বালজাক
প্রতিভা কথাটা বালজাক সম্বন্ধে যেমন নির্ভয়ে ও নিঃসংশয়ে ব্যবহার করা যায় সে-রকম বোধহয় খুব অল্প লেখকের সম্বন্ধেই করা চলে। সত্যিই উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসী কথা-সাহিত্যিক অনরে দ্য বালজাক (Honore de Balzac) এক অসাধারণ সৃজনী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ম্যাথ্যু আর্নল্ড-এর মতে শুধু উৎকর্ষ নয়, উর্বরতাও প্রতিভার একটি প্রধান লক্ষণ এবং সে-দিক থেকে বিচার করলে বালজাক-এর সাহিত্য-প্রতিভায় আর কিছুমাত্র সন্দেহ থাকে না। বালজাক-এর উর্বরতা সত্যিই বিস্ময়কর। অবশ্য, বলাই বাহুল্য, এই উর্বরতা পুস্তকের সংখ্যায় নির্ণীত নয়। কারণ অনেক সাধারণ লেখক-কেও অনেক সময় অসংখ্য বই লিখতে দেখা যায়। কিন্তু তাঁরা দু-একটি মৌলিক রচনার পর হয় নিজেদেরই চর্বিতচর্বণ করেন নয়তো কৌশলে অপরের সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি করে থাকেন। এইখানেই সত্যিকার প্রতিভা ও সাধারণের তফাত। বালজাক-এর বিপুল সাহিত্য-ভাণ্ডারে অবশ্য চর্বিতচর্বণের চিহ্ন একেবারে নেই এ রকম কথা বলার সাহস ও যোগ্যতা অল্পলোকেরই আছে। তবে এ কথা বোধহয় নির্দ্বিধা ও নিঃসংশয়েই বলা চলে যে, ‘লা কমেদি য়্যুম্যান’-এর (La Come die Humaine) বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে যত মৌলিক জীবন্ত চরিত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তা একমাত্র শেক্সপীয়রের সাহিত্যে ছাড়া ইওরোপে আর কারো সাহিত্যে পাওয়া যায় না। দুমা এক জায়গায় বলেছেন—“ভগবানের পর শেক্সপীয়র-ই সবচেয়ে বড় সৃষ্টিকর্তা।” মনে হয় দুমা যদি বালজাক-এর সমসাময়িক ও বন্ধু না-হতেন তা হলে শেক্সপীয়রের সঙ্গে বালজাক-এর নামও তিনি নিশ্চয় উল্লেখ করতেন। অবশ্য গোতিয়ে-র মতে বালজাক-এর মত এত জীবন্ত চরিত্র শেক্সপীয়রও সৃষ্টি করেছেন কিনা সন্দেহ।
‘লা কমেদি য়্যুম্যান’ প্রায় শ’খানেক উপন্যাসের সমষ্টি। এই দীর্ঘ উপন্যাসমালায় প্রায় দু-তিন হাজার চরিত্রের সমাবেশ দেখা যায়। তারা সকলেই যে একেবারে বাস্তব চরিত্র তা নয়। কিন্তু বালজাক-এর প্রতিভার স্পর্শে তারা এতই জীবন্ত যে পাঠক বোধহয় তাঁদের হৃদ্-স্পন্দনও অনুভব করতে পারেন। বালজাক এমন বিভোর হয়ে তাঁর উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টি করতেন যে তাঁর নিজের কাছেও বোধহয় তাদের রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ বলে বোধ হতো। অন্তত তাঁর অবচেতন মনে যে তার একটা গভীর ছাপ থেকে যেত তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। তাঁর ‘লা কমেদি য়্যুম্যান’-এ বিয়াঁশোঁ। (Bianchon) নামে একজন সৎ সুচিকিৎসকের চরিত্র আছে। বালজাক যখন মৃত্যুশয্যায় তখন নাকি তিনি অসুখের ঘোরে এই বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন—“বিয়াঁশোঁ-কে ডাকো, বিয়াঁশোঁ-কে ডাকো, সে আমায় বাঁচাতে পারবে।”
বালজাক-কে অনেকে রিয়ালিজমের গুরু মনে করেন। অনেকে আবার তাঁকে স্বভাবত রোমান্টিক মনে করে থাকেন। আসলে তিনি বোধহয় এই দুয়ের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সংমিশ্রণ। কারণ বালজাক-সৃষ্ট অদ্ভুত আর ও অপরূপ কল্পনার জগৎ দৃঢ় বাস্তব-সত্যের উপরই প্রতিষ্ঠিত। জীবনকে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখেছিলেন। সেই দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর ‘লা কমেদি য়্যুম্যান’-এর মূল ভিত্তি।
‘লা কমেদি য়্যুম্যান’ উপন্যাসমালা রচনার বিরাট পরিকল্পনা অবশ্য বালজাক-এর মাথায় প্রথমে আসে নি। যৌবনে তিনিও অন্যান্য লেখকের মত যথারীতি পৃথক পৃথক স্বয়ংসম্পূর্ণ উপন্যাস লিখেই খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু নিজের অজ্ঞাতসারেই তিনি যে ইতিমধ্যে সে-যুগের মহৎ মহাকাব্য রচনার সূত্রপাত করে ফেলেছেন সে-খেয়াল তাঁর ছিল না। তাঁর বয়স যখন চৌত্রিশের মত সেই সময় তাঁর হঠাৎ একদিন মনে হয় যে তাঁর সমগ্র রচনা পৃথক পৃথক ভাবেই সংযুক্ত করা যায়। এবং সেই সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের অখণ্ড চিত্র অঙ্কিত করার এক বিরাট পরিকল্পনাও তাঁর মনে আসে। এই চিন্তায় তিনি এতই উত্তেজিত হয়ে ওঠেন যে তাঁর ছোট বোনের কাছে ছুটে গিয়ে নাকি বলেন, শোনো, তোমরা আমাকে অভিনন্দিত করো। অচিরেই আমি বিরাট প্রতিভায় পরিণত হতে চলেছি। এবং এর পর হতে সত্যিই তিনি এই পরিকল্পনা অনুযায়ী অশেষ শ্রম সহকারে একটির পর একটি উপন্যাস লিখে গেছেন। অবশ্য তিনি এই পর্যায়ে যতগুলি উপন্যাস লিখবেন স্থির করেছিলেন শেষ পর্যন্ত তা লিখে যেতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments