছিল দরাজ।
তার সম্বন্ধে এই সব জিনিসগুলোই আমরা লক্ষ্য করেছিলাম।
কিন্তু এর ওপর তার ছিল একটি মাত্র স্বামী, আইনসম্মতভাবে তার সঙ্গে গীর্জায় বিবাহিত, আর ছিল তিনটি
-
রাত্রের ট্রেনে যে সব যাত্রীরা রোম ছাড়তো, ফাব্রিয়ানা স্টেশনে তাদের ভোর পর্যন্ত থাকতে হতো তারপর সালমোনার মেল লাইন ধরবার জন্য হেরকালের ছোট্ট একটা লোকাল ট্রেনে করে তাদের যেতে হতো। দমবন্ধ করা, ধোঁয়া ভরা একটা সেকেন্ড ক্লাস গাড়ি, ইতিমধ্যেই পাঁচজন লোক যার মধ্যে রাত কাটিয়েছে, ভোরবেলায় সেটাতে গভীর শোকের পোশাক পরা প্রায় বেঢপ একটা বস্তার মতো এক মহিলাকে টেনে তোলা হলো। তার পিছনে হাঁফাতে হাঁফাতে, কাতরাতে কাতরাতে উঠে এসেছিল তার স্বামী—ছোট্ট এতটুকু এক লোক। রোগাটে আর নিস্তেজ, মুখ তার মড়ার মতো ফ্যাকাশে, চোখগুলো ছোট ছোট আর চকচকে, তাঁকে কেমন যেন সলজ্জ আর অস্থির দেখাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত একটা সীটে বসে পড়ে সে,
ক্যাটাগরি
লেখক
- অ্যাগনেস স্মেডলি (১)
- আন্তন চেখভ (১)
- আমা আতা আইদু (১)
- আলেক্সেই তলস্তয় (১)
- ইভোন ভেরা (১)
- এলবার্ট মালজ (১)
- ওয়ান্ডা ওয়াসিলেস্কা (১)
- কনস্তানতিন লর্তকিপানিৎজে (১)
- ক্যাথারিন সুসানাহ প্রিচার্ড (১)
- গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১)
- গিয়োরগি শাটবেরাশভিলি (১)
- জন রিড (১)
- নাডিন গর্ডিমার (৩)
- পাভেল লিডভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ভ্যালেনটিনা ডিমিট্রিয়েভা (১)
- মাও টুন (১)
- মিখাইল শলোখভ (২)
- ম্যাক্সিম গোর্কি (২)
- রিচার্ড রাইট (১)
- লুইজি পিরানদেল্লো (১)
- সিনডিউই ম্যাগোনা (১)
- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.