-
গুরুদয়ালের পায়ে ব্যথা, হাঁটিতে কষ্ট হয়। তবু না হাঁটিলে বুঝি তার চলে না? সকালবেলা বাহির হইয়া যায়। কোনোদিন দুপুরে ফিরে, কোনোদিন ফিরেও না। কোনোদিন সূর্যের অস্তগমনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে ফিরে, ফিরিয়া হয়তো অপরিচ্ছন্ন বিছানাটা হাতড়াইয়া দেশলাই বাহির করিয়া 'ডিবা' জ্বালিল, না-হয় তো বাড়ির পূব দিককার নিমগাছটার তলায় হাত-পা ছড়াইয়া দিয়া গান ধরিল:
রাধে, রাধে গো রাধে,
তোর লাগি মোর পরাণ কাঁদে;
নইলে কি আর কালো শশী
অতি সাধের চূড়া বাঁশী
অই চরণে তুলে দিল সাধে,
রাধে, রাধে গো রাধে...
বাড়ির একমাত্র অধীশ্বর সে। সে ছাড়া এবাড়িতে আর একটিও জীবন্ত প্রাণী নাই। কাজেই তার এই স্বেচ্ছাচারিতা। কেহই বাধা দেয় না।
প্রতিবেশীদের
-
মেঘনার পাড় ভেঙে একটা শাখানদী বেরিয়েছিল। তার নাম তিতাস। এখন সে বেশ বড় নদী। আমরা তারই তীরে বাস করি। তার জলের কিনারায় লগি গেড়ে আমরা নাওগুলো বেঁধে রাখি। তার পাড়ের মাটিতে ঘাসের উপর বাঁশের "আড়া" বেঁধে আমরা জালগুলো শুকোতে দিই। পল্লির ভেতর থেকে যে-পথ ঘাটে গিয়ে ঠেকেছে, তারই একপাশে মাটিতে গর্ত করে আমরা জালে গাব দিই, আরেক পাশে ডাঙায় তুলে আমরা না'য়ে দিই আলকাতরা।
আমরা এক সংসারে দুই ভাই। দাদা আর আমি। আমি ধরি মাছ, দাদা করে মাছের ব্যাপার। আমি নদীতে জাল ফেলি, জাল তুলি, রাজপুরে ঘাটে নিয়ে সে-মাছ নগদ দামে বেচে আসি। দাদা না'য়ে না'য়ে ঘুরে তার মাছের ডালি
-
লাইট হাউস
জাহাজ ধীরে ধীরে সাগরে গিয়ে পড়ল। টের পেলুম না, কখন, কি করে সাগরে এসে গেছি। তীরের উপর চোখ রেখে চলছিলুম—সেই তটরেখা এক সময় চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল—স্বপ্ন যে ভাবে মিলিয়ে যায়—তেমনি ধীরে ধীরে।
যাত্রীদের দিকে তাকালে করুণা জাগে—এত বড় একটা সাগর, যার সঙ্গে মিশেছে মহাসাগর—দুনিয়ার সকল মহাসাগরের সঙ্গে যার যোগাযোগ—তার সম্বন্ধে তারা একান্তই উদাসীন। চোখ খুলে তাকাবারও যেন গরজ নেই কারো। বিরাট একখানা উপন্যাসের মত জাহাজটা সাঁতার কেটে চলেছে। তার ভেতরে অনেক চরিত্র, অনেক চঞ্চলতা, অনেক উপাখ্যান—আপনাতে আপনি মশগুল তারা, বাইরের দিকে বড় একটা কেউ তাকায় না—তাকালেই যেন তাদের জীবনের ছন্দপতন হয়ে যাবে। উপন্যাস এগিয়ে চলেছে নিজের
-
পুঁজির দুইটা ভাগ; একটী অপরিবর্ত্তমান অংশ, অপরটী পরিবর্ত্তমান অংশ। প্রথমটীর দ্বারা উৎপাদনের উপকরণাদি ক্রয় করা হয়; দ্বিতীয়টীর দ্বারা শ্রমশক্তি ক্রয় করা হয়। এই দুই অংশের পরস্পর অনুপাত দ্বারা পুঁজির গড়ন নির্দ্ধারিত হইয়া থাকে। মার্কস্ ইহার আখ্যা দিয়াছেন ‘অর্গেনিক কম্পোজিশন’। পৃথক পৃথক শিল্পগুলির পৃথক পৃথক ‘অর্গেনিক কম্পোজিশন’ থাকিতে পারে। কিন্তু যে-কোন শিল্পে—উহার অর্ন্তভুক্ত পৃথক পৃথক কারখানাগুলির অর্গেনিক কম্পোজিশনের তারতম্য সত্ত্বেও-একটা গড়পড়তা অর্গেনিক কম্পোজিশন থাকে। বিভিন্ন শিল্পগুলির অর্গেনিক কম্পোজিশনের একটী গড় বাহির করিয়া আমরা সমাজের মোট পুঁজিরও একটা গড়পড়তা অর্গেনিক কম্পোজিশন নির্দ্ধারণ করিতে পারি।
পুঁজির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুঁজির পরিবর্ত্তমান অংশ বাড়িতে থাকে। প্রতিবারেই উদ্বৃত্ত মূল্য অতিরিক্ত পুঁজিরূপে খাটে; উহার একটি অংশদ্বারা
-
পুঁজির একটু সূক্ষ্ম বিচার প্রয়োজন। পুঁজিপতি যে শ্রমিককে শোষণ করিতে পারে উহার একমাত্র কারণ পুঁজিতন্ত্রের অধীনে সমাজের সমন্ত সম্পত্তি কতিপয়ের হস্তগত। উৎপাদনের এবং জীবন ধারণের সমস্ত উপকরণ বুর্জোয়ার দখলে, শ্রমিকের হাতে কিছুই নাই। সমাজের সম্পত্তির উপর বুর্জোয়ার এই একচেটিয়া দখলের দরুন নিঃস্ব শ্রমিক তাহার শ্রমশক্তি বিক্রয় করিতে বাধ্য হয়।
উৎপাদনের উপকরণ বলিতে আমরা কি বুঝি? এক কথায়, যাহা দ্বারা আমরা কাজ করি তাহাই উৎপাদনের উপকরণ। এই উপকরণগুলির আবার বিভিন্ন অংশ। প্রথমত, শ্রম করার যন্ত্র—ইহা তাঁতীর সামান্য তাঁত হইতে পারে, আবার ফ্যাক্টরীর জটিল কলকব্জাও হইতে পারে। তারপর কাঁচামাল; জুতার কাঁচামাল চামড়া, কাপড়ের কাঁচামাল সূতা আবার সূতার কাঁচামাল তুলা। কাজের জন্য আরো
-
শ্রমিককে শিক্ষা দিয়াছেন ও সচেতন করিয়া তুলিয়াছেন মার্ক্স, এঙ্গেলস্, লেনিন ও স্টালিন। ইহাদের শিক্ষা ও মত মার্ক্স-লেনিনবাদ্ নামে পরিচিত। মার্ক্স-লেনিনবাদ পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শ্রমিকের হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র; সমাজতন্ত্র গড়িয়া তোলায়ও ইহা সহায়ক।
সমাজবাদের আলোচনা মার্ক্সের পূর্ব্বেও হইয়াছে। কিন্তু সে আলোচনা ছিল একেবারেই মনগড়া। মার্ক্সই প্রথম ইহাকে বিজ্ঞানের রূপ দেন। মুষ্টিমেয় ধনিক কিরূপে শ্রমিককে শোষণ করিতেছে, কিরূপে তাহারা ভূমি, খনি, কলকারখানার উপর একচেটিয়া অধিকার বিস্তার করিয়াছে এবং ছোট ছোট উৎপাদনগুলিকে উচ্ছেদ করিয়া বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠা করিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে সমাজতন্ত্রেরও ভিত্তি গড়িয়া তুলিয়াছে এ সকল আলোচনা মার্ক্সই প্রথম করেন। মার্ক্স শুধু পুঁজিতন্ত্রের স্বরূপই খুলিয়া ধরেন নাই, শ্রেণী-সংঘর্ষ কি তাহাও শিখাইয়াছেন।
-
বর্ত্তমান গ্রন্থের ভিত্তি লিওন্টিয়েভের অর্থনীতি ও কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’। অতএব বলা নিষ্প্রয়োজন, এই গ্রন্থ বুর্জোয়া অর্থনীতির পন্থানুসরণে লিখিত হয় নাই। প্রশ্ন হইতে পারে, অর্থনীতি যদি বিজ্ঞানই হয় তবে উহার শ্রেণীবিভাগ কিরূপে সম্ভব?
বুর্জোয়া অর্থনীতি ও মার্ক্সের অর্থনীতির প্রভেদ মূলগত। মার্ক্সের অর্থনীতি বস্তুতন্ত্রবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। বুর্জোয়া পণ্ডিতগণ বলেন, অভাববোধই অর্থনৈতিক জীবনের গোড়ার কথা। মার্ক্স বলেন, অভাববোধ কখনো বস্তুনিরপেক্ষ হইতে পারে না। মোটর গাড়ী আছে বলিয়াই তাহা ব্যবহার করার ইচ্ছা হয়। মার্ক্সের মতে উৎপাদন ও উৎপাদন-ব্যবস্থার বিশ্লেষণই অর্থনীতির প্রাথমিক কর্ত্তব্য।
বুর্জোয়া পণ্ডিতগণের মতে অর্থনীতি সর্বকালের উপযোগী একটিমাত্র শাস্ত্র। ইহারা অর্থনীতির আপেক্ষিকতা ও ঐতিহাসিক দিকটী অস্বীকার করিয়াছেন। বুর্জোয়া পণ্ডিতগণ পুঁজি-সমাজকে স্বাভাবিক, শাশ্বত প্রতিপন্ন
-
সন্ধ্যার কিছু আগে নীরেন ট্রেন হইতে নামিল। তাহার জানা ছিল না এমন একটা ছোট্ট স্টেশন তাদের দেশের। কখনো সে বাংলা দেশে আসে নাই ইতিপূর্বে এক কলিকাতা ছাড়া।
নীরেনের দাদামশাই রায়বাহাদুর শ্যামাচরণ গাঙ্গুলী তাহাকে বলিয়া দিয়াছিলেন বাংলা দেশের পল্লিগ্রামে গিয়া সে যেন জল না-ফুটাইয়া খায় না, মশারি ছাড়া শোয় না, নদীর জলে না-স্নান করিয়া তোলা জলে স্নান করে। নীরেনের স্বাস্থ্যটি বেশ চমৎকার, ডাম্বেল মুগুর ভাঁজিয়া শরীরটাকে সে শক্ত করিয়া তুলিয়াছে, বড়োলোকের দৌহিত্র, অভাব-অনটন কাহাকে বলে জানে না। মনে নীরেনের বিপুল উৎসাহ। চোখের স্বপ্ন এখনও কাঁচা, সবুজ।
একটা লোক প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে দাঁড়াইয়া প্ল্যাটফর্মে সাজানো দূর্বাঘাসের ওপর গোরু ছাড়িয়া দিয়া গোরুর দড়ি হাতে
-
মাটির দ্বারা প্রস্তুত তুচ্ছ মানব আদমের জন্য আজাযিলের এই দুর্দশা ঘটলো। আজাযিল সেই নিরপরাধ আদমকে জব্দ করবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো।
খোদাতা’লা বেহেশতে বিচিত্র উদ্যান রচনা করে নানারকম সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ সৃষ্টি করলেন। সেই বাগানের দু’টি গাছ সৃষ্ট হলো—তার একটি নাম জীবন-বৃক্ষ, অপরটির নাম জ্ঞান-বৃক্ষ। খোদা আদমকে সেই বাগানে বাস করবার অনুমতি দিলেন। খোদা আদমকে অনুমতি দিলেন—বাগানের সমস্ত গাছের ফল সে খেতে পারে, কিন্তু জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল সে কখনো যেন ভক্ষণ না করে। এই গাছের ফল আহার করামাত্র তার মৃত্যু ঘটবে।
এর পরে অনেক দিন চলে যাবার পর খোদা মনে করলেন আদমেরন একজন সঙ্গিনী সৃষ্টি করা
-
হযরত আদম আলাইহিস সালামের বংশধরগণ ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর চারিদিকে পরিব্যপ্ত হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু ধর্মের প্রতি, আল্লাহতা’লার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণই ছিলো না। তারা দিনে দিনে অনাচারী ও পাপাচারী হয়ে উঠতে লাগলো। শেষে এমন অবস্থা হলো—পরশ্রীকাতরতা, পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা, ঝগড়া ও মারামারি তাদের নিত্য-নৈমিত্তিক কর্মের মধ্যে পরিগণিত হয়ে পড়লো। সর্বদা পাপাচরণ করা এবং পাপকার্যে ডুবে থাকা তাদের প্রকৃতি হয়ে উঠলো। তাদের ধর্মপথে আনবার জন্য আল্লাহতা’লা নূহ নবীকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি নানা ধর্মোপদেশ দিয়ে তাদের সৎপথে আনবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলেন; কিন্তু কেউ তাঁর কথায় কর্ণপাত মাত্র করলো না। বরঞ্চ হাসি-মস্করা করে এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তাঁকে বেয়াকুব বানাবার চেষ্টা করতে
-
বেবিলন দেশের নাম হয়তো তোমরা শুনেছো! সেই দেশের সম্রাট নমরূদ ছিলেন যেমন অহঙ্কারী তেমনি অত্যাচারী। রাজকোষে ছিল তাঁর প্রচুর মণিরত্ন, ধন-ঐশ্বর্য-দেহে বীর্য, অগণিত লোক-মস্কর।
একবার অগণিত সৈন্যসামন্ত নিয়ে তিনি অভিযানে বের হলেন। দেশের পর দেশ তাঁর করায়ত্ত হতে লাগলো। চারদিকে বয়ে গেলো রক্তের নদী—শোনা যেতে লাগলো নিপীড়িতের আর্তনাদ—দুর্বলের হাহাকার—বুকফাটা ক্রন্দন। তবু বিরাম নাই—বিশ্রাম নাই—শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস—জয় আর জয়। গ্রীস, তুরস্ক, আরব, পারস্য ও পাকভারতে তাঁর বিজয়-নিশান উড়তে লাগলো। তিনি হলেন অর্ধ পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি। দম্ভে তাঁর বুক উঠলো ফুলে—দুনিয়াটাকে খেলাঘর বলে তাঁর মনে হতে লাগলো।
একদিন নমরূদ আম-দরবারে বসে অমাত্য-পারিষদ নিয়ে খোশগল্পে মশগুল আছেন, এমন সময়ে একজন ফকির এসে
-
বিহি হাজেরা কাঁদে দূর মরু ময়দানে,
ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ তাঁরে ত্যাজে কোন প্রাণে।
সারা ও হাজেরা বিবি সতীন দুইজন,
হাজেরাকে ইব্রাহিম দেন নির্বাসন;
মরু আরবের ময়দানে একা কাঁদিছে হায়!
ধূ ধূ বালু-পানি হায় নাহি কোন খানে।
‘পানি কোথা পানি দাও’ পানি বলি ফুকারে নারী;
পিপাসায় প্রাণ বাহিরায়—কোথায় বারী।
দেহ পুড়ে যায় সাহারার ‘লু’ হাওয়ায়
আগুন ঢালিছে রোদ প্রাণ বুঝি যায়-
থৈ-থৈ জ্বলে বালু-বালুর সাগর,
মরীচিকা মনে হয় ওই সরোবর,
অভাগী ছুটিয়া যায় পানির সন্ধানে।
নয়নে অশ্রু নাই-দেহ ফেটে লহু বুঝি ঝরে,
এক ফোঁটা পানি দাও—কলিজা বিদরে!
শিশু ইসমাইল পড়ে মাটিতে লুটায়
হাত পা ছুঁড়িয়া শিশু খেলা করে তায়,
পায়ের আঘাতে তার
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.