গুস্তাভ ফ্লোবের
সাহিত্য-ব্যবসায়ী ও সাহিত্য-সাধক এই দুই শ্রেণীতে যদি পৃথিবীর বিখ্যাত কথা-সাহিত্যিকদের বিভক্ত করা যায় তা হলে শেষোক্ত শ্রেণী-ভুক্তদের একেবারে প্রথম দিকেই বোধহয় ফরাসীদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী গু্যস্তাভ ফ্লোবের-এর (Gustave Flaubert) নাম করতে হবে। ফ্লোবের-এর সাহিত্য-সাধনা সত্যিই বিস্ময়কর। ভগবদ্-সাধক যেমন ঈশ্বরোপাসনার জন্য দৈহিক ভোগসুখ ত্যাগ করে কঠোর সাধনায় মগ্ন থাকেন ফ্লোবের-ও তেমনি তাঁর কথাশিল্পের উৎকর্ষের জন্য অদ্ভুত কৃচ্ছসাধন করে গেছেন। শুধু ‘মাদাম বোভারি’ লেখার জন্যই তিনি পঞ্চান্ন মাস অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছর অমানুষিক পরিশ্রম করেছিলেন। পাঁচশো পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটির দু-এক লাইন লিখতেও অনেক সময় তাঁর একাধিক দিন কেটে গেছে। তার মানে এই নয় যে তিনি সারা দিনে মাত্র এক-আধ লাইন লিখতেন। সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত লিখতেন তিনি অজস্র। কিন্তু যেমন লিখতেন তেমনি কাটতেন। লেখা আর কাটা সমানে চলতো। অনেক কাটাকুটির পর তাঁর মনোমত লেখা তিনি আবার নির্জনে গিয়ে চেঁচিয়ে পড়তেন। কানে একটু বেসুরো লাগলেই আবার কাটাকুটি শুরু হতো। এই ভাবে অদ্ভুত পরিশ্রম করে তিনি তাঁর রচনার এক অনন্য স্টাইল সৃষ্টি করেন। তাঁর সমকালে এবং তাঁর মৃত্যুর পরেও দীর্ঘদিন তা বিশেষ ভাবে সমাদৃত হয়। বহু লেখক তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তবে আজকাল নাকি আধুনিক ফরাসী লেখকরা অনেকেই তাঁর স্টাইলে যথেষ্ট স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব আছে বলে মনে করেন। সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। যুগে যুগে লেখক ও পাঠকদের রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন হয় এবং সাহিত্যেরও নতুন করে মূল্যায়ন হয়ে থাকে। সুতরাং ভবিষ্যতে ফ্লোবের-এর রচনা ও রচনারীতির আরো অনেক হয়তো দোষত্রুটি প্রকাশিত হবে। কিন্তু এ কথা নিশ্চিত যে যতদিন ফরাসী সাহিত্য বেঁচে থাকবে সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নিষ্ঠা সাধনার কথা অবশ্যই অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে স্মৃত হবে।
১৮২১ সালে রুয়াঁ-তে (Rouen) গু্যস্তাভ ফ্লোবের-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং বেশ অবস্থাপন্ন ব্যক্তি। শিক্ষিত, সুখী ও সচ্ছল এই পারিবারিক আবহাওয়াতে ফ্লোবের মানুষ। বাল্যকালে তাঁর স্বাস্থ্যও ভালো ছিল। তবু, কী জানি কেন, ছেলেবয়স হতেই তাঁর এই জীবন মোটেই সুখের মনে হতো না। ছাত্রজীবনে বহু সহপাঠীর মধ্যে থেকেও অন্তরের গভীরতম সত্তায় তিনি নিজেকে নিঃসঙ্গ বোধ করতেন। যৌবনে এই নিঃসঙ্গতার অনুভূতি তাঁর আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল। বন্ধুদের মাঝারি ধরনের মেধা ও বুদ্ধির জন্য তিনি মনে মনে তাদের অবজ্ঞা করতেন। তাদের অধিকাংশেরই স্থূল রুচি ও কৃত্রিম ভাবভঙ্গীর প্রতি তাঁর ঘৃণা ছিল অকৃত্রিম। ফ্লোবের আশৈশব ছিঁলেন দুঃখবাদী। সারাজীবন তিনি এক অদ্ভুত বিষণ্ণ বিরক্তির সঙ্গে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থেকেছেন।
অল্প বয়স হতেই ফ্লোবের মাঝে মাঝে লিখতেন। তবে একটি ঘটনা বা দুর্ঘটনার জন্যই বোধহয় সাহিত্যকে তিনি জীবনের একমাত্র অবলম্বনরূপে গ্রহণ করেন। সেটা ১৮৪৪ সালের কথা। একদিন রাত্রে তাঁর মায়ের এক সম্পত্তি পরিদর্শনান্তে তিনি ও তাঁর দাদা গাড়ি করে ফিরছিলেন। সেই সময় হঠাৎ তাঁর মনে হলো কোথা থেকে এক বিশাল আগুনের ঢেউ এসে তাঁকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মূর্ছিত হয়ে গাড়ির মধ্যে পড়ে গেলেন। জ্ঞান হলে তিনি দেখলেন যে সারা শরীর তাঁর রক্তে ভিজে গেছে।
কিন্তু সেই কখন যে অবশ্য সুচিকিৎসার ফলে সে-যাত্রা তিনি বেঁচে যান। হতে তাঁর এক দুরারোগ্য ফিটের ব্যাধির সূত্রপাত হয়। ফিট হবে তার কোনোই ঠিক ছিল না। তার ফলে আইন অধ্যয়ন ত্যাগ করে তিনি পারী হতে চলে আসতে বাধ্য হন এবং অতঃপর বাড়িতে থেকে শুধুমাত্র সাহিত্য-সাধনাতেই আত্মনিয়োগ করবেন স্থির করেন।
বলা বাহুল্য, ‘মাদাম বোভারি’-র জন্যই ফ্লোবের-এর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি। অবশ্য ফ্রান্সে অনেকে তাঁর ‘লেত্যুকাসিয়ো সাঁতিমাঁতাল’-কেই (L'Education Sentimentale) শ্রেষ্ঠ রচনা বলে মনে করেন। তবে বিদেশের পাঠকদের কাছে ‘মাদাম বোভারি’-র
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments