তমোনাশের মন

দূর ছাই। জায়গাটা তাকে ছাড়তেই হবে। তমোনাশ রায়ের আর একটা দিনও ইচ্ছা করে না এখানে থাকতে। কী নিয়ে থাকে সে এখানে? কী এখানে আছে? ভোঁস ভোঁস করে এক-একটা ট্রেন আসে; হাত-পা ছুড়ে যেন অচল হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কোনোটা পাঁচ মিনিট, আর কোনোটা দু-মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে আবার স্টার্ট দেয়। ক্ষুদ্র প্ল্যাটফর্মে সংখ্যায় অপ্রচুর যাত্রী-যাত্রিনীরা ভিড় করে। বেরোবার একটা লোহার গেট আগলে তমোনাশ আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারা তার সঙ্গে বোঝাপড়া করে, কাকুতি করে, আবার বচসাও করে, বলে, ধনেখালির টিকেট করে ফকিরের হাটে কেন নেমেছি, শুধচ্ছো বাবু! আমরা গরিব, আমরা খেতে পাই না, এক বেলা খাই, তো দুবেলা উপোস করে থাকি।

আমরা খাই না খাই তাতে তোমার কী? তা তো বলবেই। কিন্তু তোমার কী তা, তোমার নয় তো কার! তুমিই তো টিকেটবাবু।

চেনা-লোক বলেই অত সাহস। সত্যি এরা গরিব। ধনেখালির খামারে উলু-খড় কেটে নামায়। সাত-আট দিন পর পর বাড়ি আসে।

আর একদল আসে। দু-স্টেশন দূর থেকে ট্রেনে উঠে সপ্তাহে দুবার করে এরা এই স্টেশনে নামে। শনিবারে আর মঙ্গলবারে ফকিরের হাট বসে। এরা বস্ত্র-ব্যবসায়ী। সামান্য ইংরেজি-বাংলা লেখাপড়া জানে। বলে, উইদাউট টিকেটে আসবো না তো কী করব মশাই। চেকাররা গুষ্টিসুদ্ধ চেনা। অত গামছা তোয়ালে ছেড়েছি কি হাওয়ার গলার দড়ি বাঁধবার জন্যে? তাছাড়া দশ মাইলের ভিতরে, ট্রেনে চড়ি রোজ দুবার! ফকিরের হাটের বাঁধাপশারি। এসব কথা ছেড়ে দিলেও মশায়ের সঙ্গে হপ্তায় দুবার করে দেখা! উঁ বললেই হল। উইদাউট টিকেটে যেতে পার না।

অদ্ভুত যুক্তি। বস্ত্র ভেট দিয়ে এরা ট্রেন বাবুদের গলায় ফাঁস লাগিয়ে রেখেছে। এদের বেলা তাই সবাই রুদ্ধকণ্ঠ। তমোনাশ রায়ের শুধু তমোনাশ হয় না।

কথার তোড়ে বিভ্রান্ত তমোনাশের দৃষ্টি ওদের গমনরত পথে ওদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাওয়া করে। তমোনাশ ভেবে পায় না, দুনিয়ার মানুষ মানুষ হবে কবে। এ পথ দিয়ে অনেকে হাটে যায়। শাকসব্জীর চুপড়ি মাথায় করে গরিব চাষিরা, আর জেলেরা যায় মাছের ঝাঁকা কাঁধে করে। দেখতে দেখতে তার কাছে সব পুরোনো হয়ে গেছে।

তমোনাশ হাটের দুইটি রূপ প্রত্যক্ষ করে। এক কঠোর বাস্তবের রূপ, আর এক বিলাসীর রূপ। শুধু উদরের প্রয়োজন নিয়ে ঘুরলে সব মানুষ পাগল হয়ে যেত।

নিত্যকার মাছ-ভাতের উপাদান নিয়ে যারা ঘর্মাক্ত কলেবরে সারা দিন দাঁড়িপাল্লা চালিয়ে অনেক কথা হাত-মুখ ও নাড়ির অনেক শক্তি অপচয় করে গলদঘর্ম হয়, তাদের উপহাস করেই যেন হাটের প্রত্যন্তে পশরা সাজিয়ে বসে মনোহারী দোকানদাররা। একখণ্ড চট বিছিয়ে তার উপর বেসাতির জিনিসগুলি গোছায়। লাল, নীল, হলদে, সবুজ রঙের নানা রকম সস্তা দামের সাবান। নানা রঙের রাশি রাশি পুঁতির মালা। কত রঙের কাচের চুড়ি। সূচ গুলি-সুতা আর রুইমাছ ধরার সরু বঁড়শি। এরা সারি সারি বসে। শোরগোল নাই, ব্যস্ততা নাই, তত দরদস্তুর নাই। কেনে যারা, তারা কেউ চেয়ে ধিকৃত হয় না। হাটের এ অংশ বড়ো বিলাসী, বড়ো খেয়ালি।

গ্রাম্য রেল স্টেশনের চাকরিতে নূতনত্ব নেই, একথা বলবে কে! কে বলতে পারে এ চাকরি-জীবন একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন। ভিক্টর হিউগো আর তার ছেলে শেক্সপিয়ারের গ্রন্থাবলি পড়ে, আর সমুদ্র দেখে বন্দী জীবনের বারো বছর কাটাতে পারেন যদি, তুমি কেন পারবে না, ট্রেনভরা যাত্রী দেখে; তাদের চাঞ্চল্য, হাসিকান্না, তাদের ওঠানামা দেখে; সারা চাকরি-জীবন না হোক জীবনের আরো কয়েকটা দিন? এই স্টেশন ও এই চাকরির উপর তার চরম বিতৃষ্ণার মধ্যেও এসব কথা সে ভাবে মাঝে মাঝে।

এক বন্ধু একদিন বলল—ভালো লাগছে না, তুমি বলছো কী তমোনাশ? ফকিরহাট ছোট স্টেশন। তাতে দিনে পাঁচবার আর রাতে তিনবার গাড়ি যাতায়াত করে। এর

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice