ভূতের প্রেম
"এই দেখ ইন্দুর ডায়েরি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, তুমি পড়ে দেখ দিকি, কিছু মানে বার করতে পার কিনা।"
বলিষ্ঠকায় ভুজঙ্গধর মরক্কো-চামড়া দিয়া বাঁধানো সুদৃশ্য খাতাখানি আমার দিকে আগাইয়া দিল।
"ঊনত্রিশে তারিখে যেটা লিখেছে সেইটে পড়! আরও পাতা উলটে যাও—হ্যাঁ, ওইখান থেকে পড়।"
পড়িতে লাগিলাম। ভুজঙ্গধর ভ্রু-কুঞ্চিত করিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। ভুজঙ্গাধর আমার বাল্যবন্ধু এবং ইন্দুমতীর স্বামী।
ইন্দুমতী লিখিয়াছেন, "কাল রাত্রে যে অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটেছে তা এতই অসম্ভব যে বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি কাউকে বলিওনি, এমন কি মাণিককেও না। মাণিককে বলতে খুবই লোভ হচ্ছে, কিন্তু ভয় হচ্ছে পাছে সে আমাকে ভীতু বলে ঠাট্টা করে। তার চক্ষে নিজেকে ভীতু প্রতিপন্ন করবার ইচ্ছে নেই। সত্যি সত্যি ভীতু আমি নইও। ভীতু হলে জনমানব-বর্জিত এই পোড়ো বাড়িতে এসে থাকতেই রাজি হতাম না কি? ঘটনাটা তবু লিখে রেখেছি। লিখে রাখবার মতো ঘটনা ক'টাই বা ঘটে জীবনে! ভবিষ্যতে কোনও পাঠক বা পাঠিকা হয়তো এটা পড়ে পাগল ভাববেন আমাকে; কিংবা হয়তো কোনও উৎসাহী মনস্তাত্ত্বিক এর থেকে কোনও তথ্য উদ্ধার করে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করবেন আমার স্বামীকে। সত্যই অদ্ভুত ঘটনাটা।”
কাল রাত দশটার সময় মাণিক হঠাৎ বলল—“ওহো, একটা বড় ভুল হয়েছে, পেট্রোলটা কেনা হয়নি। চল কিনে আনি গিয়ে। দশ মাইল যেতে আসতে আর কতক্ষণ লাগবে?"
আমার শরীরটা তেমন ভাল ছিল না, কোমরটা ব্যথা করছিল সন্ধে থেকেই। তাছাড়া আগাথা ক্রিষ্টির একখানা বই এমন পেয়ে বসেছিল আমাকে যে কোথাও নড়তে ইচ্ছে করছিল না।
বললাম, "আমি আর যাব না, থাক না কাল কিনলেই হবে।”
মাণিক বললে, "ওটা হল স্ত্রীবুদ্ধি। আমরা যেরকম অবস্থায় আছি তাতে মোটরে সদাসর্বদা পুরো পেট্রোল থাকা চাই।”
"তাহলে তুমিই গিয়ে নিয়ে এস।”
"তুমি থাকতে পারবে একা? ভয় করবে না তো?"
"আমি যদি ভীতু হতাম তাহলে যা করেছি তা করতে পারতাম কি!"
মাণিক হঠাৎ ঝুঁকে আমার গালে চপাৎ করে চুমু খেল একটা। এমন দুষ্টু আর অসভ্য হয়েছে আজকাল!
"আমি পেট্রোলটা নিয়ে আসি তাহলে। যাব আর আসব।"
মাণিক চলে গেল। আমরা যে বাড়িটাতে এসে ছিলাম সেটা কোনো এক মৈথিল জমিদারের বাগান বাড়ি। যদিও এখন পোড়ো বাড়ির মতো হয়ে গেছে, কিন্তু একদিন যে এর মহিমা ছিল তা একনজরেই বোঝা যায়। জমিদারের বংশধর জীমূতবাহন সিংয়ের সঙ্গে মাণিকের বন্ধুত্ব আছে বলেই বাড়িটা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বাড়ির চাবিটা মাণিককে দিয়ে জীমূতবাহন লন্ডনে পাড়ি দিয়েছেন সম্প্রতি। প্রচণ্ড বাড়ি, প্রকাণ্ড হাতা। আমরা দোতলায় যে ঘরখানা নিয়ে আছি, তার ঠিক সামনেই গাড়ি-বারান্দা, গাড়ি-বারান্দায় বেরিয়ে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে সুবিস্তৃত বাগানটা। বাড়ির সামনেই বাগান। এখন অবশ্য বাগানের পূর্বশ্রী নেই। ফাঁকা মাঠের মতো খানিকটা জমি পড়ে আছে খালি। বাগানের ওপারে গেট। গেটেরও ভগ্নদশা। কপাট নেই, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড থাম দুটো দাঁড়িয়ে আছে কেবল।
সেদিন জ্যোৎস্না উঠেছিল খুব। ফিনিক ফুটছিল চতুর্দিকে। ইজিচেয়ারটায় শুয়ে শুয়েই আমি টের পেলাম মাণিক মোটর নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর কতক্ষণ কেটেছিল, আমার মনে নেই ঠিক। আমি তন্ময় হয়ে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম কিসের যেন একটা শব্দ হচ্ছে। মনে হল ঘোড়ার পায়ের শব্দ, অনেকগুলো মনে হল অনেক দূর থেকে আসছে, কেন জানি ঘোড়া যেন টগবগ করে ছুটে আসছে। না হঠাৎ মনে হল অনেকদিন ধরে আসছে! শব্দটা প্রথমে ক্ষীণ ছিল, তারপর স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। ঘটবট খটবট খটবট খটবট—ক্রমশই যেন এগিয়ে আসছে। আমি বইটার দিকে চেয়ে বসেছিলাম কিন্তু পড়ছিলাম না। আমি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম। কার বা কিসের, তা জানি না, কিন্তু অপেক্ষা করছিলাম। মনে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments