-
ভার্দুন ট্রেঞ্চ, ফ্রান্স
ওঃ! কী আগুন-বৃষ্টি! আর কী তার ভয়ানক শব্দ!—গুড়ুম—দ্রুম—দ্রুম!—আকাশের একটুও নীল দেখা যাচ্ছে না, যেন সমস্ত আশমান জুড়ে আগুন লেগে গেছে! গোলা আর বোমা ফেটে ফেটে আগুনের ফিনকি এত ঘন বৃষ্টি হচ্ছে যে, অত ঘন যদি জল ঝরত আশমানের নীলচক্ষু বেয়ে, তা হলে এক দিনেই সারা দুনিয়া পানিতে সয়লাব হয়ে যেত! আর এমনই অনবরত যদি এই বাজের চেয়েও কড়া ‘দ্রুম দ্রুম’ শব্দ হত, তাহলে লোকের কানগুলো একেবারে অকেজো হয়ে যেত। আজ শুধু আমাদের সিপাইদের সেই ‘হোলি’ খেলার গানটা, মনে পড়ছে,—
‘আজু তলওয়ার সে খেলেঙ্গে হোরি
জমা হো গয়ে দুনিয়া কা সিপাই।
ঢালোঁও কি ডঙ্কা বাদন লাগি, তোপঁও কে
-
আজহারের কথা
সাহারা মরূদ্যান-সন্নিহিত ক্যাম্প
আফ্রিকা
ঘুম ভাঙল। ঘুমের ঘোর তবু ভাঙল না।… নিশি আমার ভোর হলে, সে স্বপ্নও ভাঙল, আর তার সঙ্গে ভাঙল আমার বুক! কিন্তু এই যে তার শাশ্বত চিরন্তন স্মৃতি, তার আর ইতি নেই। না—না, মরুর বুকে ক্ষীণ একটু ঝরনা-ধারার মতো এই অম্লান স্মৃতিটুকুই তো রেখেছে আমার শূন্য বক্ষ স্নিগ্ধ-সান্ত্বনায় ভরে। বয়ে যাও ওগো আমার ঊষর মরুর ঝরনা-ধারা, বয়ে যাও এমনি করে বিশাল সে এক তপ্ত শূন্যতায় তোমার দীঘল রেখার শ্যামলতার স্নিগ্ধ ছায়া রেখে। দুর্বল তোমার এই পূত ধারাটিই বাঁচিয়ে রেখেছে বিরাট কোনো এক মরুভূ-প্রান্তরকে, তা তুমি নিজেও জান না,—তবু বয়ে যাও ওগো ক্ষীণতোয়া নির্ঝরিণীর নির্মল ধারা,
-
গৌরীর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার দরুন কিছু ভাল লাগছিল না। মনটা বড্ড খারাপ, নীতীশ ভাবতেই পারছে না, দোষটা সত্যিই কার। অহরহ মনে হচ্ছে—আমার কি দোষ? জীবনে অমন মেয়ের সঙ্গে সে কখনই কথা বলবে না।
দক্ষিণ দিককার বারান্দা দিয়ে যতবার যায় ততবারই দেখে, গৌরী পর্দ্দা সরিয়ে এদিক পানে চেয়ে আছে, ওকে দেখলেই পলকে পর্দ্দা ফেলে দেয়। এ চিন্তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যে মনটা সদা চঞ্চল হয়ে রয়েছে; কি করে, কোথায় বা যায়? কোন কাজেই মন টিকছে না! অবশেষে বিকেল বেলা মনে পড়ল—জুতোজোড়া নেহাৎ অসম্মানজনক হয়ে পড়ছে, অনেক অনুনয়-বিনয় করে ঠাকুমার কাছে ব্যাপারটা বলতে—টাকা পাওয়া গেল।
নিজের জিনিস নিজে কেনার মত স্বাধীনতা বোধ
-
কীটস তখন ইতালী-তে। মৃত্যু শয্যায়। একদিন রাত্রে হঠাৎ তিনি তাঁর বন্ধু সেভার্ন-কে অনুরোধ করলেন, তাঁর সমাধিস্তম্ভের ওপর যেন এই কটি কথা লিখে দেওয়া হয়: ‘হীয়ার লাইজ ওআন হুজ নেম ওআজ রিট ইন ওআটার।’
বলা বাহুল্য এ গভীর অন্ধকারের কণ্ঠস্বর, বুক-ভাঙা নৈরাশ্যের আর্তনাদ। এ সত্য নয়, একেবারে সত্য নয়। কিন্তু কী দুঃখের কথা, তার কাছে তখন এটাই সত্য ছিল। তিনি যে ইতিমধ্যেই আশ্চর্য ও অবিস্মরণীয় কাব্য সৃষ্টি করেছেন এবং সবার অলক্ষ্যে তাঁর নাম যে সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে তা তিনি অনুভব করতে পারেন নি। সেই দুঃখ, ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যের দিনে তা অনুভব করাও বোধহয় সম্ভব ছিল না। অবশ্য তাঁর
-
প্রতিভা কথাটা বালজাক সম্বন্ধে যেমন নির্ভয়ে ও নিঃসংশয়ে ব্যবহার করা যায় সে-রকম বোধহয় খুব অল্প লেখকের সম্বন্ধেই করা চলে। সত্যিই উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী কথা-সাহিত্যিক অনরে দ্য বালজাক (Honore de Balzac) এক অসাধারণ সৃজনী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ম্যাথ্যু আর্নল্ড-এর মতে শুধু উৎকর্ষ নয়, উর্বরতাও প্রতিভার একটি প্রধান লক্ষণ এবং সে-দিক থেকে বিচার করলে বালজাক-এর সাহিত্য-প্রতিভায় আর কিছুমাত্র সন্দেহ থাকে না। বালজাক-এর উর্বরতা সত্যিই বিস্ময়কর। অবশ্য, বলাই বাহুল্য, এই উর্বরতা পুস্তকের সংখ্যায় নির্ণীত নয়। কারণ অনেক সাধারণ লেখক-কেও অনেক সময় অসংখ্য বই লিখতে দেখা যায়। কিন্তু তাঁরা দু-একটি মৌলিক রচনার পর হয় নিজেদেরই চর্বিতচর্বণ করেন নয়তো কৌশলে অপরের সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি করে থাকেন।
-
অনেকের মতে চার্লস্ ডিকেন্স-ই হচ্ছেন ইংল্যাণ্ডের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। এ বিষয়ে অবশ্য মতভেদ থাকতে পারে। তবে একথা ঠিক যে, উপন্যাস লেখকের যা প্রধান গুণ সেই গল্প বলার ক্ষমতা ও চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার শক্তি তাঁর অসাধারণ ছিল।
বলা বাহুল্য, ডিকেন্স-এর লেখার আরও অনেক গুণ ছিল এবং ত্রুটিও। সে-সব আলোচনা এখানে আমার করার ইচ্ছে নেই। তাঁর সাহিত্য-বিচারের জন্য এ প্রবন্ধ নয়। আমি যথারীতি শুধু তাঁর জীবন ও তাঁর প্রেম সম্বন্ধে খুব সংক্ষেপে সামান্য দু-চার কথা এখানে লিখবো।
১৮১২ সালে ইংল্যান্ডের পোর্টসী-তে চার্লস্ ডিকেন্স-এর জন্ম হয়। জন ডিকেন্স ও এলিজাবেথ ডিকেন্স-এর তিনি দ্বিতীয় সন্তান ও প্রথম পুত্র। তাঁর বাবা জন ডিকেন্স নেভি পে-অফিসে
-
সাহিত্য-ব্যবসায়ী ও সাহিত্য-সাধক এই দুই শ্রেণীতে যদি পৃথিবীর বিখ্যাত কথা-সাহিত্যিকদের বিভক্ত করা যায় তা হলে শেষোক্ত শ্রেণী-ভুক্তদের একেবারে প্রথম দিকেই বোধহয় ফরাসীদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী গু্যস্তাভ ফ্লোবের-এর (Gustave Flaubert) নাম করতে হবে। ফ্লোবের-এর সাহিত্য-সাধনা সত্যিই বিস্ময়কর। ভগবদ্-সাধক যেমন ঈশ্বরোপাসনার জন্য দৈহিক ভোগসুখ ত্যাগ করে কঠোর সাধনায় মগ্ন থাকেন ফ্লোবের-ও তেমনি তাঁর কথাশিল্পের উৎকর্ষের জন্য অদ্ভুত কৃচ্ছসাধন করে গেছেন। শুধু ‘মাদাম বোভারি’ লেখার জন্যই তিনি পঞ্চান্ন মাস অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছর অমানুষিক পরিশ্রম করেছিলেন। পাঁচশো পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটির দু-এক লাইন লিখতেও অনেক সময় তাঁর একাধিক দিন কেটে গেছে। তার মানে এই নয় যে তিনি সারা দিনে মাত্র এক-আধ লাইন লিখতেন। সকাল
-
ইংল্যাণ্ড যদি শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের জন্য গর্ব করে তা হলে রাশিয়াও শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের জন্য গর্ববোধ করতে পারে। টলস্টয় নিঃসন্দেহে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। তাঁর লেখা ‘ওঅর অ্যাণ্ড পীস’, ‘আনা কারেনিনা’, ‘রেসারেক্শন’ প্রভৃতি উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে বিস্ময়কর অবদান। এর মধ্যে ‘ওঅর অ্যাণ্ড পীস’ সত্যিই অতুলনীয়। এটিকে সার্থকভাবেই ‘এপিক উপন্যাস’ বলা চলে। এক বিরাট ক্যানভাসের ওপর আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে তিনি যে-সব চিত্ৰ অঙ্কিত করেছেন তা দেখে শুধু মুগ্ধ হওয়া নয়, বিস্মিতও হতে হয়।
এই বৃহৎ ও মহৎ উপন্যাসের বিস্তৃত ক্ষেত্রে প্রায় শ পাঁচেক চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় এবং আশ্চর্য, তাদের প্রায় সকলকেই রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ বলে বোধহয়। কয়েকটি প্রতিনিধিমূলক নারী ও পুরুষ চরিত্রকে বিদেশী আমরাও
-
পরিচ্ছেদ ১—দারার কথা
গোলেস্তান
গোলেস্তান! অনেক দিন পরে তোমার বুকে ফিরে এসেছি। আঃ মাটির মা আমার, কত ঠান্ডা তোমার কোল! আজ শূন্য আঙিনায় দাঁড়িয়ে প্রথমেই আমার মনে পড়ছে জননীর সেই স্নেহবিজড়িত চুম্বন আর অফুরন্ত অমূলক আশঙ্কা, আমায় নিয়ে তাঁর সেই ক্ষুধিত স্নেহের ব্যাকুল বেদনা,… সেই ঘুম-পাড়ানোর সরল ছড়া,—
ঘুম-পাড়ানি, মাসি-পিসি ঘুম দিয়ে যেয়ো,
বাটা ভরে পান দেব গাল ভরে খেয়ো!
আরও মনে পড়ছে আমাদের মা-ছেলের শত অকারণ আদর-আবদার! সে মা আজ কোথায়?
দু-এক দিন ভাবি, হয়তো মায়ের এই অন্ধ স্নেহটাই আমাকে আমার এই বড়ো-মা দেশটাকে চিনতে দেয়নি। বেহেশ্ত হতে আবদেরে ছেলের কান্না মা শুনতে পাচ্ছেন কিনা জানিনে, কিন্তু এ আমি
-
[এক নিমেষের চেনা]
বৃষ্টির ঝম-ঝমানি শুনতে শুনতে সহসা আমার মনে হল, আমার বেদনা এই বর্ষার সুরে বাঁধা!…
সামনে আমার গভীর বন। সেই বনে ময়ূরে পেখম ধরেছে, মাথার উপর বলাকা উড়ে যাচ্ছে, ফোটা কদম ফুলে কার শিহরণ কাঁটা দিয়ে উঠছে, আর কীসের ঘন-মাতাল-করা সুরভিতে নেশা হয়ে সারা বনের গা টলছে!…
এটা শ্রাবণ মাস, না?—আহা, তাই অন্তরে আমার বরিষণের ব্যথাটুকু ঘনিয়ে আসছে!—
সে হল আজ তিন বছরের কথা। আমার এই খাপছাড়া জীবন তার স্মৃতিগুলো ঝড়ের মুখে পদ্মবনের মতো ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে! কখনও তার একটি কথা মনে পড়ে, কখনও তার আধখানি ছোঁয়া আমার দাগা-পাওয়া বুকে জাগে! মানস-বনের জুঁই-কুঁড়ি আমার ফুটতে গিয়ে ফুটতে পায়
-
"এই দেখ ইন্দুর ডায়েরি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, তুমি পড়ে দেখ দিকি, কিছু মানে বার করতে পার কিনা।"
বলিষ্ঠকায় ভুজঙ্গধর মরক্কো-চামড়া দিয়া বাঁধানো সুদৃশ্য খাতাখানি আমার দিকে আগাইয়া দিল।
"ঊনত্রিশে তারিখে যেটা লিখেছে সেইটে পড়! আরও পাতা উলটে যাও—হ্যাঁ, ওইখান থেকে পড়।"
পড়িতে লাগিলাম। ভুজঙ্গধর ভ্রু-কুঞ্চিত করিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ভুজঙ্গাধর আমার বাল্যবন্ধু এবং ইন্দুমতীর স্বামী।
ইন্দুমতী লিখিয়াছেন, "কাল রাত্রে যে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটেছে তা এতই অসম্ভব যে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি কাউকে বলিওনি, এমন কি মাণিককেও না। মাণিককে বলতে খুবই লোভ হচ্ছে, কিন্তু ভয় হচ্ছে পাছে সে আমাকে ভীতু বলে ঠাট্টা করে। তার
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.